লাখো শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

সুপ্রীতি ধর:

আজ ১৪ ডিসেম্বর, বাঙালী জাতির ইতিহাসে আরও একটি কলংকজনক দিন। এই দিনটাতে ধরে ধরে মেধাশূন্য করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের দোসররা। এই দোসররা বাইরে থেকে আসেনি, তারা ছিল বাঙালীদের মাঝেই, যারা চায়নি এই দেশটি স্বাধীন হোক, যারা চায়নি বাঙালী জাতি কখনও মাথা তুলে দাঁড়াক, যারা চায়নি বাঙালী কখনও বাংলা ভাষায় কথা বলুক, বাঙালীয়ানা সংস্কৃতি লালন করুক।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে যখন নিরস্ত্র, ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনী, সেদিনই মূলত বাঙালী মেধাশূন্য হতে শুরু করেছিল। তা প্রলম্বিত হয়েছে টানা নয় মাস ধরে, যবনিকা টানা হয়েছিল এই আজকের ১৪ ডিসেম্বরে এসে। সত্যিই কি যবনিকা টেনেছিল সেইসব হত্যাকাণ্ডের? টানেনি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরও খুঁজে খুঁজে আরও অনেক কৃতী সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে।

একটা ভূখণ্ড, যারা স্বাধীনতার জন্য উদ্বেল ছিল, সেই দেশটি টানা নয় মাস এবং তৎপরবর্তি সময়ে যে বিভীষিকাময় সময় পার করেছে, যে ট্রমার ভিতর দিয়ে একটি দেশ এবং একটি জাতি আজও যাচেছ, তার কোন সুচিকিৎসা হয়েছে কি কখনও? হয়নি। কেউ ভাবেওনি এই ট্রমার কথা, কেউ ভাবেওনি দেশটার, মানুষগুলোর মানসিক চিকিৎসা খুব বেশি প্রয়োজন। একটা দেশ এতোগুলো বছরেও কোন সঠিক দিকনির্দেশনা পেল না, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বলে পরিচিত সরকারের আমলেও না। তার ওপর যে রক্তগঙ্গা পেরিয়ে একটা দেশ স্বাধীনতার মুখ দেখেছে, সেই রক্তঝরা তো থেমে থাকেনি এতোগুলো বছরেও। গত ৫০ বছরে একের পর এক বীভৎস খুন, সপরিবারে জাতির জনককে হত্যা, বিভিন্ন সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড, সড়কে হত্যাকাণ্ড, এসবকিছুই একটা জাতির মানসিক অবস্থাকে পর্যুদস্ত করে দিতে যথেষ্ট। প্রতিটি পরিবার একেকটি বিভীষিকাময় অধ্যায় বয়ে বেড়াচ্ছে মনে ও শরীরে। যার প্রভাব পড়ছে সমাজে, রাষ্ট্রে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে গত কয়েক দশকে আমাদের মতোন আমজনতাকে যা খাওয়ানো হলো তাও এখন বিবমিষা জাগাচ্ছে। কী এক ভয়ংকর সময় যে আমরা পার করছি একটা স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, কবেই বা মুক্তি মিলবে, তা আমাদের জানা নেই। আদৌ আমরা কখনও মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার আকাঙ্খাকে বাস্তবায়ন করতে পারবো কিনা, আমাদের জীবদ্দশায় তা দেখে যেতে পারবো কিনা, তা নিয়ে সংশয়ের পরও এই দেশে ২৬শে মার্চ আসে, ১৬ ডিসেম্বর আসে ক্যালেন্ডারের পাতা ধরেই। সেইসাথে আসে ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শোক দিবস।

কোন শোকই কম নয়। যে শোক আমাদের আর্দ্র করে, বিহ্বলিত করে, সবই শোক। যে জাতি একাত্তরে হারিয়েছে তার সূর্য সন্তানদের তার যেমন শোক, যে জাতি হারিয়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তি সময়ে মৌলবাদ এবং মৌলবাদিদের হাতে হাত মেলানো রাষ্ট্রীয় খুনিদের শিকার হওয়া সন্তানদের, সেই সন্তানরাও একেকজন সূর্য, তারাও দেদীপ্যমান নিজ নিজ মেধায়, বুদ্ধিতে, বিকাশে।

তাই আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সব শহীদকে, সব মেধাকে। আমরা সবার উদ্দেশ্যেই সমস্বরে বলি চলুন,
তোমাদের যা বলার ছিল
বলছে কি তা বাংলাদেশ?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.