নারীর আইডেন্টিটি এবং আইডেন্টিটি ক্রাইসিস

সৈয়দা নূর-ই-রায়হান:

পুরুষদের বলতে শুনি, নারীবাদী হইতে হইলে নাকি নারীবাদ নিয়ে অনেক পড়াশোনা করতে হয়। আমার কোন পড়াশোনা নাই। আমি একজন মূর্খ নারীবাদী। আমি জীবন যৌবন দিয়ে যা বুঝি, সেটাকে ভাষায় রূপ দিয়েই নেড়িবাদী (স্মার্ট ভাইয়ারা বলেন ফেমিনাজ্জি) হিসাবে নানান স্বাদের গালাগাল খেয়ে পেট ভরাই।

আজকে যা নিয়ে লিখতে বসেছি, সেইটার জন্য ভাবলাম একটু গুগল ঘাঁটি। ঘেঁটেঘুটে মাথায় কিছুই ঢুকলো না। ফলে অটো যা বেরুচ্ছে, সেটাই উগরাইতে বসছি।

ছোটবেলায় বেশিরভাগ জায়গায় আমার পরিচয় ছিল আমি টিএনও স্যারের মেয়ে। স্কুলে, খেলার মাঠে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতায়, ছোট্ট মফস্বলের রাস্তাঘাটে আমি শুধুই টিএনও স্যারের মেয়ে। খাগড়াছড়ি যেয়ে আমার বন্ধুমহল বিরাট হইল। যে কারণেই হোক, বিদায়বেলায় একটা লাইব্রেরি থেকে আব্বুর বিদায় সম্বর্ধনায় কয়েকজনকে ফিসফিস করে বলতে শুনলাম, ওইটা জেবার বাবা। সেই বিদায়ের সময়টায় অনেকখানি টের পাইলাম, খাগড়াছড়িতে আব্বুকে অনেকে জেবার বাবা হিসাবেই চিনছে।

আত্মপরিচয়ের স্বাদ সেই প্রথমবারের মতো পাওয়া।

আব্বুর কলিগদের চিনতাম তাদের নাম বা পদবী দিয়ে। আন্টিদের কারও নাম ছিল না। স্বামীর নাম বা পদবীর অনুসর্গ হিসাবে ভাবী শব্দটা যোগ হয়ে হইত তাদের পরিচয়। টিএনও ভাবী, এডিসি ভাবী, ম্যাজিস্ট্রেট ভাবী। প্রশাসন ছাড়া আরও অনেক ক্ষেত্রেই তাই। স্বামীর নাম মূলপদ, এরপর অনুসর্গ ‘ভাবী’। এতো সবের মাঝখানে কোথাও নাই নারীর পরিচয়ের কোন অস্তিত্ব। ঢাকা এসে আম্মু তার ছেলে মেয়েদের স্কুলে নিয়ে যাইত। বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গল্প করতো বাকি সব মায়েদের সাথে। তারা কেউ ভাবী ছিলেন না। তদুপরি, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার কুণ্ঠা তারা কাটায়ে উঠতে পারেন নাই। কেউ ছিলেন অমুকের মা এবং কেউ তমুকের মা। আমার মা-ও ছিল অমুকের মা, তমুকের মা।
এই সব নারীদের নাম কেউ কোনদিন জিজ্ঞেস করে নাই। তাদের নাম তারা নিজেরা কখনো একে অপরকে জিজ্ঞেস করেন নাই। তাদের নাম তারা নিজেরা কখনো বলার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। তাদের নাম আমরা কখনো জানার আগ্রহ বোধ করি নাই।

নারীর নাম ভুলে যেতে শিখলাম কবে আমরা? নামহীন এই সকল নারী কি আসলেই পরিচয়হীন ছিলেন? কতোটুকু পরিচয় থাকলে নারীর নাম উচ্চারণ করা সহজ হয়? নারীর নাম উচ্চারণ করতে যেখানে আমাদের বাঁধে, সেখানে নারীর পরিচয় নিয়ে উচ্চবাচ্য করা কতোটুকু সাজে আসলে?
প্রশ্নগুলার উত্তর পাইতে হয়তো অনেক গবেষণা করা লাগবে। অনেক থিয়োরি ও ইতিহাস ঘাঁটলে হয়তো আমার মতো মূর্খ নারী এর মাজেজা বুঝবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জ্ঞানের মাত্রা নির্বিশেষে নারীমাত্রই অন্তত এতোটুকু জানি যে নারীর পরিচয় অস্বীকৃত, অপাংক্তেয়, এবং অদৃশ্য। ঠিক তার নামের মতোই।
এই অপাংক্তেয়, অস্বীকৃত, অদৃশ্য পরিচয়ের কারণে এই প্রজন্মের লাখ লাখ নারী দেশের চাক্কা হালের বলদের মতো ঘুরাইতে থাকা সত্ত্বেও তাকে এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনে আটকায়, বাড়ি ভাড়া দেয় না, ভাড়া দিলেও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে তার স্লাট শেমিং চলে, রাতের বেলা রাস্তায় দাঁড় করায়। সে বিয়ের আগে ঘুরতে যাইতে পারে না, বিয়ের আগে পড়তে যাইতে পারে না। বিয়ের পরে তো আরও পারে না। নারীর পরিচয়হীনতায় অভ্যস্ত আমরা নামকরা নারীদের তাই ‘বেশ্যা’ বলে আরাম পাই। তাদের কাপড়ের দৈর্ঘ্য আর স্বচ্ছতা মাপতে আনন্দ পাই। তাদের ফেসবুকে ট্যাগ খাওয়া পুরুষদের স্টক করার আগ্রহ পাই। আর কিছু না পাইলে তাদের নাম অস্বীকার করার সর্বশেষ রাস্তা ধরে নামের পিছনের পুরুষটার অবদান কতোটা এসেনশিয়াল ছিল, তা আহাউহু করে বলে বিরাট আত্মতৃপ্তি পাই। এমনকি সে উঠতে উঠতে হিমালয়ে উঠে গেলেও।

নারীর এই অপাংক্তেয়, অদৃশ্য, অস্বীকৃত পরিচয়ের কারণে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত নারীর কাছে তার অর্জন জানতে চাইলে সে তার বাচ্চার জন্ম ও স্বামীর খ্যাতি সামনে নিয়ে আসে। এই পরিচয়ের সামাজিক অস্বীকৃতির কারণে ক্ষমতায়িত নারী ঘরের চার দেয়ালের ভিতর মেরুদণ্ডটা খুলে রেখে ঘর সংসার টিকায়ে রাখে। এই নামহীন অস্তিত্বকে সার্থক করতে সে নিজেকে শত টুকরা করে বিলাইতে থাকে। বাপের সম্পত্তি থেকে পাওয়া অপমানজনক হিস্যাটাও ভাইদের জন্য ছেড়ে দিয়ে সে নিজেকে অমূল্য প্রমাণ করতে চায়। পরিচয়হীনতায় অভ্যস্ত নারী শত দিক দিয়া সক্ষমতর হওয়া সত্ত্বেও প্রমোশন ঠেলে দেয়, চাকরি ছেড়ে দেয়, শখ বিসর্জন দেয়, বন্ধুসঙ্গ ত্যাগ করে, নিজের শিকড় উপড়াইয়া অন্য মাটিতে লাগায়।

হয়তো, নারীর আইডেন্টিটি এবং তা অস্বীকারের এই ক্রাইসিস একটা সোশিও-পলিটিক্যাল বিষয়। হয়তো অর্থনীতি তার হাতিয়ার বিশেষ। এবং হয়তোবা এই ক্রাইসিসের অস্তিত্ব অস্বীকার করার প্রবণতা সরাসরি ক্ষমতার অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত। নারীর আইডেন্টিটিকে স্বীকার করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাবান অংশের ক্ষমতার চর্চা কতদিক দিয়ে খর্ব হয়, তা এই ক্ষমতাহীন অবস্থান থেকে পুরোপুরি টের না পাওয়া গেলেও ক্ষমতাবানের মেরুদণ্ডে শিরশিরে অনুভূতি হয়তো ঠিকই হয়।

হয়তো ক্ষমতা ভাগ করার চাইতে তাই নারীর আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নিয়ে সদ্য জাগ্রত ডিসকোর্সের জল ঘোলা করা বরং সহজ ও আরামপ্রদ। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, ক্ষমতাবানের ঘোলা করা জলে আমাদের দৃষ্টি আজ আর আগের মতো পিছলে যায় না। হতে পারে, অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে খেলো করতে গিয়েই ক্ষমতাবান অবশেষে তার ক্ষমতা হারায়। হতে পারে, আমরা বুঝে যাই, ক্ষমতা ততটুকুই, যতটুকু আমরা দেই। হতে পারে, ঠিক এই জায়গাতেই ক্ষমতার খেলায় পালাবদলের গল্পটা আরও প্রেডিক্টেবল হয়ে যায়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.