কোথায় মিলবে নারীর মর্যাদা?

মোশফেক আরা শিমুল:

নারী..
একজন কন্যা, একজন বোন, একজন খালা/ফুফু, একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন দাদী/নানী ……….আরো নানা পরিচয় ও উপাধি নিয়ে একজন নারী তার জীবন পার করে দেয়। আর এইসব পরিচয়ের ভিড়ে হারিয়ে যায় নারীর ‘মানুষ’ পরিচয়টি।
‘নারী’ প্রাণীর একটি লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য। প্রাণীকুলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে লিঙ্গটি অপরিহার্য। কিন্তু মানুষ নারীর এই লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যটিকে সাজিয়েছে নানা রঙে-ঢঙে। মানুষ একজন নারীর লৈঙ্গিক পরিচয়টিকে ছাপিয়ে তাকে উপযুক্ত নারী হয়ে ওঠার জন্য তৈরি করেছে নানা নিয়মাবলি।

আমাদের দেশে একজন নারী জন্মের পর থেকেই শিখতে শুরু করে উৎকৃষ্ট নারী হয়ে ওঠার নানা কৌশল। তাকে কথা বলতে হবে আস্তে, মিষ্টি স্বরে। তাকে মাথা নিচু করে চলতে হবে। সে হাসবে সু-মধুর স্বরে অথবা নি:শব্দে। সে হবে লাজুক লতা, পুরুষের সামান্য কথাতেই সে লাল-নীল- বেগুনী হয়ে যাবে। সে হবে ধৈর্য্যশীল, সে কখনও রাগবে না। সে কাঁদবে নীরবে, সে সকল কষ্ট-দু:খ-যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করবে। তবেই সে হবে উৎকৃষ্ট নারী। এর ব্যত্যয় ঘটলে সে হয় পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে, হয় ব্যর্থ। এতে ওই নারীর মর্যার ক্ষতি না হলেও পরিবারের মান-সম্মানের হানি হয়। অর্থাৎ নারীকে চলতে হবে সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়মের মধ্যে। তার জোরে হাসতে ইচ্ছে করলেও সে মৃদু স্বরে হাসবে, তার রাগে চিৎকার করতে ইচ্ছে হলেও সে রাগ সহ্য করে মুখ লুকিয়ে কাঁদবে, তার মাথা উঁচু করে জোর কদমে হাঁটতে ইচ্ছে হলেও সে হাঁটবে মাথা নিচু করে ধীর কদমে। সে কোনকিছুই নিজের ইচ্ছেতে করতে পারবে না। এবং উৎকৃষ্ট নারী হওয়ার এই সমস্ত কৌশল তাকে আয়ত্ত করতে হবে পিতার ভালো মেয়ে, ভাইয়ের ভালো বোন, আর স্বামীর ভালো বউ হওয়ার জন্য। অর্থাৎ নারীর মর্যাদা নারীর নিজের স্বকীয়তার উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে অন্যের চাওয়ার উপর।

ছোটবেলা থেকেই নারীকে পরিবার উৎপাদন করতে থাকে একজন উৎকৃষ্ট নারী হিসেবে। এ সময় নারীর মর্যাদা নির্ভর করে তার পিতার উপর। একজন মেয়ে বাইরে খেললে বা বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরলে সে হয়ে যায় দস্যি/বেহায়া মেয়ে। এই দস্যি মেয়ের নিজের কোন ক্ষতি না হলেও তার পিতার ক্ষতি হয়, পিতার মর্যাদায় আঘাত লাগে। সুতরাং মেয়েটিকে প্রতি পদক্ষেপে ভাবতে হয় তার পিতার পছন্দ-অপন্দের কথা। উল্লেখ্য, এ সময় তার ভাইটি কিন্তু তার ইচ্ছে খুশিমতো অনেক কিছুই করতে পারে। ভাইটি বাইরে খেললে, ঘুরলে, হাসলে পিতার মর্যাদার কোন ক্ষতি হয় না। এখানে লক্ষ্যণীয় যে মা মেয়েটিকে গর্ভে ধরলেও মায়ের চাওয়া এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। লিঙ্গ হিসেবে নারী-পুরুষের সমান গুরুত্ব থাকলেও সমাজে-পরিবারে নারীর মর্যাদা নির্ভর করে পুরুষের ইচ্ছার উপর। নারীর চাওয়ার উপর তার মর্যাদা নির্ভর করে না।

মেয়েটি যখন কৈশোর পেরিয়ে যায়, তখন আরেক দফা সে নিজেকে প্রস্তুত করে নিজেকে বিবাহ উপযুক্ত করে তোলার জন্য। এবারে পরিবারের পাশাপাশি পুঁজিবাজারও তাকে উৎকৃষ্ট নারী হতে সাহায্য করে। হলুদ-চন্দন মেখে ত্বক ফর্সা করা, পার্লারে গিয়ে ভ্রু প্লাগ- ফেসিয়াল-চুলে বাহারী রংয়ের পরত, বিভিন্ন ধরনের প্রসাধন সামগ্রী ইত্যাদি ইত্যাদি। পাশাপাশি হাল ফ্যাশনের নানা ঢংয়ের পোশাক নারীকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। তবে নারীর নিজেকে এই আকর্ষণীয় করে তোলা তার নিজের জন্য নয়, সেটাও পুরুষের জন্যই। এমনকি হিজাবের ফাঁকেও চড়া মেকাপ আর বাহারী রংয়ের পাথর বসানো ক্লিপ নজর কাড়ে। এখানে নারী হয়ে ওঠে পুঁজিবাজারের উপযুক্ত সামগ্রী । তবে এসবই নারী করে নিজেকে উৎকৃষ্ট পাত্রী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। বলা ভালো পুঁজিবাজার ও পারিবারিক শিক্ষা দুইয়ে মিলে নারীকে বিবাহ উপযুক্ত করে তৈরি করে। এমনকি নরীর শিক্ষাটাও তার নিজের জন্য নয়। সে শিক্ষিত হয় একজন ভালো চাকুরিজীবী বর এবং উপযুক্ত মা হওয়ার জন্য। নারীর শিক্ষার মর্যাদাও নারীর নিজের জন্য নয়, সেটিও কোন পুরুষের জন্য।

সকল ধাপ পেরিয়ে নারী বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর নারীর পরিচয় নতুনভাবে অঙ্কিত হতে থাকে। কোন কোন নারী এতোদিনের ধারণ করা পিতার নাম ছেড়ে, এমনকি তার সার্টিফিকেট এর নাম ছেড়ে শুরুতেই সে তার স্বামীর নামটি নিজের নামের সাথে যুক্ত করে। তাহমিনা আহমেদ হয়ে যান তাহমিনা হোসেন। তার নাগরিকত্ব কার্ড থেকে শুরু করে সকল স্থানে সে তার স্বামীর নামটি যুক্ত করতে থাকে। তার স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। এখানে পুরুষের কিন্তু কিছুই পরিবর্তন হয় না। মোরশেদ ইসলাম কিন্তু কখনোই মোরশেদ রহমান হন না। মেয়েটি এবার পোশাক পরে স্বামীর ইচ্ছেতে, কথা বলে স্বামীর ইচ্ছেতে, হাঁটে স্বামীর ইচ্ছেতে……. । স্বামীর ইচ্ছেতেই তার মর্যাদা নিহিত, এখানে তার ইচ্ছাটা মুখ্য বিষয় নয়। কিছুদিন পর তার নামটিও হারিয়ে যায়, তাহমিনা হোসেন এবার হয়ে যায় হোসেন ভাবী, কিংবা হোসেনের স্ত্রী। স্কুল – কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় যে মেয়েটির ভালো ছাত্রী হিসেবে সুনাম ছিল, তার চাকরিটা এবার মুখ্য বিষয় নয়। স্বামী চাইলে সে চাকরি করবে নতুবা নয়, আবার চাকরিটিও হতে হবে স্বামীর পছন্দ মতো। সে এমন কোন চাকরি করতে পারবে না যাতে তার স্বামীর সম্মান যায়। আবার চাকরি করে বাসায় দেরিতে ফিরতে পারবে না, কোথাও যেতে পারবে না, সেসব কিছুও স্বামীর অনুমতি নিয়েই করতে হবে। স্বামীর কিন্তু স্ত্রীর অনুমতিতে কিছু আসে যায় না, বরং স্ত্রীর অনুমতি বিষয়টিই অপমানজনক! যে বিষয়টি নারীর জন্য বাধ্যতামূলক, সেটিই পুরুষের জন্য অপমানের!! নারীর মর্যাদা এখানেও মূলত নারীর নয় ,পুরুষের।

বিয়ের পরপরই নারীর জীবনে শুরু হয় আরেক চাওয়া। সেটা হলো একটি সন্তান। সেখানেও কিন্তু নারীর চাওয়াটা মুখ্য বিষয় নয়। একটি মেয়ের বিয়ে পুরানো হতে না হতেই পরিবার- প্রতিবেশী সবার আগ্রহ নারীটিকে নিয়ে নয়, কবে সে সন্তানসম্ভবা হবে সেটি নিয়ে। আমাদের দেশের নারীদের একটি বড় অংশই গর্ভবতী হন আকস্মিকভাবে, নিজে কিছু বোঝার আগেই, আর অধিকাংশ নারী পরিবার বা স্বামীর ইচ্ছায় নিজে মানসিকভাবে প্রস্তুত না হলেও গর্ভধারণ করেন। কিন্তু নারীর ইচ্ছার মূল্য এখানে খুব কম মানুষই দেন, বা নারীকে এটা জিজ্ঞাসা করা হয় না যে ‘তুমি এখন মা হতে চাও কি?’ যদিও নারীই গর্ভধারণ করেন, কিন্তু ইচ্ছাটা প্রাধান্য পায় অন্যের।

একটি মেয়ের বিয়ের পর পরিবর্তিত জীবন ও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তার বছরখানেক সময় তো লেগেই যায়, এছাড়াও প্রায় প্রতিটি মানুষেরই বিয়ের পর সংসার নিয়ে থাকে নানারকম স্বপ্ন। কিন্তু পরিবার ও সমাজের কাছে নারীর সেইসব স্বপ্নের চেয়ে, তার ইচ্ছার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তার গর্ভধারণ করা। যেন একজন নারীর বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো মা হওয়া, তার জীবনের আর কোন লক্ষ্য নেই। আবার কোন নারী যদি বিয়ের দীর্ঘদিন পরেও মা না হয় তাকে নিয়ে শুরু হয় নানা রকম কথা। এক্ষেত্রে পুরুষকে সাধারণত দায়ী করা হয় না, সকল দায় যেন নারীর। আর সকলের চাপে নারী এতোটাই বিপর্যস্ত হয় যে সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না, মা না হতে পারাটা হয়ে যায় তার জীবনের অভিশাপ। যেন মা হওয়াটাই নারীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সেটা না হলে নারীর জীবন বৃথা! এখানেও নারীর মর্যাদা নিহিত তার অস্তিত্ব এবং চাওয়ার উপর নয়, বরং সে মা হলো কিনা তার উপর।

এতো গেল গর্ভধারণ করার অবস্থা। এখানেই শেষ নয়, সন্তান জন্ম হওয়ার পরে একজন মায়ের পুরো পৃথিবী জুড়ে থাকে তার সন্তান। সন্তানের শরীর, সন্তানের যত্ন, সন্তানের এটা – সেটা কত কী, যেন সন্তানটি শুধুমাত্র মায়ের, বাবার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে পড়া নারীর পড়াশোনা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় মা হওয়ার পর, তখন তার পড়াশোনা করার চেয়ে সন্তান হয়ে যায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাকুরিজীবী নারীরা এমন ধরনের চাকুরি খোঁজেন যাতে তিনি সন্তানকে সময় দিতে পারেন, আবার অনেক নারী সন্তান হওয়ার পরে আরাধ্য চাকুরিটাও ছেড়ে দেন সন্তান লালন-পালনের জন্য। অনেক প্রতিষ্ঠিত নারীকে পরিবার থেকে চাপ দেওয়া হয় চাকুরি ছাড়তে। সন্তানটি দুজনের হলেও তাকে লালন – পালনের সকল দায়িত্ব নিতে হয় নারীকেই। এখানে নারীর ক্যারিয়ার মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক নারী ক্যারিয়ারে পুরুষের থেকে পিছিয়ে থাকেন শুধুমাত্র মা হওয়ার কারণে। নারীর মর্যাদা তখন নিহিত হয় সন্তানের উপর। সন্তান সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী কিনা, সে কোন স্কুলে ভর্তি হলো, কত মার্কস পেলো, সে কী কী করতে পারে, এসব কিছুর উপরই নারীর মর্যাদা তৈরি হয়। এবারে নারীর আরেক নতুন পরিচয় তৈরি হয়। ‘হোসেন ভাবী’ এবার হয়ে যায় ‘জিসানের আম্মু’ বা ‘জয়িতার আম্মু’ (ছেলে হলে মূলত: তার নামেই পরিচিত হয়)। এসব কিছুতেই নারী তার মর্যাদা খুঁজে পায়।

এভাবে শিশুকাল থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত নারীর মর্যাদা নিহিত হয় অন্যের উপর। নারী উৎপাদিত হয় একজন উৎকৃষ্ট কন্যা, উৎকৃষ্ট স্ত্রী, উৎকৃষ্ট মা হিসেবে। যেখানে একজন পুরুষের মর্যাদা তৈরি হয় তা কর্মের দ্বারা, সেখানে একজন নারীর মর্যাদা নারীর কর্মে নয়, অন্যের ইচ্ছের দ্বারা পরিচালিত হয়। নারী-পুরুষের সমান লৈঙ্গিক গুরুত্ব থাকলেও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নারীর নিজের কোন মর্যাদা নেই। এমনকি একজন নারী নির্যাতিত হলেও নির্যাতনকারী পুরুষের মর্যাদার হানি হয় না, বরং নারীর সম্মান নষ্ট হয়। যে কারণে ধর্ষনের শিকার একটি মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, কিন্তু ধর্ষক বুক ফুলিয়ে তার পৌরুষত্ব দেখিয়ে বেড়ায়। একজন স্ত্রী প্রতিনিয়ত স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মেকাপ লাগিয়ে, চোখে চশমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান আর বলেন – ‘আমার স্বামীর মতো ভালো মানুষ লাখে একটা হয় না’ পাছে লোকে তার স্বামীর বদনাম করে!! নিজে নির্যাতন সহ্য করলেও স্বামীর বদনাম হয় এমন কিছু বলতে নেই, কেননা তাতেই তার সম্মান নিহিত।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীকে তৈরি করেছে একটি উৎকৃষ্ট বস্তু হিসেবে। যে বস্তুটির প্রাণ তো আছে কিন্তু নিজের কোন অস্ত্বিত্ব নেই। সে তাই করে যা অন্যেরা চায়, সে তার সারাটিজীবন অন্যের ভাললাগার কাজে বিলীন করে দেয় এবং পিতৃতন্ত্র নারীকে তার মতো করে সাজায়। যেখানে নারী নিজের মর্যাদার বিষয়টি বিচার করে না। নারী তার পিতা এবং স্বামীকে বসান দেবতার আসনে আর সেখানে সে পূজারি। তার নিজস্বতা বলে কিছুই থাকতে নেই।

ধর্মীয় মৌলবাদ ও পুঁজিবাদ দুটোই পিতৃতন্ত্রকে চালিত করে। মৌলবাদ নরীর সকল স্বাধীনতা হরণ করে তাকে খাঁচায় বন্দি করে আর পুঁজিবাদ নারীকে পণ্যের মোড়কে সাজিয়ে তাকে তৈরি করে ভোগ্য বস্তুতে। যার কোনটিতেই নারীর নিজস্বতা বলতে কিছু নেই। তাই নারীকে তার নিজস্ব স্বকীয়তায় চলতে হবে। অন্যের ইচ্ছায় নয়, বরং নিজের যোগ্যতায় নিজের কর্মের দ্বারা নিজের পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। তবেই নারী পাবে প্রকৃত মর্যাদার আসনটি। কেননা অন্যের পরিচয় কখনো স্বীয় মর্যাদা বহন করতে পারে না।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.