আমিই কন্যা হত্যার দায়ে অপরাধী!

ফাহমিদা খানম:

ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাই বলে সকালে কেউই ফোন দেয় না, ঘুমের মাঝে ফোন ধরতে গিয়ে দেখি কেটে গেছে। আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতেই দেখি ফোন বাজছে, কিন্তু অপরিচিত নাম্বার দেখে ইতস্তত করে ধরলাম। ফোনে আমাকে জানানো হলো হাসপাতালে যেতে, আমার একমাত্র কন্যা নাকি অসুস্থ, বলেই ফোনটা কেটে দিলো। গতকাল রাতেও ওর সাথে আমার কথা হয়েছে! কী এমন হলো বুঝতে না পেরে আমি জামাইয়ের নাম্বারে ফোন দিয়ে সেটাও বন্ধ পেয়ে ঘাবড়ে গেলাম বৈকি!

আমি একাই থাকি। কিন্তু পাশের রুমে দুটো মেয়ে সাবলেট থাকে, একজনের কাল রাতে নাইট শিফট ছিল জানা সত্ত্বেও ওর ঘুম ভাঙিয়ে সব খুলে বলি।
“আমাকে একটু নিয়ে যাবে মা আমি শক্তি পাচ্ছি না”।

মেয়েটা দ্রুত রেডি হয়ে আমাকে নিয়ে বের হলো। পুরোটা পথ আমার কাছে দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর মনে হতে লাগলো।
পাশের মেয়েটি এতো শক্ত করে হাতটা ধরে রেখেছে কেনো?
হাসপাতালে গিয়ে দেখি সত্যিই আমার কন্যা জীবনের সাথে যুদ্ধ করছে, কিন্তু পুলিশ এসেছে কেন? সংসার করতে গেলে কতকিছুই হয়, তাই বলে ছোট দুই বাচ্চা আর আমার জন্যে কন্যা আমার আত্মহননের মতো কাজ করতে পারে না।

“আপনার মেয়ে নিজে মরতে গিয়ে আমাকে আর আমার পরিবারকেও মারতে বসেছে। পুলিশ কিছু জিজ্ঞেস করলে খুব সাবধানে উত্তর দিবেন”।
জামাই কী বোঝাতে চাইলো? স্ত্রী কি আলাদা কেউ? আমার শব্দটাতে এতো জোর দিলো কেন?
আমি জামাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হ্যাঁ, এই ছেলেটার বিয়ের আগের এক রূপ আর বিয়ের পরের ভিন্ন রূপ দেখেও নিশ্চুপই থেকেছি। কতোটা বিশ্বাস আর ভরসা করে আমি আমার মেয়েটিকে ওর কাছে তুলে দিয়েছিলাম! সে বিশ্বাসের মর্যাদা সে রাখেনি, তবুও কন্যার জন্যেই চুপ ছিলাম।
আমি ছিলাম নার্স, আর ওর বাবা সাধারণ একজন চাকুরীজীবী। খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও সংসার সুখের ছিলো। কিন্তু ওর বাবার হুট করে মৃত্যুর পরে দুই সন্তানকে কঠিন পরিশ্রম করে মানুষ করতে গিয়ে দিনের পর দিন কষ্টকে হাসিমুখে সহ্য করে গেছি। ছেলে বড় আর মেয়ে ছোট। কুয়েট থেকে পড়ে ছেলেটা স্কলারশিপে বাইরে পড়তে যাবার আগে তার নিজের পছন্দের মেয়ের সাথে আমিই বিয়ে দিলাম। এখন বউ নিয়ে সেখানেই চাকুরী করে, আর মেয়েটা অনার্স থার্ড ইয়ারে উঠার পরেই বেশ কয়েকটা প্রস্তাব এলেও এদের কথায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। তবে মেয়েটার বিয়ের প্রস্তাব আসার খবর শুনে ছেলেটা বারবার বলতো—
“মা সময় নাও ,ভালো করে খোঁজ খবর না নিয়ে অন্যের কথায় ভরসা করো না”।

আমার এক সহকর্মীর বোনের ছেলের জন্যে পাত্রী খুঁজতে গিয়ে তারা প্রস্তাব দিয়েছিল। মেয়ে বারবার বলেছিল, নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে সে বিয়ে করবে। আমি ভেবেছি, হয়তো কোথাও পছন্দ আছে, তাই আমি নিজে বারবার জিজ্ঞেস করে ক্লান্ত হয়ে ওর বান্ধবীদের কাছে খবর নিয়ে নিশ্চিত হলাম, নাহ কিছুই নাই। ছেলের বউকে দিয়েও জিজ্ঞেস করিয়ে তারপর নিশ্চিত মনে বিয়ে ঠিক করলাম। আমার বয়স হচ্ছে, আর ছেলেটাও বাইরে থাকে, আমি মেয়েকে বিয়ে দিলে একেবারে হাত-পা ঝাড়া হয়ে যাবো, আর উপযুক্ত পাত্রপক্ষ যেচে প্রস্তাব দিয়েছে। ছেলে দেখতে খারাপ না ,সরকারি চাকুরী করে আর বউ নিয়ে ঢাকায়ই থাকবে। আমি চাইনি মেয়েকে দূরে বিয়ে দিতে। মেয়ে দেশে আমার কাছাকাছি থাকুক এটাই চেয়েছিলাম। বিয়ের আগে ছেলে আর ছেলের বউ দেশে এসে যখন প্রথম দেখা করলো, ওরা মুখ ফুটে কিছু না বললেও তাদের যে ছেলে পছন্দ হয়নি বুঝলাম, কিন্তু তখন আত্মীয়স্বজন দাওয়াত দিয়ে কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত ভাড়া করে ফেলেছি আমি।

ছেলে হবু জামাইকে নিয়ে বিয়ের জিনিস কেনাকাটা করতে গিয়ে বাসায় এসে শুধু আমাকে বলেছিল—
“অন্যের জিনিসের প্রতি লোভ খুব খারাপ মা”।
বিয়েতে আমরা সাধ্যমত করলাম, যদিও বউমা বারবার বলেছিল –
“আপনারা এতোকিছু কেন করছেন? কই, আপনি আমার পরিবার দিতে চাওয়া সত্ত্বেও কিছুই নেননি! ছেলেপক্ষ কি এ-সব ব্যাপারগুলো চাইছে? আমার ওদেরকে লোভী মানুষ মনে হইছে মা”।

বিব্রত আমিও মুখ ফুটে বলতে পারিনি ঘটকের মাধ্যমেই ওরা এসব চেয়েছিল। ঘরদোর সব সাজিয়ে দিয়েছি মেয়ের সুখের জন্যই। বিয়ের দুমাস যেতেই গ্রাম থেকে পুরো পরিবার ঢাকায় নিয়ে এলো জামাই, আর সংসারের চাপে পড়ে ক্লাস করা অনিয়মিত হবার অভিযোগ করতে লাগলো মেয়ে।
জামাই নাকি বলতো –
“আর পড়াশোনা করে কী হবে! বিয়ে তো হয়েই গেছে, মন দিয়ে সংসার করো’।
পুরো সংসারের দায়িত্ব আর কর্তব্যের চাপে পিষ্ট মেয়ের ভুল সবাই ধরলেও জামাই কখনও সেসব কানে তুলতো না। মেয়ে আমার কাছে বলতে এলে আমিও নিশ্চুপ থাকতাম, আর নিজের ভুল বুঝে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যেতাম। কন্যার ভালো করতে গিয়ে আমি যে ক্ষতিই করেছি এই বোধ যন্ত্রণা দিতো আমাকে। বেয়াই-বেয়াইন যখন নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে চাইলেন মনে হলো সন্তান বড় হলে তাদের যে আলাদা জগত হয় এই বোধই তাদের মধ্যে আসলে নাই, সামনে কন্যার অনার্স ফাইনাল, এটা কি গুরুত্বপূর্ণ না?

পেটে বাচ্চা আসার পর ওকে আমি হাসিখুশি দেখিনি, সংসারের কাজ সেরে পড়তে বসতো, একদিন বিকালে ওকে দেখতে গিয়ে দেখলাম ও তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছে।
“এই সময়ে দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকতে নাই, দুপুরের খাবার এই সময়ে কেন খাচ্ছো তুমি ? আরেকজন যে পেটে আছে সেটার জন্যে হলেও নিয়মিত হও”।
কন্যার হাসি সেদিন আমার স্বাভাবিক মনে হয়নি, আমি এক সময় নার্সিং করতাম। আমার মনে হয়েছিল সেই হাসিতে আমার জন্যে ব্যঙ্গ ছিল। বারবার আমার কাছে নিয়ে আসতে চাইলেও ওরা বলেছিল, বাসায় কোনো পুরুষ মানুষ নাই, হুট করে সমস্যা দেখা দিলে আমি নাকি সামলাতে পারবো না, অথচ আমি একসময় নার্সিং পেশাতেই ছিলাম!

বিয়ের পর কন্যার উপরে অধিকার খাটানো কি অনধিকার চর্চ্চা? আমি সেসব শুনেছি বটে! বাচ্চা পেটে নিয়ে মেয়ে পরীক্ষা দিলো, তারপরেই যমজ দুই কন্যার জননী হলো। উনারা খুশি হননি, কারণ উত্তরাধিকার আশা করেছিলেন। এই যুগেও যে এই ব্যাপারগুলো বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে আছে, আমার একদম জানা ছিলো না। বাবা-মা না হয় প্রাচীনপন্থী, কিন্তু জামাই? শিক্ষিত আর ভালো চাকুরি করা সত্ত্বেও কেনো সে তাদের বোঝাতে পারেনি? আসলে একজন মানুষ যে পরিবেশে বড় হয় সেটাই তার ভেতরে রয়ে যায়, বদলাতে হলে নিজের বোধের দরকার হয়।

সংসার আর দুই বাচ্চা দেখাশোনা করতে গিয়ে মাস্টার্স করা হয়নি, অথচ মেয়েটার স্বপ্ন ছিলো পড়াশোনা শেষ করে স্বনির্ভর হবার। শ্বশুরবাড়ির সবার আকাশকুসুম চাহিদা মেটাতে গিয়ে দিনে দিনে কেমন যেনো হয়ে গেল চোখের সামনেই। মেয়ে কিছু বলতে এলে আমিই বলতাম মেনে নাও, মানিয়ে নাও, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। সে বাসার মুরুব্বিদের মনমতো চলতে গিয়ে মেয়ের দিনের বেশি অংশ রান্নাঘরেই কাটতো, আমি বুঝতে পারতাম না সবাই সবকিছু চাপিয়ে দেবার ইচ্ছা কেন করতো! তাদের সবকিছু ফ্রেশ হতে হবে, আর গরম খাবার প্রতিবেলা প্রস্তুত করতে হবে, অথচ কেউই মেয়েকে হেল্প করতো না। জামাই পর্যন্ত বলতো —
“আমাদের মা একা হাতেই সবকিছু সামলেছেন, তুমি কেনো পারবে না? ”

এসব তুলনা শোনার পর আমিই লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম, বারবার মনে হতো নিজের স্ত্রীকে কারও সাথে তুলনা করা অন্যায়ই, ও সেভাবে বড়ো হয়নি, এতোটুকু বোঝার ক্ষমতা কেন ওর স্বামীর নাই! যে শিক্ষা ভেতর আলোকিত করে না সেই শিক্ষার মূল্য কী?
মেয়ের ডিপ্রেশন ধরা পড়ার পর জামাই তখন আমার বাসায় দিতে চাইলেও মেয়ে এলো না। আমি বুঝেছি হয়তো তীব্র অভিমানেই। আগে কেউ কিছু বললে আমাকে জানাতো, অভিযোগ করতো, সেটাও বন্ধ করে দিলো। তবে আমিই বারবার যেতাম কন্যা আর দুই নাতনির জন্যে। মেয়ের সামনে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হতো, হাসিখুশি মেয়েটা সবকিছু ছেড়ে নিজের করা জগতে একাকি থাকে, আর আমি গেলেও সামনে আসতে চাইতো না।

“আপনাদের বংশে কি কেউ পাগল ছিলো বেয়াইন?”
কথাটা বেয়াই হাসিমুখে বললেও আমি এই অপমানের জবাব দেইনি। কিছু ক্ষেত্রে আজও মেয়েদের পরিবার একতরফা জিম্মি বলা যায়। ছেলে আর বউমা বারবার বলতো, আমি যেন বাচ্চাসহ মেয়েকে একেবারে নিয়ে আসি। সত্যি বলতে কী আমি সামাজিকতা, মানুষ কী বলবে এসব নিয়ে আসলে ভীত ছিলাম। জামাই নেশা করে না, পরকীয়া করে না, বাজে কোনো অভ্যাস নাই, এটাই বুঝাতাম মেয়েকে। কিন্তু যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে সময়, সম্মান দেবার চাইতে পরিবারের কথায় চলে, এরকম মেরুদণ্ডহীন ছেলেদের কাছে বিয়ে দেবার মতো বোকামি আর না-ই। সন্তান বড়ো হবার পর তাদের নিজেদের জগৎ হবে এটা এদেশের অধিকাংশ মা বাবা বোঝেন না বলেই হয়তো আধিপত্য খাটাতে গিয়ে তাদের ক্ষতিই করেন বেশি। স্বামী নাই, ছেলে প্রবাসী, তাই আমি সারাদিন দোয়া করতাম একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই একদিনের মূল্যের দায় আজ মেয়ে আমার মৃত্যুশয্যায়। সবাই কতো কী জিজ্ঞেস করছে, কিন্তু আমি হতবিহ্বল হয়ে আছি। নিজের দুই বাচ্চা আর আমার কথাও কি একবার ওর মনে পড়েনি?
নিজের মনে দোয়া পড়ছি আর নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছি—
“মুনিয়া, মা আমার, তুই শুধু বেঁচে আয়, এখন থেকে আমি তোর সব কথা মন দিয়ে শুনবো। এতোদিন মানুষ কী বলবে অথবা ডিভোর্সি মেয়ে বলে যে ভয় পেতাম আর সেটার ধার ধারবো না। এবার আমি সত্যিই আমি তোর পাশে দাঁড়াবো। তুই বেঁচে আয়। মা, মেয়ে আর তোর দুই বাচ্চা নিয়ে নতুন জীবন হবে আমাদের। আমি ওদেরকে সামলাবো, আর তুই নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুনিয়াকে দেখিয়ে দিবি”।

নাহ, আমার দোয়াটা কবুল হলো না। স্টমাক ওয়াশ করার পরেও বাঁচানো গেলো না। মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলেই গেল, আর কখনও অভিযোগের তীর ছুঁড়তে আসবে না। নিজের সংসারে সে উপেক্ষিত ছিল, তার পছন্দ – অপছন্দের দুই পয়সার মূল্য ছিল না তথাকথিত সে সংসারে। অন্যের পছন্দের জীবন নিয়ে বেঁচে ছিল সে। এটা কতোটা ভয়ংকর ব্যাপার সে বাড়ির কারও বোধ বা বিবেকেই আসেনি। পরিবেশ মানুষকে যেমন গড়ে, তেমনি ভেংগেও দেয় বৈকি! স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে মেয়ের নিজস্বতা বলতে কিছুই আর ছিলো না, অথচ বিয়ের আগে জামাই কতো মিষ্টিমধুর কথাই না শুনিয়েছিল আমাকে! এ-সব ব্যাপারগুলো দেখেই আমি মুগ্ধ হয়ে আমার মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েছিলাম।

এটা কি আত্মহত্যা? নাকি হত্যা ? আমি আর ওর শ্বশুরবাড়ি কি ধীরে ধীরে ওকে সেদিকে ঠেলে দেইনি? সবার জন্যে নিজেকে উজাড় করে দেবার ইচ্ছে কি ওর ভেতরে আদৌ ছিল? নাকি বাধ্য করা হয়েছিল? মায়ের কাছে এলেও আমি মা হয়ে তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সেই নরকেই পাঠিয়েছি বারবার। আমার কান্না করা দরকার, কিন্তু আমার চোখে পানি আসছে না। এটা আত্মহত্যা না, এটা হত্যা, আর সে হত্যার দায় আমার আর ওর তথাকথিত শ্বশুরবাড়ির। তারা বিয়ে করে ছেলের জীবনসাথী নেয়নি, একজন শিক্ষিত দাসী নিয়েছিল মাত্র!

অভিভাবকরা সন্তানের ভালো চান কথাটা মনে হয় সবক্ষেত্রে সঠিক নাহ। আমিই কি তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ না? আমি মানুষের কথা ভেবেছি, সামাজিকতা ভেবেছি, অথচ নিজ সন্তানের দিকটা ভাবিনি। মা হয়েও কি আমি স্বার্থবাদীদের দলে না?
আমি পুলিশের কাছে এগিয়ে যাচ্ছি নিজের কন্যাকে হত্যার অপরাধ কবুল করতে, মা হয়ে সন্তানের হত্যাকারীর দলে আমিই প্রথম বৈকি!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.