রেহানা মরিয়ম নূর: সাধারণ গল্পের অসাধারণ চিত্রায়ণ

মুশফিকা লাইজু:

রেহানা মরিয়ম নূর, অত্যন্ত সময় উপোযোগী একটি শক্তিশালী গল্প। যা উচ্চমাত্রার দক্ষতার সঙ্গে সেলুলয়েডে ধারণ করেছেন বয়সে তরুণ (অভিজ্ঞতায় পরিণত) পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। যে ছবির গল্পের পটভূমি আজকের; এক দশক আগেরও নয়, এক দশক পরেরও নয়। প্রচলিত গ্ল্যামারের ধারণাকে এড়িয়ে কোনো চুম্বনদৃশ্য বা শয়নদৃশ্যের প্রয়োজনকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ছোট্ট গতি-তরঙ্গের একটা শব্দ ব্যবহার করে একটি যৌন নিপীড়নকে সেলুলয়ডে বন্দি করে একটি অতুলনীয় শিল্পদক্ষতা প্রমাণ রেখেছেন।

কান চলচ্চিত্র উৎসবের সময়ে যখন এ ছবি নিয়ে এতো হৈ চৈ চলছে, ঠিক তখন থেকেই আমি এর ট্রেইলর দেখা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমি পূর্ব মাইন্ডসেট নিয়ে সিনেমাটা দেখতে চাইনি। কোনো প্রত্যাশা যাতে না তৈরি হয় আমার মাথায়। আমি খোলামনে ছবিটা দেখতে চেয়েছিলাম।
দেখেছি। যদিও নির্ধারিত দিনে যেতে পারিনি, কেউ কেউ বলবে সিনেমা দেখার আবার নির্ধারিত দিন কী? দিন একটা ছিল, কারণ এই সিনেমার প্রধান অভিনেত্রী আমাকে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যাতে ওঁর উপস্থিতিতে আমি সিনেমাটা উপভোগ করি। দুটো কারণে আমি ঐদিন যেতে পারিনি। এক, বাঁধনের প্রতি আমার একধরনের পূর্ব মুগ্ধতা আছে, পাছে ওঁর উপস্থিতি আমার সিনেমা দেখার মনোযোগে ঘাটতি পরে! দুই, জেনেছি- গল্পে ডা. রেহানার একজন মেয়ে শিশুও আছে। সুতরাং আমি আমার কন্যাকে নিয়ে দেখতে চেয়েছি, তার সময়টাকে আমি বিবেচনা করেছি।

একটি সাধারণ গল্প, কৌশল দিয়ে, সৃজনশীলতা দিয়ে কীভাবে শিল্পোত্তীর্ণ করা যায় ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ তারই সফল প্রকাশ। গল্পটা অত্যান্ত সাদামাটা, একজন কর্মজীবী সিঙ্গেল মাদার, ঘরে-বাইরে কাজের জায়গায় সমান তালে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, স্রোতের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে সমান তালে হাঁটছে। এটা সমসাময়িক সময়ে বাংলাদেশে যেকোনো কর্মজীবী নারীর গল্প। গল্পে ডা. রেহেনার একজন বেকার ভাই আছেন, অবসরপ্রাপ্ত বাবা আছেন, আছেন বাইরের পৃথিবী না বোঝা একজন মা এবং আরো আছেন সমঝোতা করা, আপোষ করা একজন বস ও চরিত্রহীন সুযোগ-সন্ধানী একজন সহকর্মী। রেহানা অতিবাস্তব একটা চরিত্র, তিনি চাল-চিনির হিসেব কষে বেকার ভাইকে বাস্তবতা বোঝানোর চেষ্টা করে। একটি সাধারণ গল্প অসাধারণ করে উপাস্থাপন করে সফল ও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন নির্মাতা পরিচালক সাদ।

রেহানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি একজন আপোষহীন মানুষকে চিত্রায়িত করেছেন, সে একজন রাগী নারী চরিত্র, কারণ সে সৎ ও নিষ্ঠাবান। সে অন্যায় মেনে নেয় না, নিজে অন্যায় করে না। তাই যেকোনো অন্যায় দেখলে সে ফুঁসে ওঠে। যিনি বাইরের অশুভ শক্তির কাছে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে যেতে পারেন, কিন্তু নিজের ন্যায়নিষ্ঠ সত্তার কাছে নতজানু হন না। নিজের জানা সত্যের সাথে আপোষ করেন না। সময়ের কাছে তার আত্মশক্তি ক্ষুদ্র হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি মানুষের আত্মশক্তিতে সে মহিয়ান। ব্যকরণের দিক থেকে পরিচালক ”চেতনাপ্রবাহ রীতি”র ধারাটি অনুসরণ করেছেন বলেই মনে হয়েছে, যা ঊনিশ শতকের ফ্রান্সের একটি জনপ্রিয় সাহিত্যধারা। বাংলা সাহিত্যে এই ধারার প্রথম প্রর্বতন করেন মহান লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তাইতো দেখা যায়, গল্পের এ্যানির শ্লীলতাহানির ঘটনাটি সে দেখে দরোজার বাইরে থেকে- দ্বিতীয় অংশ, প্রথম অংশ নয়; তাই সে বারবার অনুসন্ধান করতে চেয়েছে তার দেখা বা শোনা কতটা সত্য আর কতটা ছায়া। সে বার বার বিশ্লেষণ করেছে।

এ গল্পে রেহানা চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ’চাঁদের অমাবশ্যা’ উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র আরেফ আলী মাস্টারের দ্বিধান্বিত মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাসের সঙ্গে। গল্পে আরেফ আলী মাস্টার বারবার এক মহাসত্য উদঘাটন করতে চেয়েছে, তা হলো “মেঝ মিয়া কি তাহাকে ভালবাসিত?” এই সত্যের পিছনে আরেফ আলী তার সর্ব ক্ষুদ্রশক্তি নিয়ে ছুটেছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করেছে। উত্তর খুঁজেছে- যদি মেঝমিয়া বাঁশবাগানের সেই অর্ধউলঙ্গ মৃত নারীকে ভালবাসতো, তবে মানবতার কাছে সে ক্ষমা পেলেও পেতে পারতো। কিন্তু আরেফ আলী সেই সত্যের দেখা পায়নি। অবশেষে সমাজের দানবীয় শক্তির কাছে তার আপাত পরাজয় হয়েছে। কিন্তু মূলত: সে জয়ী হয়েছে মানবতার কাছে। সে জয় অবিনশ্বর।

এই সিনেমায় (গল্পে) কেন্দ্রিয় চরিত্র রেহানাও সত্য উদ্ঘাটনে ব্যক্তিত্ব সংকটে ভুগেছেন। নিজেরই মুখোমুখি হয়েছেন বার বার। তার মানুষ সত্তার কাছে প্রশ্ন করেছেন, চেতনা দিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। গল্পের এ্যানি কি নিজে থেকেই কোনো বাড়তি সুযোগ নিতেই ঐ শিক্ষকের অফিস ঘরে গিয়েছিলেন? সে কি প্রায়ই শিক্ষকের (তার) ঘরে যেতো? এই সর্ম্পকে এ্যানি কতটা দায়ী ছিল? চিন্তার অলিগলি অতিক্রম করে তিনি যে উত্তর পেয়েছেন তা হলো, সমাজে ছাত্রী ও শিক্ষকের একই অবস্থান নয়, হওয়া উচিতও নয়। নৈতিকতাই শিক্ষকের প্রথম ও প্রধান যোগ্যতা হওয়া উচিত। শিক্ষক হিসেবে রেহানা অন্য শিক্ষকের নৈতিক স্খলন মেনে নিতে পারেননি। পরিচালক, রেহেনার সংলাপে বার বার প্রকাশ করেছেন যে, ঐ শিক্ষক অন্য কোনো কলেজে যেয়ে অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে একই ধরনের অন্যায় করবে। তিনি একজন কন্যা সন্তানের মা হিসেবে সকল কন্যা সন্তানের জন্য যৌন নিপীড়নমুক্ত ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। রেহানার দৃঢ় প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই বার্তাই দিতে চেয়েছে।
অবশেষে তিনি রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি পরাজিত হতে পারেন জেনেও, ব্যক্তিগত ক্ষতি মেনেই সত্যের জন্য লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন। আরেফ আলী মাস্টারের মতো আপাত তাকে পরাজিত মনে হলেও সিনেমার (গল্পের) রেহানা মানবতার কাছে মানুষসত্তার কাছে জয়ী হয়েছেন।

গল্পের প্রয়োজনে কিছু প্রশ্ন দর্শকদের চিন্তার স্তরে ছুঁড়ে দিয়েছেন র্নিমাতা, যেমন আমরা দেখেছি এ্যানির সঙ্গে ডা. রেহানা কথোপকথনের একপর্যায়ে হঠাৎ এ্যানি প্রশ্ন করছে, ‘সেই মেয়েটি কে?’ দর্শক হিসেবে আমাদেরও প্রশ্ন, কে সে? কী নাম তার? তবে কি রেহানাও জীবনেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে? সেদিনের প্রতিবাদহীনতা, বিচারহীনতা তাকে আজকের জায়গায় এসে দাঁড় করিয়েছে? তার মেয়েকে অল্প সময়ের জন্য খুঁজে না পেয়ে যে হতবিহ্বল মানসিক অবস্থা আমরা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে হারানোর ভয়ের চেয়ে নিরাপত্তা নিয়েই বেশি শংকিত ছিল সে।

নারী হিসেবে রেহানার শিক্ষা ও উপার্জনের ব্যবস্থা থাকলেও এই সমাজের নারীরা সারাজীবন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই থাকে। নারীকে কোন অবস্থায়ই পুরুষতান্ত্রিক নিষ্পেষণ থেকে তাকে মুক্তি দেয় না। নির্মাতা রেহানার মাধ্যমে সমাজকে সকল নারীদের অবস্থা বোঝাতে চেয়েছেন। অতি সাদামাটাভাবে তার ভিজিটরের সংলাপের মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক কর্ম বিভাজনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। পরিশেষে নিজের কন্যাকে দরোজা বন্ধ করে রাখার দৃশ্য থেকে আমরা এই বার্তা পাই যে মানুষের জীবনে কোনো সুযোগের জন্য হলেও অন্যায়ের কাছে মাথানত করতে হয় না। মানুষের প্রথম নিজের কাছে নিজেকে মানুষ হিসেবেই স্বীকৃত হতে হয়, রেহানার কাছে থেকে আমরা বারবার এই বার্তাই পেয়েছি। পুরো গল্পে রেহানা একাই লড়াইটা করে যায়। সে কাউকে দায়ী করে না, মেয়েকে স্কুলে আনতে অসুস্থ বাবাকে কষ্ট দিতে চায় না, ঠিক সময় বেতন না পেলে মেয়ের স্কুলের বেতন বাকি পড়ে যায়। মেয়েকে বাংলা স্কুলে পড়িয়ে নিজের সত্তাকে উপস্থাপন করতে চায়।

এভাবেই অশ্বগতিতে দর্শকের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন র্নিমাতা। কখনও থামিয়ে দিয়েছে কখনও স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছে। শুধু বাঁধন নয়, গল্পের প্রতিটি চরিত্র অত্যন্ত ভালো অভিনয় করেছে। এমনকি, সবচেয়ে স্বল্প সময়ে উপস্থিত মিমি চরিত্রটিও। তবে বাঁধনের ভাষাহীন এক্সেপ্রেশান ছিল অতুলনীয়, প্রত্যেকটি চরিত্রের শারীরিক ভাষা ছিল যথার্থ। কস্টিউম, সংলাপ প্রক্ষেপণ ছিল শিল্পোত্তীর্ণ। মেকআপও মনে রাখার মতো।
গল্পের বিন্যাস অত্যন্ত শক্তিশালী, প্রক্ষেপণে ছিল পরিমিতিবোধ। আলোর ব্যবহার দুর্দান্ত, মানুষের মনোজাগতিক দৃষ্টিতে দেখার যে আবহ তৈরি হয়, মানুষ চোখের পলক ফেলে মুহূর্ত বিরতিতে যেভাবে কোন দৃশ্য দেখে, ধোঁয়াশা নীলাভ লেন্সের ব্যবহারের মাধ্যমে র্নিমাতা দর্শককে সেভাবেই দেখাতে চেয়েছেন। শব্দের কথা তো আগেই বলেছি; এ সিনেমায় শব্দ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শব্দ ধারণ, শব্দ সংযোজন, শব্দ সম্পাদন এক কথায় অসাধারণ। সিনেমার চরিত্রের সঙ্গে শব্দ ছিল এক অদৃশ্য গল্পকথক।

প্রতিটি গল্পের একটা গতি থাকে। প্রথমতঃ বলবো, সিনেমার গতিময়তা ছিল অসাধারণ, কোথাও কোনো ছন্দপতন ছিলোনা। মূলত “রেহানা মরিয়ম নূর” একটি নিরীক্ষাধর্মী ছবি। নির্মাতা প্রতিটি বিষয়ে নিয়েই নিরীক্ষা করেছেন । যদিও এ ছবি সাধারণে জন্য নির্মিত নয়, তবু বলবো, গল্প তো সাধারণের মাঝখান থেকেই উঠে এসেছে। সবারই ছবিটা দেখা উচিৎ। ছোট পর্দায় নয়, বড় পর্দাতেই। যদি তাতে জীবনের ঘা হয়ে যাওয়ার বেদনার স্মৃতিতে কিছুটা শান্তির বারি বর্ষিত হয়।
একটি নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু অলঙ্ঘনীয় ভুল বা সীমাবদ্ধতা তো থাকেই, কিন্তু এতো এতো ভালোর আলোতে ক্ষুদ্র কালো ভেসে গেছে, তাই সে বিষয়ে এখানে আর লিখলাম না। বাকিটুকু দর্শকের উপর ছেড়ে দিলাম।

ফুট নোট: হয়তো রেহানা আমারই আর একটা সত্তা, হয়তো গল্পটা মেলেনি, কিন্তু দর্শনটা মিলেছে, আদর্শ ও মূল্যবোধ একাকার হয়ে গেছে। জীবনের সকল ক্ষতি মেনে, সকল ভয়কে অস্বীকার করে সকল সুযোগকে পায়ে দলে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম। সকল হারানোকে মেনে নিয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। তাই হয়তো এতো মনোযোগ দিয়ে রেহানা মরিয়ম নূর দেখেছি। ওকে আত্মস্থ করতে চেয়েছি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.