আমার চোখে পুরুষ

দিনা ফেরদৌস:

১৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। পুরুষ আমার জন্মদাতা, পুরুষ আমার স্বামী ও একজন ছেলের মা হিসেবে সেই দায় থেকেই এই লেখা। প্রথম পুরুষ আমার জন্মদাতা, যার কাছে দুনিয়ার সব থেকে মূল্যবান সম্পদ আমি। সেই একই পুরুষের কাছে আমার মায়ের অবস্থান ছিল তুলনামূলক মূল্যহীন। সেইজন্যে আমার বাপের উপর রাগ থাকা উচিৎ কিনা জানি না। তবে তাকে ভালো না বেসে উপায় ছিল না সেটা বুঝি।

ঠিক যেমনটি আমার বরের বেলাতেও। মেয়ের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে হিংসা করার কথা কিনা জানি না, তবে নিজের প্রতি উদাসীনতা মেনে নিতে কষ্ট হলে উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই। সেটা সে আমার বর বা আমার বাচ্চাদের বাবা বলে নয়, বরং সামাজিক নিয়মই তাকে এমন করে দিয়েছে বুঝি বলে। তাকে কেউ কোনদিন শেখায়নি নিজের মেয়ে যেমন আদরের দুলালী, পরের মেয়েও তেমনি কারও ঘরের আদরের দুলালী। পরিবার একটি মেয়েকে বিয়ের জন্যে যেইভাবে প্রস্তুত করে, কীভাবে বর ও তার বাড়ির সকলের সাথে মানিয়ে চলতে হবে, রান্নাবান্না করতে হবে, সেই তুলনায় একটা ছেলেকে কিছুই শেখায় না কীভাবে আরেকটা পরিবারের মেয়ের সাথে আচরণ করতে হবে, বরং আমরা শেখাই বিয়ের রাতে বিড়াল মেরে সারাজীবন কীভাবে বিড়াল বানিয়ে রাখা যায়।

এই পুরুষরাই প্রেমে পড়লে দুনিয়া ওলট পালট করে ফেলে, যেই বউয়ের দিকে তাকানোর দরকার মনে করে না, সেই বউ প্রেমিকা থাকতে দিনরাত ফোন দিয়ে পটায়। এই পুরুষরাই চুরি ডাকাতি করে মায়ের জন্যে ওষুধ কিনে, হাঁড়ি কিনে, বোনের জন্যে শাড়ি কিনে, নামিদামি বর কিনে। এই পুরুষরাই পরিবারের কথা চিন্তা করে নিজের প্রেম বিসর্জন দিয়ে পরিবারের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে সারাজীবন আফসোস করে মনে মনে। এই পুরুষই জমিজমা বিক্রি করে মেয়ের যৌতুকের টাকা পরিশোধ করে, ছেলেকে বিদেশ পাঠায়। পরিবারের বড় ছেলে হলে সারা সংসারের দায়িত্ব নেয় বিনাবাক্যে।

পুরুষদের বহু খারাপ দিক আছে, কিন্তু আজ আমি খারাপ নয়, বরং তাদের অসহায়ত্বের দিক নিয়ে আলোচনা করবো। আমরা পুরুষদের খারাপ দিকটাই বেশি দেখি, কারণ অসহায়ত্বের দিকগুলো তারা লুকিয়ে রাখে। নারীদের খারাপ দিক উঠে এলে সমাজ যেমন তিরস্কার করে, তেমনি অসহায়ত্বের খবর জানলে কষ্ট পায়। একই কারণে একটা পুরুষ খারাপ হওয়াটাকে সমাজ যতোটা স্বাভাবিকভাবে নেয়; ততোটা সহজে একজন পুরুষের চোখের পানিকে মেনে নিতে পারে না ,নরম মনের পুরুষ মেনে নিতে পারে না। পুরুষকে কষ্ট করে হলেও সবসময় শক্ত থেকে নিজের হেডম দেখাতে হবে। পরিবারের তিন পুরুষের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতে হবে। একটা পুরুষ চাইলেই বলতে পারে না কিছু করবো না, বিয়ে করে সংসারী হবো। কারণ বেকার পুরুষের কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দেয় না। বেকার শব্দটা ব্যবহারই হয় পুরুষদের ক্ষেত্রে। পুরুষরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। রাত করে ঘরে ফিরলে চরিত্র নিয়ে কেউ কিছু না বললেও চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারির কবলে পড়ে জান, মাল তারাও হারায়। শৈশবে ছেলেরাও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। বড়বেলায় এইসব স্মৃতি তাদেরও তাড়া করে বেড়ায়। ট্রমার মধ্যে কাটায় সারাটা জীবন।

অনেকের ধারণা ছেলেরা সৌন্দর্য নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে না, বয়স নিয়ে ভাবে না, তাদের টাকা থাকলেই হয়। আমি বহু ছেলেদের দেখেছি, সৌন্দর্য নিয়ে তারাও হীনমন্যতায় ভোগে। সিক্স প্যাক বডি বানানোর জন্যে ইনজেকশনও পুশ করে কেউ কেউ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এখনকার অনেক ছেলেই শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে খুব ভাবে, ডায়েট কন্ট্রোল করে চলে। আর যারা খুবই সাধারণ জীবনযাপন করে, তারা সিক্স প্যাক বডি না বানালেও মেদ ভুঁড়ি ঢাকতে ইন ছাড়া টিশার্ট পরে, দমবন্ধ করে ভুঁড়ি লুকিয়ে ছবি তোলে। মেয়েদের মতো বয়স না লুকালেও নিজের উচ্চতা ঠিকই লুকিয়ে, বাড়িয়ে বলে (সবার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য না, সব মেয়েরাও বয়স লুকায় না)। টাক নিয়ে বহু পুরুষের চিন্তার শেষ নেই। পাকা দাঁড়ি উঁকি দেয়ার আগেই প্রতিদিন খেয়াল করে মুখে ব্লেড চালানো কম কষ্টের কথা নয়। আর সাদা চুল কালো করা, উইগ পরার কথা নাই বলি।

কোথাও যেন একজন পুরুষের উক্তি পড়েছিলাম না শুনেছিলাম খেয়াল নেই, “যে একটা মেয়ে চাইলেই যেকোনো পুরুষ তার জন্যে হাজির হয়ে যায়, কিন্তু একটা পুরুষ একটা মেয়েকে চাইতে গেলে আগে রেস্টুরেন্টে খাওয়ানো, শপিংমলে নিয়ে গিয়ে দামি দামি গিফট দিয়ে তবেই চাওয়া পূরণ করতে হয়”। কথাটার সাথে একমত না হলেও যেহেতু পুরুষদের নিয়ে লিখছি তাই তাদের চোখে যেইভাবে নিজেদের দেখা হয়, সেই দিকগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

দুনিয়ার কোন পুরুষই খারাপ হয়ে জন্ম নেয় না, জন্মের পর নানা পরিবেশ-প্রতিবেশে বড় হতে হতে তারা ‘খারাপ’ হয়ে যেতে বাধ্য হয় অনেকক্ষেত্রে। সব পুরুষ খারাপ না, যারা খারাপ হয় সেখানে কিছুটা হলেও আমাদের পরিবারের দায় থেকে যায়। আমরা যদি তাকে পরিবার থেকে সঠিক শিক্ষাটা দিতে পারি, কার্টুন মীনার মতো ঘরে ছেলেমেয়ের পাতে খাবার দাবার সব সমান করে তুলে দিতে পারি, ছেলেমেয়ে দুজনকেই একই সময়ে ঘরে ফিরতে বলি, শুধু মেয়েকে দেখার দায়িত্ব ভাইয়ের ঘাড়ে না দিয়ে, মেয়েকেও যদি শিক্ষাটা দিতে পারি বিপদে ভাইয়ের পাশে দাঁড়ানোর, তো আমাদের ছেলেরাও ভরসা করার জায়গা পাবে।

ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে, সমাজের এইসব চাপিয়ে দেয়া নিয়মের কারণে ছেলেরা অসহায়ত্বে ভোগে। ছেলেরা কাজের প্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে থাকলে আমরা বলি না আলাদা হয়ে গেছে, কিন্তু বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকলে বলি পর হয়ে গেছে, মা বাবাকে ছেড়ে চলে গেছে। একটা মেয়েও কিন্তু মা-বাবাকে ছেড়ে যায়, তখন আমাদের লাগে না। একটা পুরুষ শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে উঠলে বলি ‘ঘর জামাই’ ( ঘরজামাই খুব লজ্জার হয় আমাদের সমাজে)। অথচ বিদেশি মেয়ে বিয়ে করলে বেশিরভাগ ছেলেরা প্রথমে শ্বশুরের ঘরেই উঠে। কাজটাজ করে যখন বেশি টাকা আয় করে তখন আলাদা হয়।

আজ যদি আমরা পুরুষদের সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়ম থেকে বের হয়ে স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিতে পারি তো কাল এই সুবিধাটা আমাদের সন্তানরাও পাবে। যার জন্যে আমাদের কিছু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা উচিৎ। দুনিয়ায় সব পুরুষদের জন্যে শুভ কামনা রইলো।

(লেখাটি আমার দেখা কিছু পুরুষদের নিয়ে। এর বাইরেও আরো অনেক সীমাবদ্ধতা আছে পুরুষদের। আশা করি আপনারা লিখবেন; কী লিখিনি তা নিয়ে দোষারোপ না করে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.