পুরুষতান্ত্রিক সনদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে

প্রমা ইসরাত:

মামলার রায়ে বলা হয়েছে, মদ খেয়েছে, ডান্স করেছে, পাশাপাশি শুয়েছে, এরকম একটি সিচুয়েশনে ধর্ষণ কি করে হয়? কেউ মদ খেলো কিনা, কেউ ডান্স করলো কিনা, এমনকি কেউ বেডে পাশাপাশি শুয়ে রইলো কিনা সেগুলোর কোনটাই “ধর্ষণ হয় নাই”, এটা প্রমাণ করে না,এবং এরকম কোন সিচুয়েশনে কোন নারী যদি ধর্ষণের শিকার হোন, সেগুলোর কোনটাই ধর্ষণকে জায়েজ করে না।
কিন্তু মদ খেয়ে ডান্স করে পাশাপাশি শুয়ে থাকার পরও কোন নারী যদি যৌন সম্পর্ক করতে সম্মতি না দেয়, এবং তারপরও যদি ব্যক্তি জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তা ধর্ষণ।

ধর্ষণের আলামত, সংরক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আদালতে অপরাধ প্রমানে এই বিষয়টি বড় ভূমিকা রাখে। এটা সত্যি। কিন্তু তার মানে এই না যে, ৭২ ঘন্টা পর কেউ যদি মামলা করতে চায়, তবে পুলিশ মামলা নিবে না। পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য।
বহুকাল আগের পুরনো ধ্যান-ধারণা সম্বলিত কিছু আইন, এবং পিতৃতান্ত্রিক মন-মানসিকতায় দীক্ষিত কোন মানুষ, তিনি নারী হোক, পুরুষ হোক, বিচার কার্যে, বিচারক হিসেবে তার উপস্থিতি, সুবিচার পাওয়ার অন্তরায়।

২০২১ এ এসে, এমন নারী বিদ্বেষী, জেন্ডার অসংবেদনশীল একটি রায় সম্পর্কে পড়তে হবে, ভাবতে পারিনি। অনেকেই, বিচারকের জেন্ডার নারী দেখে, ফোড়ন কাটছেন, নারীই নারীর শত্রু। জ্বি না, নারী যখন পুরুষতন্ত্রের চেতনা লালন করেন, তখন তিনি নারী হলেও তিনি আসলে নারী মুক্তির কেউ নন, তিনি পুরুষতন্ত্রেরই একজন সৈনিক।
আমরা যেখানে দিনরাত জেন্ডার সমতার লক্ষ্যে চিৎকার করে যাচ্ছি, আজ সত্যিই ক্ষোভে, দুঃখে লজ্জায় আমরা সকলেই কিছুক্ষণের জন্য বাকশক্তি হারিয়েছি।
এই রায় দেখে, সন্দেহ জাগছে মনে। সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছি না। ক্ষমতাধর কেউ যদি অপরাধ করে, তবে বিচার পাওয়ার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিলো, আজ এই রায়ের মাধ্যমে তা একরকম প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গেলো।

এই রায়, ভবিষ্যতে অন্যান্য ধর্ষণ মামলায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বাংলাদেশের জেন্ডার অসংবেদনশীল পুলিশ প্রশাসন, এই রায় এর উপর ভিত্তি করে, আরও ভয়ংকর ভাবে ভিক্টিম ব্লেইমিং করবে, এবং গুরুতর ঘটনায়ও মামলা নিতে ঝামেলা করবে।
এই রায় দুর্নীতিগ্রস্ত এই দেশে, ধর্ষণ মামলা কে গুরুত্বহীন বিবেচনা করার জন্য একটা লাইসেন্স হিসেবে কাজ করবে।
আমরা জেন্ডার সমতা নিয়ে কথা বলি, লিখি, আন্দোলন করি, মিছিল করি, বিবৃতি দেই। এগুলো করে করে যতটুকু সমাজ এগিয়ে ছিলো, এর রায়ের মাধ্যমে সেই এগিয়ে যাওয়া আরো অনেক বেশি পিছিয়ে গেলো।

বাংলাদেশে নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলন যেন বানরের তেলমাখা বাঁশ এর সেই অংকের মতো, দুই ধাপ এগোলে চারধাপ পিছিয়ে যাচ্ছে।
নারীর সম্মান তার যোনিতে না। নারীর চরিত্রও তার যোনিতে না। নারী পূর্বে যৌন সম্পর্ক করেছে কী করেনি, সেই হিসেব করে তাকে চারিত্রিক সার্টিফিকেট দেয়ার যে পুরুষতান্ত্রিক প্রচলন, সেই প্রচলনের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে।

ধর্ষণ নারীর বিরুদ্ধে করা চরমমাত্রার একটি যৌন সহিংসতা। এই সহিংসতায় নারী শারীরিকভাবে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চাইতেও বেশি মানসিকভাবে, সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক অনেক সাহস জুটিয়ে তারপর একজন রেইপ ভিক্টিম মামলা করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেইসব কিছু ছাপিয়ে, সবকিছু বাদ দিয়ে, ৭২ ঘন্টা সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো? নারীর মর্যাদা নষ্ট হয় তার সম্মতি ব্যাতিরেকে, তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে। নারীর অপমান অসম্মান হয় তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে জোর করলে। শুধু নারী নয়, যে কোন মানুষের সম্মতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বনানী রেইনট্রির ধর্ষণ মামলায় সেই সম্মতি শব্দটি পুরোপুরি অনুপস্থিত।

দেশটি সত্যি সত্যিই ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান এর মতো আরেকটি দেশ হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
দুই লক্ষ মা বোনের সাথে যৌন সহিংসতা ঘটেছিলো যেই দেশে, সেই দেশে ধর্ষণের মামলার রায়ে বিভিন্ন অপেশাদার এবং জেন্ডার অসংবেদনশীল বক্তব্য দিয়েছেন, একজন নারী বিচারক।
ঠিক কী ধরনের অসভ্য ও ভয়ংকর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা হলে এমন অপেশাদার বক্তব্য দেয়া যায়, ভাবতে পারছি না।

আদালতের সময় নষ্ট??
কীসের জন্য এই আদালত?
মানুষের জন্য, মানুষ যেন সঠিক বিচার পায় সে জন্যই এই আদালত, এবং বিচার বিভাগ।
সেই “ন্যায় বিচার যখন চাই, আদালতের সময় নাই?”

লেখক-প্রমা ইসরাত
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.