কর্মজীবী মায়ের প্রশ্নবিদ্ধ মাতৃত্ব

রোকসানা বিন্তী:

ইদানিং দেখি ফেসবুকের প্যারেন্টিং বিষয়ক গ্রুপগুলোতে কোন কর্মজীবী মা কিছু একটা লিখে পোস্ট দিলেই তাকে তুলাধুনা করা শুরু হয়ে যায়! একজন নতুন মা, যিনি হয়তো ম্যাটার্নিটি লিভ শেষ করে জয়েন করবেন, কিছু একটা বুঝতে না পেরে পোস্ট দিয়েছেন তো ব্যস, শুরু হয়ে যায় নানারকম তুলোধুনো!
যতটা না উপকারি পরামর্শ আসবে তারচেয়ে দশগুণ বেশি আসবে উপদেশ! কেন চাকরি করবে, চাকরি করার দরকার কী, বাচ্চার হক কেন আদায় করছেন না, ভবিষ্যতে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি! কিছুক্ষণ এইসব চলার পর কিছু মন্তব্য আসবে এমন যে- “পুরুষের গায়ের ঘষা খাওয়ার জন্য মেয়েরা চাকরি করতে বাইরে যায়!”
আরও নোংরা, জঘন্য ভাষায় কর্মজীবী নারীদের আক্রমণ করা হয়!
করা হয় নানারকমের প্রশ্ন!যেমন-

১. এতো টাকার লোভ, বাচ্চা রেখে চাকরি করতে হবে?
…আচ্ছা, আপনি কিভাবে জানলেন টাকার লোভে একজন মেয়ে কিংবা একজন মা চাকরি করে? চাকরি করে কি সে কেবল জামা-জুতা কেনে? সে তো প্রয়োজনেও চাকরি করতে পারে! স্বামী,বাবা-মা, কিংবা শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট দেয়ার জন্য কি কোনো মেয়ে চাকরি করে না? বেতনের সব টাকা কি শপিং করেই উড়িয়ে দেয়?

২. বাচ্চার হক কেন নষ্ট করবেন?
…আচ্ছা, বাচ্চার হক আছে, অবশ্যই আছে, তাই বলে কি মা-বাবার হক নেই? মায়ের দুধ বাচ্চার অধিকার মানলাম, কিন্তু সেই মা-ও তো কোনো না কোনো মায়ের দুধ খেয়েছেন, তার প্রতি কি কোনো কর্তব্য নেই? বাচ্চার হক আদায় করতে গিয়ে মা ঘরে বসে থাকলো, ওদিকে বাচ্চার নানী বিনা চিকিৎসায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, সেটা খুব চমৎকার হবে, তাই না?

৩. কর্মজীবী মায়ের বাচ্চারা ভবিষ্যতে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে-
…খুব ভালো প্রস্তাব! সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে বাবা মাকে দেখাশোনা করতে না চায় তাহলে কোন দুঃখে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম সেই বাবা মা সন্তানের ঘাড়ে ভর দিয়ে থাকবে? তার চাইতে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ঢের ভালো!
ছেলের বউয়ের কালো মুখের সেবা পাওয়ার চাইতে টাকা দিয়ে ট্রেইনড নার্সের সেবা কিনে নেওয়াই তো উত্তম!

৪. কর্মজীবী মেয়েরা সংসারের দায়িত্ব পালন করে না-
…দায়িত্ব কি কেবল সংসারের প্রতিই আছে, আর কোথাও নেই? নিজের পরিবারের প্রতি নেই? দেশের প্রতি নেই?
আর একজন কর্মজীবী পুরুষ সংসারের কয়টা দায়িত্ব পালন করেন?

৫. কর্মজীবী নারীরা ‘দুশ্চরিত্রা’ হয়-
…এই পয়েন্ট বেশিরভাগ সময় উল্লেখ করেন ফেসবুকের চরিত্রবান ভাইয়েরা! তারা গণহারে সব কর্মজীবী মেয়েদের, মায়েদের গালি দিয়ে একেবারে রাস্তায় নামিয়ে দেন! চরিত্রবান ভাইয়েরা, ধরে নিলাম যেসব মেয়েরা চাকরি করে তারা সবাই খারাপ! কিন্তু আপনারা তো ফেরেশতা! তাহলে তারা খারাপি করে কাদের সাথে? খারাপ মেয়েগুলোই আসলে ফেরেশতাদের মাথাটা ঘুরিয়ে দেয়! সব দোষ ওই মেয়েদেরই!

৬. স্বামীর যদি যথেষ্ট ইনকাম থাকে তাহলে স্ত্রী কেন চাকরি করবে –
…ধরেন একজন বাবার পাঁচ মেয়ে, তিনি তার জীবনের সব সম্পদ, সব সঞ্চয় খরচ করে মেয়েদের পড়াশোনা শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন! পাঁচ মেয়ের সবার স্বামীই যথেষ্ট ইনকাম করেন তাই তারা কেউই চাকরি করেন না! সেক্ষেত্রে সেই বাবার কি হবে? তিনি তো মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে গিয়ে বৃদ্ধ বয়সের জন্য সঞ্চয়ও করতে পারেন নি! মেয়েদের স্বামীরা যদি তার শ্বশুর শ্বাশুড়ির ভরনপোষণ করতে রাজী না হয়,তখন?
এছাড়া যদি কোন কারণে স্বামীর ইনকাম বন্ধ হয়ে যায় বা কমে যায় তখন পরিবারটির কি অবস্থা হতে পারে তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?

৭. টাকা কামাইয়ের ধান্ধায় বাচ্চাকে সময় দেয় না-
…চাকরি করা কি কেবল টাকা কামাইয়ের ধান্ধা? আর কিছু না? চাকরি করেন না এমন মায়েরা কি সারাক্ষণ বাচ্চাকে সময় দিতে পারেন? তারা তো সারাদিন বসে থাকতে পারেন না, সংসারের অনেক কাজ করতে হয়! কিংবা বাচ্চার বাবা যিনি জব করেন, তিনিই বা কতটুকু সময় বাচ্চাকে দেন? তাহলে তো বাচ্চার বাবাও একই দোষে দোষী! কিন্তু কর্মজীবী বাবাকে কেউ বলে না যে টাকার ধান্ধায় বাচ্চাকে সময় দেয় না, শুধুমাত্র মা-ই এই দোষে একমাত্র দোষী! কেন? কে জানে!

এরকম আরও শত শত প্রশ্নবানে বিদ্ধ হয় একজন কর্মজীবী মা! এটা কোনো নতুন ঘটনা না! বছরের পর বছর ধরে ঘটে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা! কিন্তু আশার কথা হলো- প্রতিদিনই ওয়ার্কফোর্সে নারী যুক্ত হচ্ছেন! হয় চাকুরী ক্ষেত্রে কিংবা বিজনেসে কিংবা ফ্রি-ল্যান্সিং এ! এইসব নারীদের মধ্যে মায়েদের সংখ্যাও কিন্তু দিন দিন বাড়ছে! এত সব কটূক্তির ভীড়ে মায়েরা কিভাবে পারেন দিন যাপন করতে? কিভাবে প্রতিদিন যুদ্ধ করে থাকেন পুরো পৃথিবীর সাথে?

উত্তরটা কিন্তু খুব সহজ!
মায়ের সন্তানই মাকে সাহস জুগিয়ে চলে প্রতিনিয়ত!
সারা দুনিয়ার কাছে মা খারাপ হলেও সন্তানের কাছে কিন্তু মা সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে জ্ঞানী, সবচেয়ে সুন্দর!
সন্তানের হাসিমুখই হলো মায়ের এগিয়ে চলার প্রেরণা…।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.