ধর্ষণ মামলাগুলো কেন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত!

উম্মে শায়লা রুমকী:

ধর্ষণ নিয়ে আমাদের রয়েছে নানা মত নানা পথ। একটু পড়াশোনা করছিলাম এই নিয়ে। দেশের একজন নারী বিচারকের প্রহসন আরও ভাবিয়ে তুললো।

গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা অনুযায়ী ধর্ষণ হচ্ছে কোনো ব্যক্তির অনিচ্ছায় তার সাথে বলপূর্বক অথবা কৌশলে যৌনসঙ্গম বা যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া বা সম্মতি দেয়ার বয়সের নিচে নাবালক কারও সাথে (যেমন- ১৪ বছরের মেয়ে বা ছেলের সাথে) যৌনসঙ্গম বা যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া, এইক্ষেত্রে নাবালক বা নাবালিকা “সম্মতি” দিলে-ও সেটি ধর্ষণ, কারণ সে সম্মতি দেয়ার বয়সী নয়, আইনগতভাবে সে এখনও শিশু বা তার অভিভাবক আছে।

ধর্ষণের নানা কারণ থাকতে পারে, তবে গবেষণা বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণ পূর্বপরিকল্পিত বা আবেগতাড়িত (রাগ, হিংসা, হিংস্রতা অনেক কিছু হতে পারে) ঘটনার ফলাফল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কানাডায় প্রায় ধর্ষণের ৭০% ঘটে মাদক-প্রভাবিত অবস্থায়, যেমন হয় ধর্ষক মাদক বা ড্রাগের প্রভাবে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে, অথবা যে কেউ নেশাগ্রস্ত হলে তার দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা। ধর্ষণ কেবল যৌনানন্দ লাভের জন্য হয় না, হিংস্রতা, আগ্রাসন, ও আধিপত্য বিস্তারও হতে পারে। অনেক পুরুষ কিন্তু ধর্ষণের শিকার হতে পারে, যেমন যৌনানন্দ লাভ বা বিকৃত যৌনাচারের কারণে বয়স্ক কোনো নারী দ্বারা নাবালক কেউ ধর্ষণের শিকার হওয়া, কিংবা জেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অন্যত্র অন্য পুরুষ দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়া।

ধর্ষক আসলে কে বা কারা? গবেষণায় মূলত দুই ধরনের ধর্ষকের কথা বলা হয়েছে , যেমন, মনোবিকারগ্রস্ত (psychopathic) ও অমনোবিকারগ্রস্ত (non-psychopathic)। যদিও প্রায় সব ধরনের ধর্ষকদের মাঝে কিছু বৈশিষ্ট্য প্রায় লক্ষ্য করা যায়, যেমন, নারীদের প্রতি উগ্র আচরণ বা মনোভাব, নারীদের দ্বারা প্রতারিত অথবা মনে করা যে জীবনের কোনো খারাপ ঘটনার জন্য একজন নারী দায়ী বা বাবা-মায়ের ঝগড়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বড় হওয়া কিংবা ছোটবেলায় শারীরিক অথবা যৌনভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া। ধর্ষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা রিপোর্ট অনুযায়ী , তারা ধর্ষণ করতে তৎপর হয় একাকিত্ব, রাগ, অপারদর্শিতা, অপমান, মানহানি এবং প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি অনুভূতির তীব্রতা থেকে ।

গবেষণা অনুযায়ী সব ধর্ষকই নারীদের প্রতি হিংস্র মনোভাব ও যৌনাকাঙ্ক্ষার কারণে ধর্ষণ করে। গবেষকদের মতে চার ধরণের ধর্ষক আছে , যেমন: একদল পুরোপুরি হিংস্রতা ও ক্রোধের কারণে ধর্ষণ করে থাকে, দ্বিতীয় একদল আছে যারা শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য নারীদের ধর্ষণ করে থাকে, তৃতীয় দল তাদের শিকারের প্রতি নমনীয়, কৈফিয়তমূলক বা প্রশংসাসূচক আচরণ করে এবং চতুর্থ দল হচ্ছে যৌন তাড়নার কারণে ধর্ষণ করে। তবে অন্যান্য গবেষকদের মতে এই বিভক্তকরণ পুরোপুরি সঠিক নয়, কিছু কিছু ধর্ষককে উল্লেখিত কোনো দলেই ফেলা যায় না, অবস্থা, সময় ও পারিপার্শ্বিক অনুসারে তাদের ধর্ষণের কারণ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে ।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে একবার ধর্ষণ করেছে সে আবার করতে চাইবে বা করার সম্ভাবনা বেশি, এবং অধিকাংশ ধর্ষণই পূর্বপরিকল্পিত। শতকরা ৮0 ভাগ ধর্ষণ হয়ে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়ির আশপাশেই অথবা বাড়িতেই বা জনবিরল কিংবা জনসমাগম কম এমন জায়গায় যেমন- বহুতল ভবনের লিফট বা সিঁড়িতে, পরিত্যক্ত ভবন বা বাড়ির নিরিবিলি অংশে )।

ইদানিং আরো একটি ব্যাপার বেশ বিব্রতকর, “বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ”। দেশের আইন কী বলে আসলে!

বাংলাদেশে অনেক মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভুক্তভোগীকে ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে’ ধর্ষণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় নারী ও শিশু দমন নির্যাতন আইনে মূলত মামলা করা হয়। কারণ এই আইনে বলা আছে, যদি প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায় করে যৌন সম্পর্ক করা হয়, তাহলে সেটা ধর্ষণ হিসেবে দেখা হবে।মুশকিল হলো , বিয়ের প্রলোভন দেখানোর বিষয়টি আইনানুযায়ী প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়ের মধ্যে পড়লেও নানা জটিলতা রয়েছে। যেমন এটা নির্ভর করে কতদিন ধরে বিয়ের আশ্বাস দেয়া হয়েছে, সম্পর্কের গভীরতা কেমন ছিল, লিখিতভাবে বিবাহিত না থাকলেও ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে করেছিলেন কিনা, কোন সাক্ষী আছে কিনা! কিন্তু একই রকম অভিযোগ কোন পুরুষ আনতে পারবেন না, বাংলাদেশের আইনে সেই সুযোগ নেই।

অন্যদিকে বিয়ে করা স্ত্রীর সাথে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করাকেও পৃথিবীর কোন কোন দেশে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটা শাস্তিযোগ্য। এই ধরনের যৌন সহিংসতাকে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জাতিসংঘও এটিকে ভয়াবহ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা বলে মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে এমন অপরাধের উল্লেখ নেই।

বাংলাদেশে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ এবং ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যুর শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।তবে সেই আইনে পরিবর্তন এনে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়া সপ্তম দেশ হলো বাংলাদেশ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, ধর্ষণ বা ধর্ষণ-পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলেও একই শাস্তি হবে। যদি কোন ব্যক্তি তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে শ্লীলতাহানি করেন তাহলে এটি যৌন নিপীড়ন বলে বিবেচিত হবে। নানা রকম ফাঁকফোকর গলে আসল অপরাধী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রেহাই পেয়ে যায়।

ধর্ষণের মতন অপরাধে কোনরকম ছাড় না দিয়ে দ্রুত বিচার করা জরুরি। কিন্ত বিচারকদের প্রহসন আমাদের হতাশ করছে ক্রমাগত। একটি দেশে যদি বিচারকদের বিচার কার্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বা বিচারক তাদের বিচার কার্য নিয়ে ক্ষমা চেয়ে থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দৈন্যতা দেখিয়ে দেয়, আমাদের ভাবতে হবে। আইন সংশোধন করতে হবে এবং ধর্ষণের অভিযোগকে জিরো টলারেন্স দিয়ে মাপতে হবে। সভ্যতার সিঁড়িতে উঠতে হলে আইন এবং তার প্রয়োগ যথাযথ না হলে হিতে বিপরীত হয়।

তথ্যসূত্র : বিবিসি এবং প্রকাশিত আর্টিকেল ও জার্নাল

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.