বেদনার নীল চোখে দেখা রেহানা মরিয়ম নূর: আমার ভাবনা

প্রমা ইসরাত:

পপকর্ন চিবুতে চিবুতে হালকা মেজাজে দেখতে থাকা বিনোদন নয়, বিষাদমাখা অসাধারণ বেদনার একটা ছবি এই রেহানা মরিয়ম নূর। মুভির প্রধান চরিত্র রেহানা মরিয়ম নূর, তার জীবন, তার বেদনা, তার সংগ্রামকে নিয়েই এই মুভি। আমার বিবেচনায় তাই রেহানার জগত রেহানার চোখেই দেখাতে চেয়েছেন পরিচালক। বেদনার নীল রঙ যেন এই ব্লু ফিল্টার। বৃষ্টি, গুমোট আবহাওয়া, ঠাণ্ডা, অনুজ্জ্বল আলো যেন রেহানার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। অনবরত হালকা নড়ে যাচ্ছে ক্যামেরা। যেন রেহানার জীবন যতটুকু পীড়াদায়ক, তা উপলব্ধি করাতেই এই চোখের পীড়ন।

রেহানা মরিয়ম নূর এর গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র ডা. আরেফিন। শিক্ষক হিসেবে আরেফিন ছাত্রদের কাছে বেশ পছন্দের। প্রশ্ন কেমন হয়েছে বলে খোঁজ নেয় ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটির। সকল শিক্ষার্থী তার কাছে নানান কাজে যায়, যেহেতু সে স্টুডেন্ট এফেয়ার্স এর ইনচার্জ। শিক্ষক হিসেবে সহজ, পরীক্ষক হিসেবে তেমন কঠোর নন। পরীক্ষায় টুকটাক নকল করা তার কাছে তেমন কোন বড় ব্যাপার না। তিনি এগুলোকে ছোটখাটো ভুল হিসেবে ছাড় দিয়ে দিতে পছন্দ করেন। একজন স্বামী, হবু পিতা, ভালো শিক্ষক হবার পরও আরেফিন চরিত্রটি আদর্শ একজন নিপীড়ক। তার চোখের দৃষ্টিতে নারী সহকর্মীর অস্বস্তি হয়, তিনি অকারণেই ঘনিষ্টতা দেখাতে চান তুমি ডেকে, সকলের সামনেই নারী সহকর্মীর গায়ে হালকা চাপড় দেন, যেটাতে তার নারী সহকর্মী ভ্রু কুঁচকে ফেলেন। আরেফিনের মতো এরকম, অস্বস্তি তৈরি করে এমন চাহনি দেয়া, কথা বলতে বলতে হাতে গায়ে, মাথায় খুব সহজভাবেই হাত দিয়ে অস্বস্তিকর স্পর্শ করে, কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব ধরা , যৌন নিপীড়ক পুরুষ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর আছে।

রেহানাকে বোঝানোর জন্য, “বাচ্চাদের মতো কথা বলো না”, “তুমি হ্যান্ডেল করতে পারবা না”, “তুমি কিছুই জানো না”, “তুমি কিছুই দেখোনি”, “তুমি কিন্তু আমার কথা শুনতেছ না”, “তুমি আমাকে এটা করতে বাধ্য করেছো” এরকম গ্যাস লাইটিং করে গেছে ক্রমাগত। এক জায়গায় রেহানা যখন বলে যে, কী করবেন আমাকে, রেইপ করবেন? তখন আরেফিন বলে ‘তোমার মতো মেয়েরাই রেইপড হয়’। অর্থাৎ আরেফিন মনে করে, নারীর রেইপড হওয়ার পিছনে আসলে নারী নিজেই দায়ী। আরেফিনের এই মানসিকতা থেকেই অনুমান করা যায় যে, ছাত্রী এনির ফেসবুকে করা কমেন্ট, বিভিন্ন সময়ে তার রুমে আসা, এবং পরবর্তীতে বান্ধবীর পরীক্ষায় এক্সপেল হওয়া নিয়ে অনৈতিক সুপারিশ করতে আসা, তাকে লাইসেন্স দিয়ে দেয় এনির বুকে হাত দেয়ার। আরেফিন ভাবে, নিজে থেকে কল দিয়ে দেখা করতে চেয়েছে মানে এই মেয়েটি এভেইলেবল এবং তার সাথে এমন সেক্সুয়াল আচরণ করলে কোন সমস্যা নেই। তাই আরেফিনের কাছে এইটা একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং, কোন অপরাধ নয়। সেজন্য বারবার সে এনিকে আলাদা করে কথা বলে বিষয়টার সমাধান করতে চায়। তার কাছে, পরীক্ষায় নকল করাটা যেমন হালকা বিষয়, ছাত্রীর গায়ে হাত দেয়াও হালকা বিষয়।

মুভি দেখতে দেখতে অসংখ্য নারী নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাকেই মিলিয়ে নিতে পারবেন। যেমন এরকম অস্বস্তিকরভাবে গায়ে হাত দিয়েছিলো আমার ইউনিভার্সিটির এক বড় ভাই, রাস্তা ক্রস করার সময়। আমি আমার এক বান্ধবীকে সেটা বললে সে আমাকে বলে যে, তুই হোস্টেলে থাকিস তো, তাই তোর সাথে এরকম করছে, আমি হইলে জীবনেও সাহস পাইতো না। এবং এক পর্যায়ে আমার মনে হয় যে, আমার কথাটা বান্ধবী বিশ্বাস করেনি। এই যে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের ঘটনাটা অন্যকে বিশ্বাস করাতে না পারার যন্ত্রণা, এটা ভয়াবহ। ভয়াবহ যন্ত্রণা হয় যখন উল্টো কাছের সহকর্মী, সহপাঠী, পরিবারের মানুষই ভুল বুঝে।

এবার কথা বলি রেহানা চরিত্রটি নিয়ে। রেহানা। রেহানা নামটুকু লিখেই বসে আছি দশ মিনিট। কী লিখবো, কীভাবে লিখবো ভাবছি। রেহানা মরিয়ম নূর নিয়ে করা নেগেটিভ সব মন্তব্যগুলো মাথায় নিয়ে রেহানাকে কি ডিফেন্ড করবো? না নিজের মতো করে লিখে যাবো যে আমি কী ভাবছি?
রেহানা মরিয়ম নূর যিনি একজন ডাক্তার, একজন শিক্ষক, একজন মা, একজন কন্যা, একজন বোন এবং একজন নারী। তার ভেতরে একট ভয়াবহ রকমের অস্থিরতা। তার ভেতরে স্বাভাবিক থাকার, এবং স্বাভাবিক থেকে সব কাজ করে যাওয়ার, সব দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা।

মৃত স্বামীর ঘড়ি তার হাতে। সাধারণ, জিন্স ফতুয়া, আর পায়ে বেল্টসহ স্যান্ডেল পরে মাথায় পাতলা চাদর বা ওড়না পেঁচিয়ে চলে রেহানা। রেহানা ডায়াবেটিক, তাকে ইনসুলিন নিতে হয়, ডায়াবেটিক পেশেন্ট এর মতোই তার এংজাইটি, ডিপ্রেশন, স্ট্রেস হয়। তার একটু বেশি শীত করে। রেহানা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, যখনই সুযোগ পায় টেবিলে একটু মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে নেয়। রেহানা হঠাৎ হঠাৎ চমকে যায়, কাঁধ কিছুটা নুইয়ে হাঁটে এবং দাঁড়ায়। সামান্য দরজা না খুললে অস্থির হয়ে প্যানিক করতে থাকে রেহানা। তার ভেতরের অসহায়ত্ব, ক্লান্তি, একাকিত্ব,নানান দায়িত্বের ভার, নিজের পরীক্ষার দুশ্চিন্তা তার চোখে মুখে নাকে ফুটে ওঠে। রেহানার ইচ্ছে ছিলো টেবিল টেনিস খেলার, কিন্তু সে হতে পারেনি। শৈশব-কৈশোরেই ভেঙে গেছে তার নানান স্বপ্ন, যেমনটা আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মেয়েরই যায়।
রেহানা বেদনা যাপন করে, সেই বেদনাদায়ক জীবনে একমাত্র দুশ্চিন্তা এবং একমাত্র আনন্দ তার শিশু সন্তান ইমু।
রেহানা পরীক্ষক হিসেবে কঠোর, কারণ শিক্ষক হিসেবে, পরীক্ষক হিসেবে সে বিশ্বাস করে, যে শিক্ষার্থীদের হাতে কিছুদিন পর মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব থাকবে, তাদের নকল করতে দেয়া একটা ভয়াবহ অন্যায়। পরীক্ষা হলের মাঝেই সে লুকিয়ে তার মেয়ের খোঁজ নেয়, ভাই রনি তাকে ঠিকমতো আনতে গেলো কিনা সেটার খোঁজ নেয়, বিরক্ত হয়, মেজাজ খারাপ করে।
রেহানার রোল মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাই ফোনে মায়ের সাথে চিবিয়ে কথা বলা রেহানা, সিনিয়র কাওকে দেখে, ফোন নামিয়ে নরম সুরে সালাম দেয়, কথার উত্তর দেয়, এবং পর মুহূর্তেই আবার চোয়াল কঠিন করে মায়ের সাথে কথা বলে। পরীক্ষার হলে আরেকটা কথা বললে হল থেকে বের করে দিতে চাওয়া ছাত্রীটি যখন হন্তদন্ত হয়ে শিক্ষকের রুম থেকে বের হয়, তখন সেই শিক্ষার্থীকেই রেহানা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মুহূর্তেই রেহানা মা থেকে শুধু নারী রোলে চলে যায়। বাড়ি ফেরার তাড়া ভুলে সে অ্যানির পাশে থাকে। রেহানা নিজ গরজে ছাত্রীর রুমে যায়, তাকে বোঝানোর জন্য, এমনকি রেহানা নিজে ভিক্টিম সেজে আরেফিনের নামে রিপোর্ট করে। সে অন্য সকল মেয়ে, যারা যারা আবারও এরকম যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারে তাদেরও বাঁচাতে চায়। তার নিজের জীবনেও হয়তো এমন ঘটেছিলো অতীতে। আর আরেফিনের নোংরা স্পর্শ, দৃষ্টির শিকার তো রেহানা নিজেও। তাই অ্যানির জন্য মিথ্যে রিপোর্ট করতেও সে পিছপা হয় না। কারণ রেহানা বিশ্বাস করে, এটা শুধু তার বা অ্যানির বিষয় নয়। এটা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে একটা লড়াই।

রেহানা মরিয়ম নূর মুভিটিতে বেশ কয়েকটি দৃশ্য আমাকে ছুঁয়ে গেছে। এর মধ্যে অ্যানির রুমে, শুয়ে থাকা অ্যানির হাত ধরে বসে থাকা রেহানা আর চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকা ইমু যেন আমাদের সমাজেরই নারীর শৈশব কৈশোর আর যৌবনের প্রতিচ্ছবি।
ফেমিনিস্ট লেন্সের ইন্টারসেকশনালিটি (Intersectionality) অন্তঃবিভাগীয়তার একটা বড় চিত্র, পরিচালক মুভিটিতে তুলে ধরেছেন। সেখানে ডাক্তার হওয়ার পরও রেহানা একজন সিংগেল মাদার হিসেবে অন্য অভিভাবকদের কাছে, বাচ্চার স্কুলের শিক্ষকদের কাছে ব্যর্থ অভিভাবক, যিনি সন্তানের খেয়াল রাখেন না। রেহানা নিজের কাছে নিজে একজন অপরাধী মা, কারণ ইমুর প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ সে দিতে পারে না। আবার এই রেহানাই ছোট ভাই এর উপর হুকুম চালায়, কারণ তার হাত খরচ সে দেয়, মায়ের সাথে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে, কারণ তার আয়ে সংসার চলে। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম নারী হলেও রেহানার জন্য তিনি কিছুই করতে পারেন না। তিনি প্রিন্সিপাল, কিন্তু তিনি নারী, শুধু নারীই নন, তিনি একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী, তিনি আপোস করে কৌশল করে টিকে থাকাকে প্রাধান্য দেন। রেহানার প্রতি কোন সমানুভূতি না দেখিয়ে তিনি তার নিজের পারিবারিক গল্প জুড়ে দেন। রেহানাকে অবিশ্বাস করেন, যেটার আশঙ্কা শুরুতেই অ্যানি করেছিলো।

অ্যানি রেহানার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, রেহানা সেটা সহ্য করতে না পেরে অ্যানির গালেই চড় কষিয়ে দেয়। অনেক অনেক পুঞ্জীভূত রাগ ক্ষোভ হতাশা আর বেদনা নিয়ে রেহানা চিৎকার করে , তার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কলাপসিবল গেট আটকে দিলে ক্রমাগত গেট ধরে ঝাঁকাতে থাকে তার ছোট ইমুর কাছে যাবার জন্য। রেহানার এমন আগ্রাসন, বা ছোট্ট ইমুর চিমটি কাটা ছেলে সহপাঠীর হাত কামড়ে দেয়াটা বারবার নিরবে পীড়ন সহ্য করার পর হঠাৎ একটা আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া মনে হয়।

মুভির শেষ দৃশ্যে ইমুকে দেখে আমার বুক ভেঙে গেছে। আমি ভাবছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম , এতটুকু শিশু এতো অসাধারণ কাজ কীভাবে করলো! সহপাঠীর হাতে কামড় দেয়ার জন্য স্যরি না বললে ইমুকে পারফর্ম করতে দিবে না স্কুল, এই কথাটা রেহানা ইমুকে বলতে পারেনি। ইমু শুধু জানে মা না করছে। কেন করছে তা সে জানে না। রেহানা ইমুকে আটকে দেয়, এবং নিজের দমবন্ধ করা জীবন, এংজাইটি, বন্ধ ঘরে আটকে পড়ে অনবরত দরজায় দুম দুম করে আঘাত করার ট্রমা সে ইমুর মধ্যে ট্রান্সফার করে দেয়।

এই মুভি দেখার জন্য বাংলাদেশের মাত্র গুটি কয়েক লোক মানসিকভাবে প্রস্তুত।
বাদ বাকি যারা আছেন তারা ওই কলাপ্সিবল গেইট আটকে ‘রিজাইন রিজাইন’ বলে চিৎকার করা স্টুডেন্ট যারা রেহানাকে মাথা খারাপ, মাথায় সমস্যা আছে বলতে বলতে তার মুখে পানি ছুঁড়ে মারে, তাদের দলের। তারা ওই নেমপ্লেটে রেহানার নামের উপর Psycho লিখে রাখা দলের।

যথেষ্ট সমানুভূতিশীল না হলে রেহানাকে বোঝা সম্ভব না। রেহানা মরিয়ম নূর দেখে যে অনুভূতি তৈরি হয় তা সকলের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই মুভিটি তৈরির জন্য। নাম ভূমিকায় অভিনয় করা আজমেরী হক বাঁধনকে আমি আজীবন শ্রদ্ধা করে যাবো তার অসাধারণ পারফর্ম্যান্সের জন্য। তিনি একজন অসাধারণ গুণী অভিনয় শিল্পী। ছোট্ট ইমুর চরিত্রে অভিনয় করা জায়মাসহ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করা সকল অভিনয় শিল্পী চমৎকার কাজ করেছেন। তাদের সকলের প্রতি রইলো আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
অভিনন্দন রেহানা মরিয়ম নূর টিম।

লেখক-প্রমা ইসরাত
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.