পুরুষকে শেকলে বেঁধে রেখেছে যে ‘তন্ত্র’

উপমা মাহবুব:

কিছুদিন আগের ঘটনা। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর সরকার স্কুল খোলার ঘোষণা দিয়েছে। কন্যাকে নিয়ে তাই কেনাকাটা করতে শপিং মলে গেছি। বাবা-মা-কন্যা তিনজনের মনেই ভীষণ ফুর্তি। কন্যা করোনার কারণে বহুদিন বাসায় বন্দি থাকার পর শপিং মলে এসেছে। সে চারপাশে নজর বুলাচ্ছে আর বলছে – আরে আগে তো এই জায়গায় ওই দোকানটা ছিল না, ওই দিকটাতে একটা নতুন দোকান খুলেছে। আমরা জুতোর দোকানে গিয়ে ওর জন্য স্কুল শু কিনলাম। একজোড়া স্যান্ডেলও কেনা হলো। দোকানে তখন আরও অনেকেই স্কুল শু কিনছেন। এই শপিং মলে একসঙ্গে এতো বাচ্চা বহুদিন পর দেখলাম। কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব। বেশ ভালো লাগছিল।

কাজ শেষে জুতোগুলোর দাম মেটানোর জন্য কাউন্টারে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন কাউন্টারে বসা কর্মীটিকে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই, জুতোতে মূল্যছাড় আর দেয়া হচ্ছে না?’ আমি একটু ঘুরে তাকালাম। এক ভদ্রলোক কন্যাসহ দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটির বয়স সাত/আট বছর হবে। দুজনের পোশাক এবং আচরণ দেখে বোঝা যায় পরিবারটি মধ্যবিত্ত। সেলসম্যান ওনাকে জানালেন এক সপ্তাহ আগে তাদের মূল্যছাড়ের অফারটি শেষ হয়ে গেছে। একথা শুনে বাবাটি নিশ্চুপ শূন্য চোখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। কন্যাটিও নিরব। এতোবড় শপিংমলে অনেক চাকচিক্যের মধ্যে সে যেন নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছে না। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল আমার হাতে থাকা জুতোর বাক্স দুটোর ওজন যেন বহু গুণ বেড়ে গেছে। কন্যাকে এক জোড়া জুতো কিনে দিতে না পারার মধ্যে একজন বাবার অনেক কষ্ট, অনেক অসহায়ত্ব লুকিয়ে থাকে। সেকথা ভেবে মনে হচ্ছিল দুই জোড়া জুতো কিনে আমি অপরাধ করেছি।

আমরা একটা ভয়াবহ বৈষম্যমূলক সমাজে বাস করি। আমরা তা সবসময় উপলব্ধি করতে পারি না। উপরন্তু একটি পরিবারকে চালানোর সমস্ত দায়দায়িত্ব পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চাপিয়ে দিয়েছে পুরুষের উপর। এই সমাজ সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিতে না পারার কষ্টকে ‘ব্যর্থতা’ নাম দিয়ে একজন পিতার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে, তাকে বিদ্রুপ করতেই বেশি পছন্দ করে। পরিবারের খরচ চালাতে অসংখ্য পুরুষকে নিজের সমস্তটুকু যে পরিশ্রম করতে হয়, তারপরও সন্তানকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিতে না পারলে তার মনে যে ব্যাথা জাগে, তার খবর রাখে কতজন?

পুরুষতন্ত্র একদিকে নারীকে নিয়ম বা আচারের নামে নানাবিধ পেষণের শেকলে বেঁধে রাখে, তাকে ঘর থেকে বের হতে দেয় না, অন্যদিকে এই পুরুষতন্ত্রই ‘শক্তিশালী’, ‘দায়িত্বশীল’ ইত্যাদি নানারকম উপমা দিয়ে পুরুষের উপর সংসার নামক প্রথাটিকে জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে দিয়েছে। সন্তানের বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে তার প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত সকল খরচ চালানোর দয়িত্ব বাবার৷ আবার সেই বাবা বৃদ্ধ হলে তার এবং তার সহধর্মিনীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয় তাদের পুত্রকেই। আমার কাছে সবসময় একজন পুরুষের প্রতি সমাজের এই চাওয়াকে অত্যন্ত অন্যায় বলে মনে হয়। পুরুষ তার ইচ্ছেমতো বাইরে ঘুরবে, আড্ডা দেবে, অনেক পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হবে – ইত্যাদি বিষয়গুলোকে প্রচলন করার মাধ্যমে পুরুষকে যে ‘স্বাধীন এবং স্বনির্ভর’ সত্ত্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, তা আসলে অসংখ্য পরিবারের পুরুষকর্তাটির জন্য পুরুষতন্ত্রের তৈরি করা একটা মেকি সুখও বটে।

সংসারের কোনো কাজে স্ত্রীকে সহায়তা না করা, স্ত্রী নির্যাতন করা, সন্তানদের কাছে একজন রাগী মানুষ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বা অফিস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে গভীর রাতে বাসায় ফেরা – এই ‘পুরুষ’ চরিত্রের পেছনে অর্থ উপার্জনের সব দায়দায়িত্ব বা সংসারের সকল অর্থনৈতিক কাজের নিয়ন্ত্রণ পুরুষের হাতে থাকাটাও অনেক বড় রোল প্লে করে। যে পুরুষ অনেক অর্থ উপার্জন করেন তাদের জন্য এই গুরু দায়িত্ব হয়তো কোনো সমস্যা নয়। তিনি সংসারের সবার মাথার উপর লাঠি ঘুরিয়ে মজা পান। কিন্তু মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত অবস্থানে থাকা পুরুষরা সংসার চালানো নিয়ে ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে বাধ্য হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই চাপ তাকে খারাপ স্বামী হতে বাধ্য করে। কন্যার বেশি বয়স হয়ে গেলে বেশি যৌতুক দিতে হবে এই চিন্তা তাকে পাষাণ বাবায় পরিণত করে। প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে না পারার গ্লানি তাকে পুত্রকে পিটিয়ে ভালো ছাত্র বানাতে প্রলুব্ধ করে। আবার এই পুরুষতন্ত্রই তাকে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে বা কাঁদতে দেয় না। মনেরভাব লুকিয়ে থেকে কঠিন মানুষের মুখোশ পরে থাকতে বাধ্য করে।

পুরুষ নিজেকে প্রভু মনে করে তাই স্ত্রীকে সবসময় তার সেবায় নিয়োজিত থাকতে হয়, মাছের মুড়োটি বা মাংসের ভালো টুকরোটি তার পাতে তুলে দিতে হয় – অংকটা এত সরল নয়। এর মধ্যে আরও অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। যে স্ত্রী তার স্বামীকে দিনরাত পরিশ্রম করে সংসারের ঘানি টানতে দেখেন, তিনি হাজার কষ্ট হওয়ার পরও শিশু সন্তানকে লালনপালন করার কাজে স্বামীর সহায়তা চাইবেন না, স্বামীর পাতে বেশি খাবার তুলে দেবেন এটাই স্বাভাবিক। পুরুষতন্ত্র নারী ও পুরুষের রোলের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে তা প্রকৃত পক্ষে দুই গ্রুপের কাউকেই শান্তি দিতে পারেনি। নারীকে গৃহকর্মের মধ্যে আটকে রাখা যেমন অন্যায় তেমনি পুরুষকে টাকার মেশিন হতে বাধ্য করাও অন্যায়।

নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। দুজন মিলেমিশে দায়িত্ব নিলে পরিবারে সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্য দুটোই থাকবে। আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে ধীরে ধীরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের পুরুষের মধ্যেও ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহায়তা করার প্রবণতা বাড়ছে৷ এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ। আমি নারী এবং পুরুষ দুজনেরই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমি চাই সংসার নামক প্রথাটি যেন নারীকে ঘরের মধ্যে আটকে না রাখতে পারে। আর চাই পুরুষেরাও ‘আমাকে উপার্জন করতে হবে, নইলে সংসার কিভাবে চলবে’ – এই মানসিক যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপে পরে অসংখ্য পুরুষ তাদের পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে এককভাবে যে প্রবল জীবনসংগ্রামে লিপ্ত আছেন তাদের আমি শ্রদ্ধা জানাই। একদিন নিশ্চয় পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘটবে। আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মিলে গড়ে তুলবো একটি মানবিক সমাজ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.