রেইন্ট্রি হোটেলে ধর্ষণের এ কেমন বিচারের রায়

এম আর ফারজানা:

মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হলে ভয়ে চুপ হয়ে যায় সমাজের তিরস্কারের ভয়ে, বিচার না পাবার ভয়ে। পায়ে পায়ে ভয়ের শেকল। এই শেকল ছিঁড়ে যখন কোন মেয়ে সাহসী হয়ে প্রতিবাদ করে, বিচার চায়, সেখানেও তাকে থামিয়ে দেয়া হয়। উল্টা তাকে চরিত্রহীন, নষ্টা বলে অপবাদ দেয়া হয়। হেনস্তা করা হয় তার পরিবারের সদস্যদের। আর অপরাধী যদি ক্ষমতাশালী হয়, বিত্তবান হয় তাহলে তো কথাই নেই। ক্ষমতার দাপটে এরা উত্রে যায়, খোলস বদল করে পাকপবিত্র হয়ে যায়। গতকাল বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলায় পাঁচ আসামিকে খালাস দিয়েছেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক মোছা. কামরুন্নাহার। কারণ, প্রমাণ মেলেনি।

জানার চেষ্টা করলাম কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য দিয়ে এমন রায় এলো! কী প্রমাণ মেলেনি! মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যম থেকে রায় সম্পর্কে যা জানলাম, রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের মামলায় ভুক্তভোগী রেইনট্রি হোটেলে যান, সেটি প্রমাণ করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। বলা হচ্ছে – হোটেলের কোনো সাক্ষী বলেননি সেদিন ওই দুই নারী হোটেলে ছিলেন। এমনকি হোটেলের রেজিস্ট্রার খাতায় ওই দুই ভুক্তভোগীর নাম নেই। আজব, ভিক্টিম যদি নাই গিয়ে থাকে তাহলে তো মামলা বাতিল বা খারিজ হয়ে যায়। সেখানে মেডিক্যাল রিপোর্টের কী দরকার? রাসায়নিক পরীক্ষার কোন প্রয়োজন আছে কি? তদন্ত কর্মকর্তা কী তদন্ত করলো? আর যদি ভিক্টিম গিয়েই থাকে তাহলে আদালতের কি তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়ার প্রয়োজন ছিল না যে, আরো সময় নিয়ে সঠিক তথ্য জানানোর? সেই হোটেলে কি সিসি ক্যামেরা ছিল না? এ ব্যাপারে অবশ্য কারো কোন বক্তব্য পাইনি।

আবার মিডিয়ার অন্য জায়গায় দেখলাম, মেয়েরা গিয়েছে ঠিকই, তবে মিউচুয়েল সেক্স হয়েছে। অর্থাৎ দুজনের সম্মতিতে। তাহলে তদন্ত কর্মকর্তা, সাক্ষীরা মিথ্যে বলছে? আমরা অতীতে দেখেছি, এমন অনেক মামলার তদন্ত টাকার বিনিময়ে পাল্টে যায়। এমনও দেখেছি ক্ষমতার দাপটে সত্য কীভাবে মিথ্যা হয়ে যায়। সাক্ষী কীভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য দেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ করে কীভাবে মিথ্যা বলে!

শুধু তাই না, রায়ে আরো বলা হয় সেটা মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে এসেছে – ধর্ষণের ঘটনার ৭২ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর পুলিশ যেন মামলা গ্রহণ না করেন।
ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। একটা মেয়ের জীবন নিঃশেষ করে দেয়। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি সারা জীবনেও এমন তিক্ত ঘটনার কথা ভুলতে পারে না। আর সেখানে এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে কিনা বলা হয়েছে ৭২ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয়ে গেলে মামলা না নিতে !! বিচারকের এমন নির্দেশনা বরং ধর্ষকদের আরো সুবিধাই করে দিল। কারণ কেউ যদি ধর্ষণ করে ভিক্টিমকে আটকে রাখে ৭২ ঘণ্টা, তাহলে তো কেল্লাফতে, অর্থাৎ বিচারের আওতামুক্ত ধর্ষক। তার আর কিছু হবে না। সমাজের জন্য এমন নির্দেশনা খুব খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করলো। এমন নির্দেশনা বরং বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করলো।

আচ্ছা যদি বিচারকের নিজের ক্ষেত্রে এমন ঘটে, কিংবা তার পরিবারের কারো ক্ষেত্রে তাহলে কী করবেন ? আমি মনে প্রাণে চাই এমন ঘটনা কোন নারীর জীবনেই না আসুক। এই আধুনিক যুগে বরং অপরাধ নির্ণয়ের অনেক সুবিধা থাকার কথা। সে ক্ষেত্রে যখনই একজন ভিক্টিম মামলা করবে তখনই নেয়ার কথা বললে বরং ন্যায়সঙ্গত হতো।

সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে সবাইর অবস্থান এক নয়। শহর,উপজেলা কিংবা গ্রামের পরিবেশ এক নয়। সেদিক বিবেচনায় রাখা দরকার ছিল। গ্রামে বা উপজেলায় একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তার পক্ষে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। আমরা কেন শুধ শহরের কথা ভাববো ? তাহলে গ্রামে বা উপজলেয়ার মেয়েরা কি এর বাইরে? তারা কি এ দেশের নাগরিক না ? এই সমস্ত ঘটনায় সর্বস্তরের নারীদের কথায় ভাবা উচিত। ধর্ষণ শুধু শহরেই হয় না, গ্রামেও হয়। লুকিয়ে যায় বা ভয়ে চেপে যায় বলে প্রকাশ্যে আসে না। এমন বিচারের রায়ে বরং তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সার্বিক সমাজের কথা আমাদের ভাবতে হবে।

বিচারক যে সমস্ত কথা বলছেন তাতে ন্যায় বিচার দূরে থাক, উলটা মেয়েগুলোকে তিরস্কার করা হয়েছে। বিচারক কামরুন্নাহার বলেন, ‘মামলার দুই ভিকটিম বিশ্বাসযোগ্য নয় । ভিকটিম দুজনই আগে থেকেই সেক্সুয়াল কাজে অভ্যস্ত, হাসপাতাল রিপোর্ট তাই বলে’ । মানলাম তারা সেক্সুয়াল কাজে অভ্যস্ত ,কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাদের যে কেউ ধর্ষণ করতে পারে। একজন শরীর বেচা শ্রমিকেরও ‘না’ বলার অধিকার আছে। তারা যদি ইচ্ছায় গিয়ে থাকেন তাহলে মামলা করতে যাবেন কোন দুঃখে? অর্থের জন্য? কিন্তু শাফাতের তো অর্থের অভাব নেই। মেয়েগুলোকে অর্থ দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিতে পারতো। তাই নয় কি? মেয়েগুলো যদি হেনস্তা নাই হতো, ধর্ষণের শিকার নাই হতো, তাহলে এমন মামলা করতে যেত না। কারণ শাফাতের বাবা যে একজন বিত্তবান, মামলা হলে যে হেনস্তা হবে, মেয়েগুলো তা কি জানতো না ? জানতো। বরং সাহস করে রুখে দাঁড়িয়েছে অর্থের জন্য নয়, চেয়েছে ধর্ষকদের বিচার হোক যাতে অন্য কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার না হয়।

একটা ন্যায় বিচার সমাজ থেকে আরো দশটা অপরাধ কমিয়ে দিতে পারে। কারন অপরাধীরা জেনে যায় অপরাধ করে মাপ পাবে না, বিচার হবে। কিন্তু আজ কি দেখলাম উল্টা মেয়েগুলোকে এখন তির্যক নিন্দা করছে মানুষ এমন রায়ের ফলে । আর আসামিরা আলহামদুল্লাহ বলে হাসি মুখে বেরিয়ে আসছে। এতে করে সমাজে কী বার্তা গেল? যে মেয়েরাই খারাপ। এই রায়ের ফলে মেয়েরা এখন আরও নিশ্চুপ হয়ে যাবে ভয়ে।

শুধু তাই নয়, বলা হচ্ছে সাফাতের সাবেক স্ত্রী’র প্ররোচনায় নাকি মেয়েরা মামলা করেছে। কী অদ্ভুত কথা। কার প্ররোচনায় মামলা করলো, কীভাবে করলো সেটা দেখার বিষয় না। ঘটনা সটিক কিনা, ধর্ষণ হয়েছে কিনা সেটা দেখবে আদালত। প্ররোচনায় কী আসে যায়! এই মামলার আসামি নাঈম আশরাফ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। এই জবানবন্দি নাকি অসত্য। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তিনি নাকি স্বেচ্ছায় দেননি। তার মানে তাকে দিয়ে জোর করিয়ে দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে পুলিশের বক্তব্য কী? এ ব্যাপারে কারো কোন বক্তব্য পাইনি কোথাও।

আসলে আমাদের সিস্টেমে অনেক সমস্যা। সবাই সবার সুবিধা মত কাজ করে। জবাবদিহিতা নাই। এক মুনিয়ার ব্যাপারে দেখলাম মিডিয়া কেমন চুপ ছিল। যেন কোন ঘটনাই ঘটেনি। অথচ মেয়েটি পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল। যার দিকে আঙ্গুল তুললো সেই আনভির বহাল তবিয়েতেই আছে। এবং থাকবে। কারণ, ক্ষমতা।

আমাদের আইনের আপডেট দরকার। সেই ব্রিটিশ আমলের আইন পড়ে আছে। কিন্তু সমাজ তো সেই জায়গায় নেই ৱ, সাত কোটি বাঙ্গালী এখন ১৭ কোটি। চিঠির যুগ শেষ হয়ে এখন ইন্টারনেটের যুগ। মানুষ বাড়ছে, সেইসাথে অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে, অপরাধের ধরনও পাল্টেছে। কিন্তু আইন সেই অবস্থানেই আছে। আইনের পরিবর্তন দরকার বা আপডেট। বর্তমান সমাজের কথা ভেবে, প্রযুক্তির কথা ভেবে অপরাধীর যাতে সঠিক শাস্তি হয় সেরকম আইন বলবত থাকা উচিত। বিচারক যাতে আইনের দিক নিয়ে অপরাধীর দ্রুত বিচার করতে পারে, সেটাও ভেবে দেখতে হবে।

সঠিক ও ন্যায়বিচার আমাদের কাম্য। আজ হয়তো অন্যের মেয়ে ভিক্টিম। কাল আপনার পরিবারের কেউ এ অবস্থার শিকার হবে না তা কি বলতে পারেন? তাই সোচ্চার হোন, আপনার সন্তানের কথা ভেবে, পরিবারের কথা ভেবে। মনে রাখবেন অন্যের খারাপ সময় নিয়ে তাচ্ছিল করবেন, সেটা নিজের উপর আসতে বেশি সময় লাগবে না। কারণ ধর্ষকরা ভদ্রবেশে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ পেলেই তাদের চরিত্র প্রকাশ পায়। সমাজে এমন বহু শাফাত, বিল্লাল, সাদমান, নাঈম আছে প্রকাশ পেলেই আমরা জানতে পারি।

এম আর ফারজানা, কলামিস্ট।
নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
১২নভেম্বর ২০২১।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.