বৈচিত্রময় সত্তার অধিকারী ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ঢাকা: দেশের সাহিত্যাঙ্গণে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ এক বৈচিত্রময় সত্তার অধিকারী। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, শিশু সাহিত্যিক ও সংগীত রচয়িতা হিসেবে নিজের সঠিক ভূমি খুঁজে পেয়েছেন। সম্প্রতি  সঙ্গে আলাপকালে নারী-শিশু ও লেখালেখির নানা বিষয় নিয়ে নিজের খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।    পারিবারিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ তার সাহিত্য সাধনার সহায়ক ছিল। কিশোর বয়স থেকে তার লেখালেখি শুরু। প্রচুর লেখা তিনি লিখেছেন,যা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতায় ১৯৫৫ সালে তার ‘বাদল দিনে’ প্রথম গল্প ছাপা হয়। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত সংগীতকার। ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ,ফিচার,ও শিশু কিশোরতোষ সাহিত্য ছাড়া ও তিনি সংগীত রচনায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ে সুবক্তা হিসেবেও তিনি সর্বজন নন্দিত। তার অমায়িক ব্যবহার তাকে করেছে সর্বজন প্রিয়। তিনি নিজের শৈশব ও কৈশোরে অনায়াসে ফিরে যেতে পারেন বলেই ছোটদের মনোজগতে দুচোখ দিয়ে স্বচ্ছভাবে দেখতে পারেন, নিখুতভাবে উপলব্ধি করতে পারেন শিশুদের মন।তার মনের বর্ণালী রঙ দিয়ে রাঙানো শিশু-সাহিত্য হয়ে ওঠে অনুপম। নিজের সাহিত্য সম্পর্কে অনেকটাই অকপট তিনি। তার সাহিত্যে তিনি সততার সঙ্গে বিপর্যস্ত মানুষের জীবন চিত্র অঙ্কন করেছেন। শুধু সামাজিক প্রেক্ষাপট নয়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তিনি অনেক কাহিনীও নির্মান করেছেন। পাকিস্তান আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ অঞ্চলে যে সমস্ত আন্দোলন হয়েছে কোনোটিই এড়ায়নি তার চোখে। এ সমস্ত আন্দোলনে যে সকল প্রতিবাদী মানুষ প্রাণ দিয়েছে তাদের নিয়ে তিনি গল্পের মালা সাজিয়েছেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের অসহায় মানুষের বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তির বেদনাগাঁথা তিনি তার একাধিক ছোটগল্পে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। নারীর নানা রকম যন্ত্রনা ও কষ্টের কথা তিনি বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা নিয়ে তার একাধিক ছোট গল্পে রূপায়িত করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার লেখালেখির আরেকটি বিষয়। উপমা চিত্রকল্প প্রতীকের ব্যবহারে তিনি উচ্চাভিলাষী নন।বরং সহজ-সরল ভাষা দিয়ে লিখে চলেছেন। ‘আমাদের দেশে নারীরা অনেক এগিয়েছে, তবে এর জন্য নারীদেরকে সাংঘাতিক পরিমান লড়াই করতে হয়।সন্তান-সংসার,অফিস সবকিছু নারীদেরকে সামলাতে হয়। পরিবার থেকে নারীদেরকে সহযোগীতা করলে আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতো।’ তিনি নিজেকে শুধু লেখালেখির জগতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থের সংসার জীবনে রয়েছে উজ্জল ভূমিকা। স্বামী শৈলেন্দু শেখর দাশ পুরকায়স্থ একজন ব্যাংক কর্মকর্তা,চার সন্তান নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। পিতা সুধাংশু শেখর রায় ও মা নীলিমা চৌধুরী ঘর আলো করে  ১৯৪৫ সালে ২৭ জুলাই সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা মানুষ। বাবা-মা, চাচা,ফুপুসহ পরিবারের প্রতিটি সদস্য গান, তবলা, সেতারসহ অন্যান্য সংস্কৃতির চর্চা করতেন। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থের গানের ভুবনে থাকার কথা থাকলেও লেখালেখির জগতে এলেন কিভাবে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার বাবা শিলং কনভেন্টে পড়ালেখা করেছেন। পরবর্তীতে সেখানে চাকরি করতেন। তখন সেখানে নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের পড়ার জন্য ব্ই পার্সেল করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের বাড়িতে বিশাল লাইব্রেরি ছিল। ছোটবেলায় সেসব বই পড়তাম আর ভাবতাম কিভাবে লেখকেরা লেখে,পরে পড়তে পড়তে লেখালেখির জগতে চলে আসি।’ ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ ১৯৫৭ সালে সতীশ চন্দ্র গার্লস হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন,১৯৫৯ সালে সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে স্নাতক পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ করেন। লেখালেখির জন্য ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ নন্দিনী সাহিত্য পদক,অন্যন্যা সাহিত্য পদক, অগ্রনী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার,কমর মুশতারী স্মৃতি পুরস্কার,সাজিদুন্নেসা খাতুন চৌধুরী সাহিত্য পদক, বাংলাদেশ জাতীয় সাহিত্য পরিষদ সাহিত্য ও সমাজসেবা স্বর্ণপদক ও সম্মান স্মারক,বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.