সমাজটা একেবারে ভেঙে না ফেললে ইলমারা মরতেই থাকবে

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বা এইরকম সব প্যানপ্যানে কথাগুলি মেহেরবাণী করে বলা বন্ধ করেন। এই যে ইলমা চৌধুরী মেঘলা নামের ছাত্রীটির মৃত্যু হয়েছে, এই মৃত্যুটি ভালো করে দেখেন, চোখ খোলা রেখে স্পষ্ট করে খোলা মস্তিষ্ক নিয়ে দেখেন। দেখে বলেন, নারীকে এইরকম অবমাননা বৈষম্য শোষণ ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্যে কি নারীর ক্ষমতায়ন জাতীয় এইসব কথা বলে কোন কাজ হবে? ভাবুন, ভেবে বলুন। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিওটিও বা এইরকম কিছু সংস্থা থেকে মাঝে মাঝে এইরকম কয়েকটা শব্দ বা বাক্যাংশ ছাড়া হয় আর আপনারা সেইসব কথা প্রশিক্ষিত তোতা পাখির মতো কণ্ঠে তুলে নেন, আর বলতে থাকেন সুযোগ পেলেই। এইসবে যে ঘোড়ার ডিম কিছুই হবে না সেকথা বুঝতে আপনাদের আর কতদিন লাগবে?
কেন, স্পষ্ট করে নারীর জন্যে বৈষম্যের অবসান চাইতে আপনার অসুবিধা কী? বলুন যে না, নারী ও পুরুষ দুজনই মানুষ এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন বৈষম্য রাখা চলবে না। অসুবিধা কী? বলুন যে প্রতিটা মানুষ তার নিজের শরীরের মালিক, তার নিজের জীবনের মালিক, তার নিজের মর্জির মালিক- এবং নারীও যেহেতু মানুষ নারীর শরীর নারীর জীবন নারীর মর্জির মালিকও নারী নিজেই। এই কথাটি বলতে আপনার কী অসুবিধা? দেড়শ বছর আগে বেগম রোকেয়া স্পষ্ট করে পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, অবরোধবাসিনী পড়েন নাই? আজকে আপনি কেন স্পষ্ট করে বলতে পারেন না যে না, নারীকে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে ধর্মের নামে প্রথার নামে কোনোভাবেই আর অবরোধবাসিনী করা যাবে না?

নারীর ক্ষমতায়ন মানে কী? কিছু নারী বড় বড় কোম্পানির বোর্ড অফ ডাইরেক্টরে যুক্ত হবেন, কিছু মহীয়সী মিলিটারিতে জেনারেল হবেন, পার্লামেন্টে নারী সদস্য বাড়বে, উপজেলা পরিষদে কয়েকজন নারী সদস্য রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নারী ভিসি আরও বাড়বে কয়েকজন- এইসব? কাল না হোক, পরশু যদি এইসব হয়ে যায়, তাইলে আর কোন মেঘলাকে মরতে হবে না? তাইলে আর কোন নারীকে ধর্ষণের শিকার হতে হবে না? বৈষম্য ঘুচে যাবে? না ঘুচবে না। একদিকে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারী ভিসি নিয়োগ দিবেন, আরেকদিকে আরেকজন মেঘলাকে ওর পুরুষ স্বামীটি বাধ্য করবে হিজাব পরতে, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিতে- অবরোধবাসিনী বানাবে।

(২)
আপনি আঘাত করবেন না সেই কাঠামোতে, যে কাঠামো বৈষম্য বজায় রাখে? বৈষম্য যতদিন বজায় থাকে, নারীকে যতদিন পুরুষের তুলনায় অধম ঊণ-প্রাণী বিবেচনা করা হবে, ততদিন তো মেঘলাদের মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হবে না। এইটা তো পিথাগোরাসের উপপাদ্যের মতো সরল একটা হিসাব। এইটা তর্ক করে বোঝাতে হবে? নারীর শরীরের মালিক নারী নিজে, এইটা তো জটিল কোন কথা নয়, অন্যায় কোন কথা নয়। এইটা যখন লোকে মানতে চায় না তখন কী বুঝবেন? পুত্র সন্তান ও কন্যা সন্তান- দুইই পিতামাতার সন্তান। দুইজনের উত্তরাধিকার সমান হবে, এই কথাটা যখন সমাজ মানতে চায় না, তখন কী বুঝবেন?

হিসাব তো জটিল কিছু না- এই সমাজ একটি অযৌক্তিক ব্যাধিগ্রস্ত রুগ্ন সমাজ। জরাজীর্ণ সমাজ।
এই জরাজীর্ণ রুগ্ন বাতিল সমাজ বজায় রেখে নারীর মুক্তি হবে না। নারীর ক্ষমতায়ন বা সুশাসন এই জাতীয় নানাপ্রকার মলমের ক্যানভাস করতে চান, করেন। কিন্তু ঐসব ক্যানভাসে আপনার পকেটে টাকা-পয়সা খানিকটা হয়তো আসবে- স্টাডি করার কাজ পাবেন দক্ষিণ পূর্বাংশে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে একটা বেইজলাইন সার্ভে করেন, ম্যালা টাকার কাজ। কিন্তু এইসবে বৈষম্য দূর হবে? না জনাব, হবে না। আর বৈষম্য যতদিন দূর না হবে, ততদিন কী হবে? একদল থাকবে বড়, আরেকদল থাকবে ছোট, একদল হবে প্রভু, আরেকদল হবে দাসী- বৈষম্য দূর না করে এই সমীকরণ কীভাবে পালটাবেন?

ইলমা চৌধুরী মেঘলা, মেয়েটাকে দৃশ্যতই হত্যা করা হয়েছে। আপনারা খবর দেখেছেন টিভিতে, সবকিছু জানেন। মাঝে মাঝেই এইরকম একেকটা মেয়ে খুন হয় আর আমরা শাহবাগে যাই। অল্প কিছু লোক হয়, সেই অল্প কিছু লোকই চিৎকার করে প্রতিবাদ করি, বিচার চাই। কোন কোন ক্ষেত্রে বিচার যে হয় না তা নয়, কখনও কখনও বিচার হয়ও। যে লোকটা বা লোকগুলি খুন করেছে সেই লোকটা, বা লোকগুলির হয়তো সাজা হবে- ধরে নিলাম ফাঁসিই হয়ে গেল। এরপর তো আরেকজন ইলমা চৌধুরী মেঘলা প্রাণ দিবে। তার চেয়েও ভয়াবহ যেটা, কয়েক হাজার ইলমা স্বামীর নির্দেশে পড়াশুনা ছেড়ে দিবে, অথবা চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিবে, হিজাব ধরবে, জীবনযাত্রা পাল্টে ফেলবে- প্রভুভক্ত প্রাণীর মতো প্রভুর নির্দেশে হাসবে, প্রভুর নির্দেশ কাঁদবে।

(৩)
এইটা তো নারীর জীবন হতে পারে না। আমি তো আমার কন্যাদের জন্যে এই জীবন চাই না। আমি এমন একটা সমাজ গড়তে চাই যেখানে কোন পিতামাতা তার সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করবে না। সমাজের কোন ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য হবে না। সেজন্যে লড়তে চাই। এই সমাজকে তো আমি লাথি মেরে ভেঙে ফেলতে চাই- যে সমাজ আমার কন্যাকে ঊন-মানুষ বলবে সেই সমাজের মুখে ইয়ে করে দিতে চাই। আপনি যদি মনে করেন যে, না, সমাজ একেবারে না ভেঙেচুড়েও বৈষম্য দূর করা সম্ভব, আমাকে বোঝান কী করে করবেন কাজটা? আমি তো মনে করি, চূড়ান্ত বিচারে সমাজ ভেঙেই ফেলতে হবে, নাইলে নারীর প্রতি বৈষম্য বন্ধ হবে না। আর এইসব হত্যা সেসব তো বৈষম্যের উপজাত মাত্র।

আর যদি একান্তই মনে করেন যে বিদ্যমান সমাজ কাঠামো বজায় রেখেই কিছুটা সাম্য আনতে পারেন, তাইলেও ঐসব ‘ক্ষমতায়ন’ বা ‘সুশাসন’ অইরকম ভাষা ভাষা সুন্দর, তবে অস্পষ্ট কথা বলে কাজ হবে না। একটা একটা করে সুস্পষ্ট দাবি তুলুন। প্রথমেই এই দাবিটা তুলুন দেখি, যে, ধর্মীয় বা প্রথাগত বিধান যাই-ই হোক না কেন, এখন থেকে পিতার বা মাতার সম্পত্তিতে কন্যা সন্তান ও পুত্র সন্তানের সমান উত্তরাধিকার থাকতে হবে। এইটা তো একটা ন্যায্য দাবী- তুলে দেখেন তো দাবিটা। দেখেন আপনার সাথে স্পষ্ট করে কে কে আসে! যারা আসবে না, ওদেরকে চিহ্নিত করুন, ওরা বৈষম্য বজায় রাখার পক্ষের লোক।

নারীর লড়াইটা প্রত্যক্ষ- সরাসরি। এইখানে কোন মধ্যপন্থা নাই, কোন অস্পষ্টতা থাকা চলবে না। বৈষম্য দূর করতে হবে। এইটাই নারীর রাজনীতি, এইটাই নারীর লড়াই, এইটাই মুক্তির লড়াই। ইলমা চৌধুরী মেঘলা প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছে, বৈষম্যের অবসান না হলে নারীর মুক্তি নাই। নারীর প্রতি সহিংসতা, সেটাও হয় বৈষম্যের কারণেই। ঐ যে ওরা বলে, নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ আরও কী কী সব কথা, এইগুলি দিয়ে নাকি নারীর প্রতি সহংসতা কমাবে- ফালতু বাত। বৈষম্যের অবসানই নারীমুক্তি- হয় আপনি নারীমুক্তির পক্ষে, অথবা বিপক্ষে, এর মাঝামাঝি কিছু নাই।

(৪)
ইলমা চৌধুরী মেঘলা হত্যার বিচার চাই। দ্রুত বিচার চাই, অপরাহদির শাস্তি চাই। কিন্তু এইটা হচ্ছে এড হক দাবী। মুল দাবী হচ্ছে, এই সমাজ আমরা রাখবো না, যে সমাজ বৈষম্য বজায় রাখতে চায়, সেই সমাজকে আমি ভাঙবোই। কাল সকালেই হয়তো ভাঙতে পারব না, কিন্তু এই সমাজ আমি ভাঙবোই। বলে দিলাম।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.