হেই কুল ডুডস, প্লিইজ অলওয়েজ রিমেমবার, “সবার আগে দেশ”

ঈহিতা জলিল:

পাকিস্তানিরা আমাদের চাইতে অনেক বেশি দূরদর্শি ছিলো। আমরা অবশ্য এখনও দূরদর্শি নই। আমরা বাঙাল জাত দেখে বা ঠেকে কোনটা থেকেই শিক্ষা নেই না। আর সেই সময় পাকিস্তানি আর্মিকে বলা হতো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আর্মড ফোর্স। যেখানে সব বাঘা বাঘা অফিসারেরা ছিলো। সেই তুলনায় আমাদের সাধারণ বাঙালী মুক্তিকামী মানুষের ছিলো শুধুই বুকভরা আবেগ। আমি যতটুকু বুঝি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তাঁরা বিভিন্ন প্ল্যান নিয়েছিলো। প্ল্যান এ,বি, সি ইত্যাদি। একটাতে সাকসেসফুল না হলে অপরটি। অথবা যুদ্ধে হেরে গেলেও এমন কিছু করা যাতে প্রতিপক্ষ জিতে যেয়েও হেরে যায়। এটাই হয়তো সব যুদ্ধের নিয়ম।

পাকিস্তানিরা নিজেরা তো একত্রিত ছিলই। তাদের উন্নত বাহিনী, অর্থ, উন্নত অস্ত্র, রণকৌশল আর সাথে ছিলো তাদের শক্তিশালী বন্ধু-বান্ধব। তাদের এতো এতো পরিকল্পনার বিপরীতে আমাদের ছিলো একটি-ই লক্ষ্য “স্বাধীনতা”। আমাদের বন্ধু ছিলো কম, ছিলো না উন্নত অস্ত্র, বিভিন্ন বাহিনীগুলো ছিলো আক্রান্ত, ছত্রভঙ্গ, ছিল না অর্থও। তার উপর নিজেদের ঘরের লোকজনও বিশ্বাসঘাতকতা করা শুরু করলো।

কখনও কখনও আমরা খুব বলি না, “হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়”! আজকাল আমার মনে হয় আমরা জিতে যেয়েও হেরে গেছি। আর পাকিস্তানিরা হেরে গিয়েও জিতে গেছে। এটা তো আমরা সবাই জানি, পাকিস্তানিরা যখন বুঝতে পারলো তারা হেরে যাবে তখন-ই ১৪ ডিসেম্বরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়। কিন্তু এটা তো একদিনে হয়নি। তাদের কাছে তালিকা বহু আগে থেকেই ছিলো। না হলে দেশে কী শুধু এই কয়জন পেশাজীবী-ই ছিলেন? আরও অনেক ছিলেন। তাহলে বেছে বেছে তাদের-ই কেন? কারণ খুব সাধারণ, ” তাঁরা তাদের কাজের বাইরেও দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে ভাবতেন”। পাকিস্তানিরা খুব ভালো করে জানতো একটি সদ্য স্বাধীন দেশের সরকারের বুদ্ধি দেওয়ার মতো মানুষের দরকার হবে। ওরা যেতে যেতে আমাদের সেরা মেধাবীদের শেষ করে দিয়ে দেশকে চূড়ান্তভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেলো। যার ফলাফল আমরা এই স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে পরিষ্কার দেখতে পাই। যখন খেলার মাঠে আমাদের-ই বন্ধু, ভাই-বোন, সন্তানেরা নিজের দেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়।

এতো মেধার-ই শূন্যতা। তাই না?

আমার দেশ যত খারাপ খেলুক। আমি তাঁকে দশটা গালি দিতে পারি। কিন্তু তার বিপক্ষে কী অবস্থান নিতে পারি!?
তাও সেই দেশের পক্ষে যাদের কারণে আমরা বহু বছর শোষিত-নিষ্পেষিত-নির্যাতিত ছিলাম! আমরা কি কখনও নিজের পরিবারের হত্যাকারীর পক্ষ নেই? তাহলে পাকিস্তানের পক্ষ কেমন করে নেই?

আমি ভেবে ভেবে এর কোন কূল-কিনারা পাই না। আমার ভীষণ একা লাগে। আমরা কি আসলেই এমন দেশ চেয়েছিলাম? আমি ভাবি, বেশ কয়েক বছর আগে আমার বাবা যখন মারাত্মক এক্সিডেন্ট করে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের স্ট্রেচারে, সেদিনের কথা। সেই ট্রমা থেকে আমি কোনদিনও বের হতে পারবো না। আমি ভাবতে থাকি একাত্তরে পরিবার হারানো, স্বামী-সন্তান-বাবা-মা হারানো মানুষগুলোর কি কোন মানসিক কাউন্সেলিং হয়েছিলো!? কেউ কি তাদের কথা মন দিয়ে শুনেছিল? আজকে ৫০ বছর পর এসেও আমরা তাদের প্রতি কতটুকু সহানুভূতিশীল? আমরা আমাদের বাবা-মাকে বৃদ্ধ হতে দেখলে কষ্ট পাই। আমাদের সন্তানের গায়ে একটু আঁচড়ে কেঁদে বুক ভাসাই। স্বামীটি কাজের জায়গায় ঠিকঠাক পৌঁছালো কিনা সেটি ভেবে চিন্তায় শেষ হয়ে যাই। কিন্তু যাদের বাবা-মা-স্বামী-সন্তান-ভাই-বোন ফিরছি বলে আর কখনও ফিরেই এলো না? পঞ্চাশটা বছর যে সন্তান তাদের মাকে এক রঙা কাপড়ে দেখে বড় হলো, বাবার স্নেহ-বুকের ওম থেকে বঞ্চিত হলো, সন্তান হারানো বাবা-মা শুধু পথের দিকেই চেয়ে রইলো!

এমন অনেক ইতিহাস আছে। সবটা আমরা জানি না। এর যেকোনো একটা গ্রাউন্ডেই আমাদের অস্তিত্ব মাটির সাথে মিশে যেতে পারে। ঐ যে বলে না, “কেস ডিসমিস”! তেমন। এই দেশটা এমনি এমনি বাংলাদেশ হয়নি। এটি আমাদের বুঝতে হবে। জানতে হবে। স্বীকার করতে হবে। আমাদের মধ্যে হাজারও মতভেদ থাকবে, দলাদলি থাকবে, কিন্তু কিছু বিষয়ে আমাদের এক থাকতে হবে। সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদের পরিবার, যুদ্ধাপরাধ আর বঙ্গবন্ধু।

এই যে নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে তাদের সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। তাদের চিন্তা করতে হবে আমরা কেমন করে আমরা হলাম! আমরা কী ছিলাম! তাদের বুঝতে হবে যে দেশে আমরা থাকি এটি আমাদের কেউ সোনার থালায় পরিবেশন করেনি। অনেক রক্ত, সম্ভ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশের প্রতি নাগরিক হিসেবে আমাদের অনেক দায়িত্ব আছে। আমরা যেনো আমাদের প্রত্যেকের জায়গা থেকে এই দায়িত্ব পালন করি।

সবকিছুর সাথে রাজনীতির সম্পর্ক ছিলো, আছে এবং থাকবে। আমাদের এই যে ‘কুল ডুড’ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে তাদের বুঝতে হবে শুধুমাত্র টিকটক আর রেস্টুরেন্টে চেক-ইন দেওয়াটাই কুল হওয়া নয়। নিজের অস্তিত্বকে জানা, স্বীকার করা, কৃতজ্ঞ থাকার নাম হলো কুল ডুড!

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে সকল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আপনারা সেদিন ছিলেন বলেই আজ আমরা আছি। আপনাদের সাহস, দেশ প্রেম আর ত্যাগের মহিমা যুগে যুগে, দেশে দেশে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মানুষের হৃদয়ে।

ঈহিতা জলিল
লেখক ও সাংবাদিক
১৪.১২.২১
মঙ্গলবার
সন্ধ্যা-০৫.৪৫ মিনিট

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.