মানদা দেবীর “শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত” পাঠ প্রতিক্রিয়া

শাহিদা ফেন্সী:

নারীর চোখ দিয়ে সমাজকে দেখুন, পঙ্কিলতার পঙ্কে পদে পদে আটকে যাবে আপনার পা! দেখবেন গোলাপের বাগানে কেবল কাঁটা নয়, কীটও কিলবিল করছে ফুলময়। আমরা তো জানি মানব জীবন কুসুমশয্যা নয়, এটা কী মানি যে বেশিরভাগ নারীর জীবন কণ্টকশয্যা? কোন কোন নারীর জীবন আবার অতি বিচিত্র বৈচিত্র্যময়, নাটকীয়, ছন্দহীন, স্পর্শকাতরতায় ভরা। জীবনের অলি-গলির বাঁকে বাঁকে কতো যে পাপ, কতো যে পঙ্কিলতা গুটি গুটি পায়ে প্রবেশ করে পর্বতসম হয়ে দাঁড়ায়…! সেইসব পাপ উন্মত্ততার পাকে জড়িয়ে যায় কোন কোন নারীর জীবন। এতে ব্যক্তি মানুষটির হয়তো খানিক দায় থাকে, তবে অনেকখানি দায় থাকে রাষ্ট্র পরিবার এবং সমাজের। সোহাগ জীবনে দরকার, শাসনও কম প্রয়োজনীয় নয়।

সমাজে ভদ্রবেশি পতিত পুরুষগুলো ছলে বলে কৌশলে একটি নারীকে পতিতা করে তোলে। একটা সময় নারীটির সমস্ত পরিচয় মুছে গিয়ে, মরে গিয়েও সে পতিতা
হয়েই বেঁচে থাকে। আর পতিত পুরুষটি কিন্তু বীরদর্পে সম্মান সুনাম পরিবার পরিজন নিয় মাথা উঁচু করে বাঁচে! অন্ধকার জগতের এই নারীগুলোর জীবন সেকালে যেমন ছিলো বদলায়নি একালেও। আত্মসংযম ও মানবিক মূল্যবোধে মানুষ হয়ে উঠার শিক্ষা না পেলে রিপুর তাড়না পুরুষের পাশাপাশি একটা নারীকেও যে কুপথে নিয়ে যেতে পারে তাও অবশ্য স্বীকার্য।

এই বিষয়গুলো সবিস্তারে উঠে এসেছে মানদা দেবীর লেখা “শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত” বইটিতে। নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে এটি একজন শিক্ষিত পতিতার লেখা আত্মজীবনী। বাংলার প্রথম নারী পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখক ‘রাশসুন্দরী দেবী’কে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি সন্ধান পাই ‘মানদা দেবী’র। আর এই বইটি হলো বাংলা সাহিত্যে কোন পতিতার লেখা প্রথম আত্মজীবনী; যা ইংরেজি ১৯২৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এমন সত্যনিষ্ঠ আত্মজীবনী আমি আর পড়িনি। যেখানে তিনি সমাজ ও পরিবারের দায় এবং করণীয় বিষয়ের পাশাপাশি অবলীলায় স্বীকার করেছেন নিজের দোষত্রুটি ভুলভ্রান্তি পাপ কুকর্ম সকল কিছু; অত্যন্ত সহজ গদ্যে সংযত ভাষায় গভীর ভাব চেতনায়। অর্থ পেশা কিংবা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যে সৎ বা সভ্য মানুষ হবার কোন মাপকাঠি বা মানদণ্ড নয় তা বইটির পরতে পরতে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। এখানে তাকে পতিতা বানাতে এবং নানান কৌশলে পতিতাবৃত্তি ধরে রাখতে যে পুরুষগুলো দালাল রূপে কাজ করেছে সকলেই উচ্চশিক্ষিত( উকিল, ব্যারিস্টার) এবং সমাজের তথাকতিথ উঁচু তলার মানুষ! তার খদ্দেররা ছিলেন ডাক্তার, ব্যবসায়ী ধর্মগুরু, রাজনীতিবীদ, সমাজসংস্কারক, উচ্চ শিক্ষিত জমিদার পুত্র,অধ্যাপক,ব্যাংকার সহ প্রায় সকল শ্রেণি পেশার পুরুষ।

রাষ্ট্রের সম্পত্তি, পূর্বপুরষের কষ্টার্জিত অর্থ, নিজের ও পরিবারের শ্রমে ঘামে গড়া অর্থ সম্মান শুধু লাম্পট্যের কারণে কতো কতো পুরষ যে নারীর রূপ যৌবনের পায়ে তা জলাঞ্জলি দেয় এ নিয়েও আফসোস করেন মানদা। তবে সমাজে সৎ পবিত্র ভালো পুরুষও যে তিনি দেখেনি তাও কিন্তু নয়। তার নিরপেক্ষতা এখানেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি স্পষ্টভাবে এটাও বলেছেন যে কখনও কখনও আর্থিক সুবিধা আদায়, নিরাপদ জীবন ও দেহের চাহিদা পুরণের জন্য কিছু নারীও কুটকৌশল ভণিতা, প্রলোভন, প্রতারণা, এমনকি মিথ্যা অভিনয়ের আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করে না, সৎভাবে উপার্জনের পথ বা উপায় থাকা সত্ত্বেও। আসলে প্রবৃত্তির আক্রমণ নারী পুরুষ উভয়েরই জীবন করে তুলতে পারে দুর্বিষহ।

একটা খোলসের ভেতর এই সমাজটা যে কতোটা নোংরা কদর্য কতোটা কলুষিত আর ভণ্ডামিতে ভরা সে সত্য মানদা দেবী তার জীবন অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেছেন। তবে সময়, চিন্তার উদারতা ও পরিবেশগত কারণে আধুনিক মানসিকতা ও জীবনযাপন গ্রহণের বিষয়ে তার কিছু সীমাবদ্ধতাও পরিলক্ষিত হয়েছে এই বইয়ে। মানদা দেবী আত্মদহণে পুড়ে একটা সময় এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং অর্জিত সকল সম্পত্তি পতিতাদের কল্যাণে দান করে যান। পতিতা থাকা অবস্থায়ও তিনি যথাসাধ্য সামাজিক কাজে দেশের আপদ দুর্যোগে এগিয়ে এসেছিলেন। যাই হোক ১০০ বছর পেরিয়ে আজ এই সমাজ অনেক রং বদলালেও সঙগুলো কিন্তু একই আছে।

মানদা দেবীর নিজের সম্পর্কে বলা অণু পরিমাণ কথা দিয়ে পাঠকের বিস্তৃত ভাবনার উদ্রেক করে গেলাম…

“আমি এবার খাঁটি বেশ্যা হইলাম। রামবাগানে থাকিতে নিম্নশ্রেণির লোকেরা রাস্তা হইতে দুই-একটি বাবুকে ফুসলাইয়া আমার ঘরে আনিত। পুলিশ কমিশনার টেগার্ট সাহেবের শাসনে তাহাও বন্ধ হইয়া গিয়াছিলো। কলিকাতা সহরে ভদ্রলোকও বেশ্যার দালালি করে তাহা জানিতাম। কোন কোন পতিতার নারীর নিকট আমি ভদ্রলোক দালাল রাখিবার পরামর্শ পাইয়াছিলাম, কিন্তু তখনো আমার বিবেক ও নীতিজ্ঞান একটু ছিল বলিয়া তাহা পারি নাই। আজ পাপপথের শেষ সীমায় আসিয়া হৃদয়ের অবশিষ্ট সদ্ভাবটুকুকে পদদলিত করিতে আমি আর ইতস্ততঃ করিলাম না।”

( শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত/মানদা দেবী/পৃঃ৯৯)

শাহিদা ফেন্সী। ঢাকা

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.