উপলব্ধি (৩)

ফাহমিদা খানম:

সকালে খুব চাপের ভেতরে থাকি, ঠিকমতো নাস্তাও করা হয়ে উঠে না অনেক সময়। দুই বাচ্চাকে রেডি করে ওদের খাওয়ানো, টিফিন দেওয়া নিজেও রেডি হয়ে সবকিছু তালা মেরে একসাথে বের হয়ে যাই। সকালে আমি অসম্ভব ব্যস্ত থাকি বলে পরিচিত কেউই ফোন দেয় না। ফোনের শব্দে তাকিয়ে দেখি অজানা নাম্বার আর মায়ের একটা মিসড কল উঠে আছে, ভাবলাম স্কুলে গিয়ে সময় করে মাকে ফোন দিবো আর অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলে আমি সাধারণত ধরিও না। তবে সেই নাম্বার থেকে আবার কল আসায় এবার বাধ্য হয়ে ধরি, আর ওপাশ থেকে কথা শুনে চিৎকার করে উঠি। সবাই ছুটে আসে, ঘরদোর আজকে আর চেক না করেই আমরা সবাই বেরিয়ে পড়ি, পথে আমার স্বামীর সাথে বড়দার কথা হয় তারাও বাসা থেকে বেরিয়েছে। আমার চোখ জ্বালা করছে, পরশুদিন রাতেই মা ফোন করে আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, আর আমি বলেছিলাম একটু ছুটি পেলে দুইদিন গিয়ে থেকে আসবো। ছুটির দিনগুলোতে সারা সপ্তাহের জমানো কাজ থাকে, বাচ্চাদের আবদারে ওদের নিয়ে বেড়াতে যাই।

হাসপাতালে ভাই, ভাবি আর আমাদের অন্যান্য রিলেটিভদের দেখে অবাকই হলাম উনাদের কে খবর দিলো?

“সকালে আপা আমার সাথেই হাঁটে, আজকে না দেখে মনে করলাম হয়তো ঘুমের ওষুধ খাইয়া ঘুমাইছে। পরে বাসায় আইসা দেখি তখনও উঠে নাই, ডাকাডাকি করে শব্দ না পাইয়া সবাই মিলে দরজা ভাইংগা দেখি আপায় ফ্লোরে পইড়া রইছে”।
“আপনিই কি ফোন করেছিলেন?”
“আমার পোলার বউরে কইছিলাম তোমাগো ফোন করে জানাইতে”।
“আমাদের নাম্বার আপনারা কোথায় পেয়েছেন?”
“তোমার মায় কয়দিন আগেই সবার নাম্বার দিয়া কইছিল কিছু হইলে জানি ফোন করে খবর দেই”।

আমি বড়দা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকি এই চিন্তা আমাদের মাথায় আসেনি। আমি বড়দাকে মায়ের ফোনের কথা জানাতেই বড়দা জানালেন, পরশুদিন রাতে মা দাদাকেও ফোন করেছিলেন, কিন্তু বউ বাচ্চা নিয়ে রেস্টুরেন্টে ডিনারে থাকায় সেভাবে কথা বলতে পারেনি, তবে মা তাকেও দেখার ইচ্ছের কথা জানিয়েছিল। ভয়ংকর নিস্তব্ধতা চলে আসে দুই ভাইবোনের মধ্যে, বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাই না।

ডাক্তার এসে জানায় উনি হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন, ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, অপারেশন করার সাহস পাচ্ছেন না। আগামী ৭২ ঘন্টা অবজারবেশনে রাখবেন।
আমার হুট করে মনে পড়ে ফোনে মায়ের মিসড কলের কথা দাদাকে বলার সাহস হয় না। কেউ একজন আমাদের জন্যে চা-বিস্কুট নিয়ে এলো, আসলে তেষ্টা পেলেও চুপ ছিলাম। খেয়াল করে দেখলাম, একটা ছেলে আমাদের সব আত্মীয়দের চা –বিস্কুট খাওয়াচ্ছে। ডেকে পরিচয় জিজ্ঞেস করায় উত্তর দিলেন—

“আমি আপনাদের ছাদের রুমে থাকি”।
“সেখানে দুনিয়ার জিনিস স্তূপ করা, কী করে থাকো?”
“আপনাদের পাড়ার মসজিদের ইমামের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হই, আমি দুই মাস মেস ভাড়া দিতে পারিনি বলে বের করে দেওয়ায় মামার কাছে এসেছিলাম। মামা উনার কাছে নিয়ে এসেছিলেন”।

ছেলেটির চোখ দিয়ে টপাটপ পানি পড়তে থাকে।
আজীবন ভালবেসে এসব উটকো ঝামেলা নিজের কাঁধে টেনে নিতেন বলে একসময় আমরা বিরক্তই হতাম।

তিন ভাইবোন আর মা-বাবা নিয়ে খুব সুখের পরিবার ছিলো আমাদের। মা খুব পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন, প্রতিদিন শাড়িতে মাড় দিয়ে শুকালে সেটা ভাঁজ করে বালিশের তলায় রেখে দিতেন আর আমরা যতবার বিছানা এলোমেলো করতাম ততবার মা গুছাতেন বলে প্রচণ্ড বিরক্ত হতাম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমরা পড়তে বসলে মা-বাবা ভিসিয়ারে মুভি দেখতেন। তাদের বোঝাপড়ার রসায়ন ছিল অদ্ভুত, কখনও সামান্য বাদানুবাদ হতেও দেখিনি। বাবা গ্রামে জমিজমার কাজে যেতে গিয়ে রোড এক্সিডেন্টে মারা যাবার পর মা কঠিন হাতে সংসারের হাত ধরলেন, ঘরের কাজের লোক বাদ দিলেন। আমাদের সবার কাজ ভাগ করে দিলেন। দাদার আমলের পুরনো দোতলা বাসা আর পিছনে কয়েকটা টিনশেড ঘর ছিলো, মা আরও কয়েকটা ঘর তুলে ভাড়া দিলেন। এক চিলতে উঠানে সব বাচ্চারা বিকালে খেলতো।

আমাদের ঘরের জামা মা নিজেই ঘরে সেলাই করতেন, জীবন থেকে সব বাহুল্য বাদ দিয়েছিলেন বলে তিন ভাইবোন অভিযোগ করতাম, কারণ মায়ের মেহমানদারি বন্ধ হয়নি কখনও। গ্রাম থেকে যেই বিপদে পড়ে আসতো মা সাদরে খুশিমনে তাদের জন্যে করতেন, অথচ আমাদের শখ আহ্লাদ মেটানোর টাকা তার ছিলো না। বেঁচে যাওয়া খাবার কুকুর, বিড়াল আর কাককে খাওয়াতেন সবসময়। কলেজে পড়ার সময় কয়েক বান্ধবীর বিয়ে হলো, ওদের মায়েরা বলতো, সংসারই মেয়েদের আসল জায়গা, কিন্তু আমার স্বল্পশিক্ষিত মায়ের মুখে এসব কথা আমরা কখনোই শুনিনি। আমরা পাশ করে জব পাবার পর মা শুধু বলেছিলেন –

“তোমার বাবার ইচ্ছেগুলো পূরণ হইছে, এটাই আমার বড় পাওয়া। তোমাদের নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিলো। আমার দায়িত্ব শেষ, বহুদিন উনি একা আছেন এবার আমার যাওয়ার পালা”।

সেদিন মা অনেক কেঁদেছিলেন, বাবার মৃত্যুর পর সেদিন মাকে এভাবে কাঁদতে দেখেছিলাম। দাদা একটা বায়িং হাউজে আছে, আর আমি একটা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে, আর ছোটবোন লন্ডনে স্বামীর সাথে পড়ালেখা আর সংসার করছে। মা নিজেই দাদার জন্যে পছন্দ করে বউ আনলেও দুজনের মধ্যে মিল হলো না। ভাবী মায়ের অতিরিক্ত গোছানো স্বভাবকে বাতিক বলতো। ভাবীর জগত ছিলো বন্ধু-বান্ধব আর আড্ডা দিয়ে বেড়ানো।
মা পুরো বিপরীত স্বভাবের, কিন্তু মা কখনো সেসব নিয়ে কিছু বলতেন না। দাদার বিয়ের পর মা আরও বেশি কোণঠাসা করে নিলেন নিজেকে। বাসায় প্রচুর মেহমানদারি নিয়ে ভাবীর অভিযোগের পর মা শুনে বলেছিলেন—

“আমি যতদিন বেঁচে আছি ওরা আসবে, আমার মৃত্যুর পরে কেউই আর আসবে না”।
বিকালবেলা মা বারান্দায় বসে বাচ্চাদের খেলা দেখতেন, কিন্তু শব্দে ভাবীর ঘুম ভেঙ্গে যেতো বলে ভাবী বিরক্ত হয়ে আমাদের জানালে মাকে বলতাম—

“মা, পুরাতন ভাড়াটিয়া তুলে দিয়ে বরং ব্যাচেলর ভাড়া দাও, সারাদিন কাজে বাইরে থাকবে, শুধু রাতে ঘুমাতে আসবে“।
মা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“এরা সুখে -দুঃখে আমার সাথে অনেক বছর জড়িয়ে আছে, আমি ওদেরকে তাড়িয়ে দিবো?”
“ভাই-ভাবী আলাদা হয়ে গেলে তুমি একা হয়ে যাবে মা, কতবার বললাম আমার কাছে এসে থাকো, তাও তুমি রাজি নাহ”।
“তোমাদের সবার নিজের জগত হইছে, আমি তো দূরে থেকেও বিরক্তির কারণ, কাছে গিয়ে সেটুকু নষ্ট করতে চাই না। দোয়া করো আমি যেন কারও উপর নির্ভরশীল না হয়েই চলে যেতে পারি”।

একথা বললে আর কিছুই বলার থাকতো না, তবে দাদার ছেলে হবার পর ভেবেছিলাম সব হয়তো আস্তে-ধীরে ঠিক হবে এবার। ভাবী এই পরিবেশে সন্তান বড় করতে চাইলেন না। আমরা সবাই মিলে ডিসিশন নিলাম জায়গাটা ডেভলপমেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে দিবো, কিন্তু মা বেঁকে বসলেন।

“মা, মাসে মাসে ঘরভাড়া দিতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়, ফ্ল্যাট হলে সেটা লাগবে না, আর সবাই মিলে একই বাসায় থাকাও হবে”।
“তুমি নিচতলায় এসে থাকো, বাবার সম্পত্তিতে কন্যার হক আছে”।
“এই পরিবেশে থাকলে আমার বাচ্চা মানুষ হবে না”। ভাবীর এ কথায় মা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলেন—
“এই পরিবেশেই তোমার শ্বশুর ছাড়া আমি তিন সন্তান বড় করেছি বউ, কই কেউ তো বখে যায়নি”!

ভাবী আলাদা হবার সময় মা একদম বাধা দেননি বলে দাদা আক্ষেপ করে বলেছিলেন –
“মা এই বয়সে একাকি থাকতে রাজি, তবুও আমাদের কথা ভাবলেন না”।
আমি আর ছোট বোন অনেক চেয়েও মাকে কাছে এনে রাখতে পারিনি। বেড়াতে এলেই বাসার জন্যে অস্থির হয়ে যেতেন, কিন্তু সেখানে আছে কে!

মা সবসময়ই বলতেন—

“পানি সবসময় নিচের দিকে গড়ায় এটাই পানির ধর্ম, তোমরা নিজেদের জগতে ভালো থাকলেই আমি খুশি”।

মা কখনো নিজের জন্যে কিছুই চাইতেন না, তবে বিভিন্ন মানুষের সমস্যার জন্যে আমাদেরকে দান করতে বলতেন। মায়ের একাকি থাকা নিয়ে আত্মীয় স্বজনদের কথা শুনে বিরক্ত হলেও মা চুপ করে থাকতেন।
ছোটবেলা থেকেই দেখতাম উচ্ছিষ্ট খাবার মা কুকুর-বেড়াল আর কাকদের খাওয়াতেন, আর টিনশেডে থাকা মানুষদের সমস্যাকে নিজেরই ভাবতেন। আমরা এসবে ক্লান্ত বোধ করতাম।

“মা, ওরা মিথ্যা কথা বলে তোমাকে ঠকায়”।
“তোমরা কীভাবে জানলে মিথ্যা বলে? সবাইকে অবিশ্বাস করা ঠিক নাহ”।

“আমার মাথা কাজ করছে না আমি বাসায় গিয়ে শাওয়ার নিয়ে চলে আসবো”, দাদা আমাকেও অনুরোধ করলো, কিন্তু আমার মন সায় দিলো না। এতোগুলো বছর চাকুরি, সংসার আর সন্তানদের পিছনে দৌড়েছি, অথচ যার জন্যে এতোদূর আসা তাকেই সময় দেয়া হয়নি।

“আশেপাশে ভালো কিছু পাই নাই, এটুকু খেয়ে নিন”।

তাকিয়ে দেখি খালাম্মার ছেলের বউ খাওয়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জীবন কী অদ্ভুত! খাওয়া দেখে অনুভব করলাম খিদেরা মরে যায়নি।
ওয়েটিং রুমের এক কোণে বসে খালাম্মা জায়নামাজে কেঁদেই যাচ্ছেন, আর অন্যান্য সবাই যে যার মতো করে দোয়া দরুদ পড়ছে। মায়ের টিনশেডের বাসিন্দাদের অনেকেই আছেন, মসজিদের ইমাম চাচাকেও দেখলাম।

৭২ ঘন্টার আগেই সব শেষ হয়ে গেলো, মা আমাদের সামান্য সেবা করার সুযোগটুকুও দিলেন না। পড়ে গিয়ে ইন্টারনাল রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি।
মাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। মা ঘরে ঢুকতে পারলেন না। সব আগের মতোই গোছানো আছে, তবে সেসব আগলে রাখার মানুষটা চলে গেছে। ছোট বোনটাও খবর পেয়ে চলে এসেছে। এতো মানুষ, এরা কারা আমাদের জানা নাই। কয়েকদিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম সন্তানদের খবর রাখার অবস্থায় আসলে ছিলাম না। প্রতিবেলা সবাইকে খাওয়ানো, বাচ্চাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব কারা করেছে তাও জানি না।

“খালাম্মা, এতোসব খাবার কারা পাঠিয়েছে?”
“আশেপাশের মানুষই পাঠাইছে, তোমার মায় মানুষের বিপদে-আপদে সবার আগে ছুটে যাইতো”।
আমি আমার প্রতিবেশি কে সেটা জানি, ব্যস এটুকুই। মায়ের বিশালতার কাছে কতো ক্ষুদ্র আর তুচ্ছ আমরা!

তীব্র শোক এক সময় কমে আসে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। দাদা জানালেন, তিনি বাসায় ফিরবেন, আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বলি –
“এই পরিবেশে সন্তান মানুষ হবে না বলেই তুমি চলে গিয়েছিলে, আর আমিও কম স্বার্থপর নই, নিজের জগতে ব্যস্ত ছিলাম। শেষ ফোনে মা আমাদের দেখতে চেয়েছিলেন কেন! মা কি বুঝে গিয়েছিলেন? জানা হবে না কখনও, মৃত্যু টের পেয়েই কি সেদিন ভোরে ফোন করেছিলেন?

মা আজীবন দিয়েই গেছেন, বিনিময়ে কখনও কিছুই চাননি, কিছু দিতে গেলে উল্টো বলতেন—
“একা মানুষ আমি, বাড়িভাড়া দিয়ে চলে যায় আমার। তোমাদের বাবার অবর্তমানে তোমাদের অনেক ইচ্ছেই পূরণ করতে পারিনি, সেই আক্ষেপ রয়ে গেছে মনে, এখন নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছার মূল্য দাও”।

কখনও কি জানতে বা বুঝতে চেয়েছি মাকে? স্বার্থপরের মতো নিজেদের ইচ্ছেকেই চাপিয়ে দিতে চেয়েছি। মা তার সর্বোচ্চ দিয়ে আমাদের জন্যে করে গেছেন, অথচ তার বিশাল মনের সামান্য কণাও পাইনি কেউই। আমরা আমাদের সন্তানদের মা-বাবা হয়ে বড় আত্মতুষ্টিতে ভুগেছি, কতো ক্ষুদ্র করেছি নিজেদের জগত! মায়ের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে কল্পনা করে দেখি আমার জগতটা ভীষণ ছোট, অথচ মা ছিলেন একেবারেই বিপরীত। নিজেদের সন্তানদের ক্যারিয়ার সর্বস্ব বানাতে প্রাণপণ প্রচেষ্টা আমাদের, অথচ মা সবসময়ই আমাদের ভালো মানুষ হবার জন্য বলতেন।

মায়ের জন্যে সবার ভালবাসা দেখে নিজেকে সেখানে কল্পনা করতে গিয়ে দেখি কোথাও কেউ নাই। সন্তানরাও ক্যারিয়ার নিয়ে প্রবাসী জীবন বেছে নিয়েছে।
নিজেদের স্বার্থে নিজেদের জগত ছোট করার মাশুল দিতে হবে বৈকি!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.