রেহানা মরিয়ম নূর কি নারীবাদী সিনেমা বা রেহানা কি নারীবাদী চরিত্র?

অনুপম সৈকত শান্ত:

আবদুল্লাহ সাদের আলোচিত ছবি রেহানা মরিয়ম নূর এর কেন্দ্রীয় চরিত্র রেহানা একজন নারী, যাকে ঘিরেই পুরো সিনেমাটি আবর্তিত হয়েছে। সিনেমার কাহিনীও এগিয়েছে একটি যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নারীকেন্দ্রিক সিনেমা এবং নারী নিপীড়ন গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হওয়ায় তাই অনেকের এই সিনেমা বিষয়ক আলোচনায় নারীবাদ প্রসঙ্গ এসেছে। কারও কাছে এটি নারীবাদী সিনেমা, কেউ বলছে এই সিনেমাটিকে নারীবাদী হিসেবে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। কারও মতে, রেহানা নারীবাদী, কারও মতে নারীবাদী না। রেহানা নারীবাদী না, কারণ রেহানা কন্যা সন্তানের প্রতি স্বৈরাচারী আচরণ করে, নারীবাদী না, কারণ রেহানা তার ছাত্রীকে চড় মারে, নারীবাদী না, কেননা রেহানা তার ছাত্র এনিকে কড়া পারফিউম ব্যবহার করতে নিষেধ করার মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। রেহানার আচরণ নাকি প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক! তার মানে, রেহানার মাঝে যতখানি অথরিটি দেখা যায়, তার রাগী স্বর, দৃঢ়তা – এসব কিছুই পুরুষতান্ত্রিক!

আসলেই কি তাই? নাকি নারী ও পুরুষের মাঝে এমন স্টেরিওটাইপ বৈশিষ্ট্য আরোপ করা পুরুষতান্ত্রিক?

সিনেমায় একটি মজার জায়গা আছে। অসুস্থ রেহানা হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে দেখতে এক দম্পতি আসে। সেখানে কথায় কথায় সেই স্বামী-স্ত্রী একটি বাহাসে লিপ্ত হয়। বাহাসের বিষয়বস্তু হচ্ছে, কর্মজীবী বিবাহিত নারীপুরুষের মাঝে কর্মবণ্টনে সমতা। যেহেতু বাহাসের টপিক হচ্ছে নারী-পুরুষের সমতা বিষয়ক, সেহেতু সেই বাহাসটি হচ্ছে নারীবাদী বাহাস। চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু  “আমার ‘রেহানা মরিয়ম নূর’” শীর্ষক আলোচনায় (https://www.amadernotunshomoy.com/newsite/2021/11/18/আমার-রেহানা-মরিয়ম-নূর/) বলেছেন, “প্রকৃত নারীবাদী আলাপ হয়েছে হাসপাতালে অসুস্থ রেহানাকে দেখতে আসা দম্পতির ভেতর”। কারণ, “তারা নারী-পুরুষের সমান সমান কাজ ভাগাভাগি নিয়ে বাহাস করে”। বিধান রিবেরুর মতে, পুরা সিনেমায় “এ জায়গাটির সংলাপই বেশ উজ্জ্বল”! অথচ, এরকম সবচাইতে উজ্জ্বল নারীবাদী বাহাসের অংশটিতে “রেহানার কণ্ঠস্বরকে শূন্য করে দেয়া হয়েছে”! “রেহানা এখানে (সবচাইতে উজ্জ্বল নারীবাদী বাহাসটিতে) নারীদের পক্ষ নিয়ে কোন কথা বলে না”! নারীবাদী বাহাসে নারীদের পক্ষ নিয়ে কোন কথা না বললে রেহানা কীভাবে নারীবাদী হবে? অতএব, বিধান রিবেরুর মনে হয়েছে, দেশ – বিদেশের অনেকেই যে রেহানার মাঝে নারীবাদ দেখছে, “এই (নারীবাদী) আখ্যা দেয়াটা একটু সমস্যাসংকুল”!

আমার কাছে ঐ দম্পতির মাঝেকার বাহাসকে মোটেও নারীবাদী বাহাস মনে হয়নি! আমার কাছে বরং মনে হয়েছে, মধ্যবিত্তের স্যুডো নারীবাদকে ঐখানে একরকম মক করা হয়েছে। ঐ দম্পতির মাঝে আলাপ হচ্ছে- বিবাহিত চাকরিজীবী দম্পতির কাজ ভাগ নিয়ে। কিন্তু ঐ স্ত্রী প্রাত্যহিক জীবনে ঠিকই ভোরে উঠে আয়েশী স্বামীর জন্যে ব্রেকফাস্ট বানায়, চাকরি থেকে ফিরে এসে আবার রান্না-বান্না করে, ঘরের কাজ সব করে। যেটাকে তার স্বামী বলে- এটাই স্বাভাবিক বা নর্মাল, কেননা ‘এরকমটাই দেখে এসেছো’। আমাদের মিডল ক্লাস বুদ্ধিজীবিতা অনেকটা এইরকমই। আমরা মুখে বা ফেসবুকে বড় বড় কথা যেগুলো বলি, সেগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করি না। তা নারী-পুরুষের সমানাধিকার সংক্রান্ত হোক, কিংবা অন্যান্য যেকোন বিষয়ে মতামত দেয়ার ব্যাপারে হোক। ঐ দুইজন তাদেরই প্রতিনিধি। তাদের তর্কটাও ছিল খুব সিলি, যুক্তিগুলো দুর্বল বা উদ্দেশ্যহীন, খুনসুটির মতো করে তাদের তর্ক চলে এবং এই তর্কটাই বস্তুত ছিল বিরক্তিকর।

তো, এখানে স্যুডো নারীবাদকে মক করা হয়েছে, তা কেন মনে হলো? সিনেমার প্রধান চরিত্র রেহানার ভূমিকা দিয়ে? রেহানা এই সিনেমায় কিন্তু কী করা হবে বা হওয়া উচিৎ- এসব নিয়ে অযথা (বা বেহুদা) বাহাস করে না, সে একটি নারী নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে সরাসরি ফাইট করে, নিপীড়কের বিরুদ্ধে খুব শক্তভাবে দাঁড়ায়। সে ঐ বাহাস চলাকালে, বাহাসে অংশ তো নেয়ইনি, বরং কোনরকম গুরুত্বও দেয়নি। সে হাতে ফল কাটতে কাটতে তার ভাইয়ের সাথে অন্য কিছু নিয়ে কথা বলে (যেটা অবশ্য পরিচালক আমাদের শোনায় না), মানে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়। এই সিনেমার স্টাইল হচ্ছে, আগাগোড়া রেহানাকে ফলো করা, রেহানার সাথে দর্শকদের কানেক্ট বা এলাইন করে দেয়া! সেই রেহানা বাহাসটিকে অগুরুত্বপূর্ণ ভেবেছে, যাকে বলে কোন রকম পাত্তাই দেয়নি! এর মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছেও সেই বাহাস অগুরুত্বপূর্ণ হয় ওঠে! এই ভাবটিই সামনে চলে আসে যে এরকম মুখে মুখে নারীবাদী বাণী দেয়া বা নারীবাদী বাহাস করা খুবই গুরুত্বহীন, তাকে পাত্তা দেয়ার কিছু নেই (অন্তত আমার কাছে এরকম মনে হয়েছে)!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে এরকম সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চালানো সংগ্রামকে নারীবাদী সংগ্রাম বলবো, নাকি ব্যক্তিগতভাবে প্রাত্যহিক জীবনে কোনকিছু এপ্লাই না করে কেবল মুখে মুখে চালানো সেই বাহাসকে নারীবাদী বাহাস বলবো? বিধান রিবেরুর মতে, রেহানা মরিয়ম নূর নারীবাদী নয়। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার অনড়, অটল অবস্থান নারীবাদ নয়, সেটি হচ্ছে তার নীতিবাদিতা। রিবেরুর ভাষায় “কান্টীয় নৈতিকতার সর্বজনীন নিয়মের অনুসারী”, “সে কোন ক্ষেত্রেই অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করবে না বলে ঠিক করে নিয়েছে”! এই যে এখানে রেহানাকে কান্টীয় নৈতিকতার সর্বজনীন নিয়মের অনুসারী বানিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই একই রেহানা আমাদের বিশালসংখ্যক দর্শকের চোখে চাইল্ড এবিউজের অপরাধে অপরাধী। অনেক দর্শকের কাছে, সে মিথ্যা অভিযোগ স্থাপনকারী! শিক্ষক হয়ে মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলার মত কাজ পর্যন্ত করে এই রেহানা। এই যে দুই ধরনের চোখ, আপাতভাবে বিপরীতমুখী মনে হলেও দুই চোখেরই সাধারণ (কমন) বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – উভয়েই রেহানাকে নৈতিকতার চশমা পরে দেখেছে, এবং আমার মতে এর কারণে রেহানাকে পুরোপুরিভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। রেহানার রাগী স্বর, রুক্ষ আচরণ, শিশু সন্তানের প্রতি করা চিৎকার – সবই যে তার প্রচণ্ড সমস্যা-সংকুল জীবনের বহিঃপ্রকাশ, তা বুঝতে বাধা দেয় এমন নৈতিকতার চশমা। সে কারণেই নকলের মতো মামুলি ঘটনায় বহিস্কারের মতো বড় সাজা কেন দিলো, এই মামুলি প্রশ্নটিও এতো বড় হয়ে যায়! একজন শিক্ষক হয়ে মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীকে চড় মারাটা বড় হয়ে যায়, অথচ কোন পরিস্থিতিতে সে নিজের উপরে এই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তা দেখতে পারে না!

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে – পরিচালক সাদ ইচ্ছে করে রেহানাকে কেন্দ্র করে এমন প্রশ্ন, প্রচণ্ড বিতর্ক ওঠার ব্যবস্থা করে দিয়েছে! সবকিছু, সমস্ত ঘটনা একতরফা দেখায়নি, বরং রেহানার সমস্ত কর্মকাণ্ডকে, তার অবস্থান, তার যুক্তিবোধকে নানাভাবে প্রশ্ন করে গিয়েছে আগাগোড়া। নকল পাওয়া গেলে কড়া সাজা দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে নৈমিত্তিক ঘটনা, বাংলা অসংখ্য নাটক-সিনেমায় ভুরি ভুরি উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেখানে এমন কড়া সাজা প্রদানকে দর্শক নায়কোচিত হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ এখানে নকলকেই মামুলি অপরাধ বলছে দর্শক, কেন? তার কারণ সিনেমাতেই এই কড়া সাজার বিরুদ্ধে একভাবে যুক্তি হাজির করা হয়েছে। মেয়েটির নকল করার কোন দৃশ্যায়ন নেই, আছে মেয়েটির পায়ের কাছে একটি স্কেল পড়ে আছে! সিনেমাতেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, স্কেলটি যে ঐ মেয়েটির, তা কীভাবে রেহানা নিশ্চিত হলো, অথচ রেহানা পুরো ক্লাসরুমের সব শিক্ষার্থী বাদে ঐ মেয়েটির পাশে এসেই বসলো বা কেন – এই প্রশ্নটির কোন দৃশ্যায়ন বা আলাপ নেই। শিক্ষক আরেফিন যেমন যুক্তি করেছে এটি সামান্য অপরাধ, পরে এনিও জানাচ্ছে, বস্তুত এনিই স্কেলে খুব সামান্য কিছু পয়েন্ট লিখে দিয়েছিলো, যেহেতু তার বান্ধবী পরীক্ষা হলে নার্ভাসনেসের কারণে সব ভুলে যায়। সাথে এনি সেই মেয়েটির পারিবারিক অবস্থা, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের খরচ নির্বাহ করা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যে কত কঠিন ও কষ্টকর, তাও জানায়। এভাবেই কিন্তু সেই নকল নয়, সাজার বিরুদ্ধেও একভাবে অবস্থান হাজির করা হয়েছে!

শুধু এই এক জায়গাতেই নয়, একই কাজ পরিচালক কয়েকবার করেছে। আরেফিন যেমন রেহানাকে বলছে, সে এনিকে কতটুকু চেনে, কতটুকু নিশ্চিত যে এনির কোন দোষ নাই; তেমনি কিন্তু এনির মুখ থেকে জানাচ্ছে – এই শিক্ষক তাকে পারসোনাল প্রশ্ন করা শুরু করার পরেও শিক্ষককে তার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে, পারসোনাল বিষয় তার সাথে শেয়ার করেছে এবং শেয়ার করতে তার ভালো লেগেছে। এনি জানাচ্ছে, ঐ ঘটনার পরেও আরেফিন তাকে মেসেজ দিয়ে গিয়েছে! এমনকি নিপীড়ক শিক্ষক আরেফিনের এনির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগগুলোর এক পর্যায়ে রেহানা পর্যন্ত এনিকে গিয়ে প্রশ্ন করে ফেলে, “এনি, তুমি কি আমার কাছে কিছু লুকাইছো? তুমি কি এর আগে কখনো ডক্টর আরেফিনের রুমে গিয়েছো?” শুধু তাই না, এনি এক পর্যায়ে রেহানার বিরুদ্ধে শিক্ষক আরেফিনের চক্রান্তে সামিল হয়, অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো এনিও রেহানার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়! ফলে পরিচালক সাদ ডেলিবারেটলি এনির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আমরা জানি, আমাদের দেশে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের মতো ঘটনায় ভিক্টিমের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটিই সবার সামনে নিয়ে এসে ভিক্টিম ব্লেমিং করা হয়। ধর্ষণ মামলার বিচারক পর্যন্ত ভিক্টিমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে রায়ের এক বড় ক্রাইটেরিয়া হিসেবে বিবেচনা করে!

চাইল্ড এবিউজের ব্যাপারটিও তাই। আমাদের দেশে এটি এমনই এক বাস্তবতা যে, আমরা অনেকেই একে সংস্কৃতির অংশ মনে করি। বাংলা অসংখ্য নাটক সিনেমায় বাবা-মা শিশু সন্তানকে শুধু জোরে ধমক দেয় না, পিটানোর দৃশ্যায়নও প্রচুর পাওয়া যাবে। হুমায়ুন আহমেদ এর নাটকে রাগী বাবা সন্তানকে গাধার বাচ্চা বলছে, আর দর্শকরা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে- এমনটা অহরহ ঘটেছে! জনপ্রিয় নাটক ‘বহুব্রীহি’তে বাবা আনিস (আসাদুজ্জামান নূর) তার ছেলেকে এক থেকে তিন গোনার মধ্যে সরি বলতে বলে, কিন্তু অন্য সময়ের মত দুই গোনার পরে আড়াই- পৌনে তিন না গুনে সরাসরি তিন গুনে ফেলায় শিশু সন্তান সরি বলার সুযোগ পায় না! বাবা চড় মারে। আরেক নাটকে দেখেছিলাম, কাজের বুয়া মা, তার কন্যা শিশুকে নিয়ে কাজ করতে গিয়েছে, সেই শিশু কিছু একটা অকারেন্স ঘটিয়েছে, বাড়ির মনিব মা’কে বেশ কথা শুনিয়েছে বা মেয়েকে আর নিয়ে আসতে নিষেধ করে দিয়েছে, সেই রাগ মা ঝেড়েছে মেয়ের উপরে শুধু ধমক দিয়ে না, মারপিট করে। এরকম অসংখ্য নাটকে বকাঝকা এমনকি মারপিটের পরেও কিন্তু চাইল্ড এবিউজের অভিযোগ দর্শক এভাবে করেনি, যেমন রেহানাকে নিয়ে করছে!

কারণ কী? কারণ হচ্ছে – পরিচালক সিচুয়েশন এমনভাবে তৈরি করেছে, সেখানে শিশু ইমুর প্রতি রেহানার যে চিৎকার করে ধমক দেয়া, কান ধরে উঠবস করানো, বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে দরজায় হাত থেঁতলে দিতে চাওয়া, সেটা সাধারণ নৈমিত্তিক হিসেবে থাকে না! প্রচণ্ড অস্বস্তি তৈরি করে, ভয়ানক দম বন্ধ করা অবস্থা তৈরি করে! শিশু ইমু যখন কাঁদতে কাঁদতে মাকে দরজা খুলে দিতে বলে, সেরকম বন্দীত্ব দশার অনুভূতিটা দর্শকের মাঝেও তৈরি হয়! বহুব্রীহি নাটকে যেমন চড় মেরে বাবা সাথে সাথেই ছেলে টগরকে কোলে জড়িয়ে নেয়, বা অন্য নাটকটিতে মেয়েকে মারার পরে মেয়ের জ্বর এলে মা সারারাত মেয়ের সেবা করে আর অনুতপ্ত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে দেয়, তাতে দর্শকরা একরকম দম ফেলার জায়গা পায়। কিন্তু রেহানা মরিয়ম নূরে পরিচালক আগাগোড়া দর্শকদের সেই ব্রিদিং স্পেস দিতে চায়নি। শেষ দৃশ্যে ইমুর সাথে রেহানা যা করেছে, তার পরপরেই যদি দরজা খুলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতো, বা বুঝিয়ে বলতো কেন ঐ ফাংশনে নিয়ে যেতে পারছে না, তাহলে দর্শক দম ফেলার জায়গা পেতো ঠিকই। কিন্তু সিনেমাটি যেভাবে অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে যায়, তা কি পারতো? এমন কোন দর্শক পাওয়া যাবে, শেষ দৃশ্যে যে ইমুর সাথে কানেক্ট করতে পারেনি? ইমু যে আকুতি নিয়ে দরজা খুলতে বলে, সেই আকুতি দর্শকের মাঝেও তৈরি হয়! কিন্তু এই বন্দীত্বদশা কি একা ইমুরই? দরজার এপাশে থাকার পরেও রেহানাও কি একই রকম প্রচণ্ডভাবে বন্দী নয়? ইমুর ঐ কান্না কি রেহানারও নয়? সেও কি বন্ধ দরজা খুলে দিতে আকুতি জানায় না? মুক্তি চায় না? এই পুরুষতান্ত্রিক বদ্ধ সমাজ কি রেহানাকে একইভাবে বন্দী করে রাখেনি?

এখানেই নারীবাদ প্রাসঙ্গিক। এনির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে হাজারও সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু তাতে তার উপরে যৌন নিপীড়নের ঘটনা মিথ্যা হয়ে যায় না! রেহানা নিপীড়ক শিক্ষক আরেফিনের নামে যে অভিযোগ করেছে তা মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু আরেফিন যে যৌন নিপীড়নের ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা তো মিথ্যা নয়! এনি যে অভিযোগ আনতে পারে না, তার পরিবার ও সমাজ নিয়ে চিন্তা, জানাজানির ভয়, প্রমান করতে না পারার ভয়, তাকেই অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারে সেই ভয়- এমন নানান আশংকায় সে নিজে অভিযোগ দায়ের করে না, রেহানাকেও অভিযোগ দায়ের করতে নিষেধ করে, আত্মহত্যা করবে বলে হুমকি দেয়, – এটাও এক নিদারুন বাস্তবতা! আমাদের দেশে অধিকাংশ নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার প্রেক্ষাপট এনির মধ্য দিয়ে দারুণভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে এমনটা মনে করার উপায় নাই যে, নিপীড়িত নারী তার উপরে ঘটা অপরাধের প্রতিকার চায় না, বিচার চায় না, অপরাধীর সাজা হোক তা চায় না! নিপীড়িত নারী চুপ থাকে মানে এই না যে, সে তার উপরে হওয়া অপরাধকে মামুলি বা অগ্রাহ্য করার মত সামান্য কিছু মনে করে! ফলে, রেহানা এখানে বস্তুত নিপীড়িত নারীদের সেই আকাঙ্খাকেই ধারণ করেছে, নারীবাদী কন্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু নিপীড়নের শিকার এনি যেখানে নিশ্চুপ, সেখানে রেহানা কেন এই নিপীড়নের ঘটনা মেনে নিতে পারে না? সিনেমাতেও এই প্রশ্নটি রাখা হয়েছে। এনি নিজেই প্রশ্ন করেছে, “আপনার সাথে তো কিছু হয়নি, আপনি কেন এমন করছেন?” যার সাথে নিপীড়নের ঘটনা ঘটে তার পক্ষে অপরাধীর বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়ানো অনেক সময়ই কঠিন হয়ে যায়, প্রচণ্ড রকম ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, ঐ মুহূর্তে ন্যুনতম মানসিক দৃঢ়তা অনেকেরই থাকে না! আমাদের সমাজে (এমনকি ইউরোপেও অনেক সময়ে) নারীরা নানা কারণেই দাঁড়াতে পারে না, কিন্তু যে দগদগে ঘা তৈরি করে, তার পাশের একজন নারীকে যখন একই রকম নিপীড়িত হতে দেখে, তখন যেকোনো রকম বাধা উপেক্ষা করে সেই নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে! সামাজিক বাস্তবতার কারণেই, একজন নারীর পক্ষে নিজের উপরে ঘটা যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চাইতে অন্য নারীর উপরে নিপীড়নে সোচ্চার হওয়া সহজ।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, রেহানাও কি এনির মত যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলো। সিনেমাটিতে এ ব্যাপারে কোন তথ্য বা সূত্র দেয়া হয়নি, কিন্তু আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সাধারণভাবে নারী মাত্রই কোন না কোন ভাবে, জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে নিপীড়নের শিকার! ফলে একজন নিপীড়িত নারী আরেকজনের সাথে কানেক্ট করতে পারে। সেই কানেকশন আমরা দুটো দৃশ্যে দেখি। এনি তার হোস্টেল রুমে রেহানাকে পুরো ঘটনা বলার পরের দৃশ্যে আমরা দেখি করিডোরে রেহানার কাঁধে এনি মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে, আর রেহানা এনিকে জড়িয়ে আছে, তার হাত এনির পিঠে – এই যে এনির ভরসা হয়ে যাওয়া, এই যে কানেকশন – এটাই এনির উপরে ঘটা নিপীড়নকে রেহানা যে নিজের মাঝে ধারণ করেছে বা করতে পেরেছে তার দারুণ চিত্রায়ন! এই কানেকশন আমরা শেষের দিকে আবার দেখি! এনি নকল নিয়ে রেহানার বিরুদ্ধে হাত তুলে, রেহানা তাকে চড় মারে – এমন ঘটনার পরেও দেখা যায় রেহানা যখন হাসপাতালে, এনি তার জন্যে একটি টিফিন বাটিতে খাবার ও চিঠি নিয়ে আসে। সেখানেও আমরা এই কানেকশনটি দেখি! নিপীড়কের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যে পরাজয়, তা এই দুই নারী এভাবেই একে অপরের মাঝে ভাগাভাগি করে নেয়!

তারপরেও প্রশ্ন থাকে, অন্য একজনের উপরে নিপীড়নে তার পাশে দাঁড়ানোর জন্যে নিজের উপরে যৌন নিপীড়নের মিথ্যা অভিযোগ হাজির করা কতখানি সঠিক বা নৈতিক বা পলিটিক্যালি শুদ্ধ? কিংবা আদৌ কি জরুরি ছিল? আগেই বলেছি, এই সিনেমাটিকে নৈতিকতার চশমায় দেখতে গেলে এমন ডিলেমাতেই পড়তে হবে। সঠিক বা বেঠিক, নৈতিক বা অনৈতিক কিংবা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ – এমন বাইনারী বিচারধারা দিয়ে কোন সিনেমা, সাহিত্য কিংবা তার সমাজবাস্তবতাকে বুঝতে চাওয়ার মাঝে একরকম বায়াসনেস বা অন্ধত্ব থাকে। সেই বায়াসনেস আমাদের ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত, মানব চরিত্রের মননজগতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া – এসব দেখতে দেয় না! আর, কোন কাজ কতখানি জরুরি, তা নির্ভর করে উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি একাগ্রতার উপরে। নিপীড়ক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক, সে যেন বিনাবিচারে বা একেবারে বিনাবাঁধায় পার পেয়ে না যায়- এমনটা রেহানা চেয়েছে। কেননা রেহানার মনে হয়েছে, নিপীড়কের মাঝে এতটুকু অনুশোচনা না থাকলে, একই কাজ সে বারেবারে করবে, ফলে অন্য শিক্ষার্থীও নিপীড়নের শিকার হবে। ফলে, নিপীড়নের এই ঘটনাটিকে সে সামনে আনতে চেয়েছে। এই চাওয়া তার এমনই তীব্র ছিল যে, যখন এনিকে অভিযোগ দায়েরে রাজি করাতে পারেনি, তখন উপায়হীন হয়ে নিজের নামেই অভিযোগ স্থাপন করাকেই একমাত্র উপায় হিসেবে দেখেছে। ফলে, অবশ্যই তার কাছে এই আপাত ‘মিথ্যা’ অভিযোগ দায়ের করা জরুরি ছিল।

সিনেমা থেকে বেরিয়ে সাধারণ বাস্তবতায় যদি দেখি, নারী আন্দোলনে (রেহানাকে যদি নারী আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে দেখি) এমন ‘মিথ্যা’ অভিযোগ কি জরুরি? সেক্ষেত্রে, সাম্প্রতিক “রাতের রানী” এক্টিভিজমের উদাহরণ টানতে পারি। পরীমনিকে যখন আইন-শৃংখলা বাহিনী, মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবাই “রাতের রানী” বলা শুরু করলো, এমনকি প্রগতিশীল বলে খ্যাত বুদ্ধিজীবী, কবি সাহিত্যিক, বাম রাজনীতিবিদও পরীমনির বাসার মিনি বার, রাতবিরাতে ধনীদের সাথে পার্টি, ক্লাবে যাওয়া এসব দেখিয়ে “রাতের রানী” হিসেবে স্বীকার করে নেয়, তখন ফেসবুকে পরীমনির পক্ষে দাঁড়াতে অসংখ্য নারী নিজের প্রোফাইলে রাতের রানী ব্যানার যুক্ত করেছে!

এমন আরও অনেক আন্দোলনের কথাই বলা যাবে। বেশ্যা যখন গালি হয়, তখন “আমি বেশ্যা” বলে যে নারী প্রতিবাদ জানায়, সেখানে প্রকৃতপক্ষে সেই নারী “বেশ্যাবৃত্তি”র সাথে জড়িত কিনা, তার সত্যতা-মিথ্যা যাচাইয়ের চাইতেও কানেকশনটি গুরুত্বপূর্ণ। জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে যখন ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীদের ভিক্টিম ব্লেমিং করা হচ্ছিলো, তাদেরকে বিয়ে করবে কে বলে খোদ সরকার দলীয় ও প্রশাসনের শিক্ষকরা হেনস্থা করছিলো, তখন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সবাই সামনে এসে বলেছিলো “আমি ধর্ষিত”, “আমি যৌন নিপীড়নের শিকার”! রেহানা মরিয়ম নূরে রেহানাও কি একই ভূমিকায় অবতীর্ণ নয়?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.