‘অধিকার সচেতন মানুষই পারে রাজনীতিকে সুন্দর করতে’

0

Selina Hossainউইমেন চ্যাপ্টার: ‘রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয় আমার নিজের হয়ে উঠার একটি সোনালী সময়। সাহিত্যের দিক থেকে, সাংস্কৃতিক চিন্তার দিক থেকে, রাজনৈতিক সচেতন বোধ তৈরির দিক থেকে, নিজস্ব জায়গা থেকে আমি আমার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে চিন্তা করবো বুঝবো, এ বিষয়টা আমার গড়ে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়।’

বলছিলেন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। গত ৮ই আগস্ট বিবিসি বাংলার আকবর হোসেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে প্রায় ৪০ টি প্রকাশিত লেখার লেখক সেলিনা হোসেন।

লক্ষীপুরে জন্ম হলেও পিতার চাকরিসূত্রে রাজশাহী বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় বেড়ে উঠার সুযোগ হয় তাঁর। দেখেছেন নানান ধরনের মানুষ, বনের নানা রূপ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন বাম রাজনীতিতে। ছাত্র ইউনিয়নের হয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেছিলেন।

সাক্ষাৎকারে নিজের লেখক হওয়ার পেছনে শৈশব ও কৈশরের জীবনের প্রভাবকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার শৈশব ছিলো বগুড়ায় করোতোয়া নদীর তীরে। পঞ্চাশের দশকে অনেক বড় একটা প্রকৃতিক পরিবেশে আমি বড় হতে পেরেছি। নদ-নদী, খাল-বিল গাছপালার মধ্যে আমার অবাদ স্বাধীনতা ছিলো। মূলত সেসময়েই আমি প্রকৃতিকে চিনেছি। যে কারণেরই আমার উপন্যাসে অনেকবার প্রকৃতিই একটা চরিত্র হিসেবে এসেছে।’

 সে সময়েই আমার দারিদ্র্য দেখা হয়েছে, জীবন দেখা হয়েছে, মানুষে মানুষে সম্পর্কের সূত্রগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রথম উপন্যাস জলোচ্ছ্বাস সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে সত্তরের দশকের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। ত্রাণ কাজে সহায়তা করার সুবাদে সে সময় আমি ওইসব অঞ্চল অনেক ঘুরেছি। ওই সূত্র ধরেই আমার জলোচ্ছাস উপন্যাসটা লেখা।’

‘সাধারণত ফিকশান বা কল্পকাহিনী নির্ভর লেখাগুলো বেশি জনপ্রিয় বর্তমান সময়ে কিন্তু আপনার লেখাগুলো (ভূমি ও কুসুম, জলোচ্ছাস, হাঙ্গর-নদী-গ্রেনেড, পোকামাকড়ের ঘরবসতি) বাস্তব জীবনকাহিনী অবলম্বনে লেখা। এটিকে আপনি কিভাবে দেখেন?’- সঞ্চালকের এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে সেলিনা হোসেন বলেন, কোন লেখক কী বাস্তব জীবনের বাহিরে যেতে পারেন? আমার তো মনে হয় না। এসময় তিনি তারই লেখা ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসের উদাহরণ টেনে বলেন, উপন্যাসটি মূলত ছিটমহল, দহগ্রাম, আঙ্গরপোতার জীবনের পটভূমিতে। আমি যখন ওখানে ঘুরতে যাই তখন দেখি, ছোট্ট একটি এলাকা, চারপাশে বিএসএফ ঘিরে রেখেছে। সেখান থেকে কারও বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। কোন ছোট প্রয়োজনেও এলাকা থেকে কেউ বের হতে পারে না। তখনই আমার মনে হয় এ বিষয়ে একটি গল্প তৈরি হতে পারে যে এই গণমানুষের জীবনের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী?এবং আন্ত:রাষ্ট্রের সম্পর্কের পটভূমিতে মানুষের জীবন কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

 তিনি বলেন, যখন নিজের উপলব্ধিগুলোর সাথে কল্পনার মিশেল হয় তখনই একটি ফিকশান তৈরি হয়। কারণ আমি ওই চরিত্রগুলোকে সরাসরি নিচ্ছি না। আমি তার সমস্যাগুলোকে নিয়ে গল্পটা নির্মাণ করছি।

 একেবারে কল্পকাহিনী নির্ভর লেখা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার তৃতীয় অথবা চতুর্থ রচনা মগ্ন চৈতন্যের শেষ। কিছুই ছিলোনা। একেবারেই সাদাসিদে প্রেমের গল্প ছিলো। ৭৭ এ সেটি প্রকাশের পরে আমি ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করি। তিনি উল্লেখ করেন, কিছুদিন আগেও কোন এক যায়গায় তাকে মগ্ন চৈতন্যের শেষ নামে সম্মোধন করা হয়েছিলো।

 হাঙ্গর-নদী-গ্রেনেডের কাহিনী সম্পর্কে সেলিনা হোসেন বলেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের পটভুমিতে লেখা। একজন নারী দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে তাঁর একটি প্রতিবন্ধী ছেলের হাতে রাইফেল দিয়ে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি এমন কাজ করেন।

 বাংলা একাডেমি উপন্যাসটি ইংরেজী অনুবাদ করার পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। সিকাগোর ‘অকটেন কমিউনিটি কলেজ’ এ পাঠ্য হয়। তিনি উপন্যাসটির ব্যাপক পরিচিতির জন্য শুধুমাত্র চলচ্চিত্রকেই চলিকাশক্তি হিসেবে না দেখে এটিকে দক্ষিণ এশীয় সহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে দেখেন। এই উপন্যাসেই তিনি দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার জন্য মানুষ কিভাবে তার সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিতে পারেন।

 এই উপন্যাসের জন্য কখনো কখনো সমালোচিত হতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দিল্লীতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সময় প্রতিবন্ধীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলেন কিছু দর্শক।

 লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলা একাডেমিতে কাজ করেছেন তিনি। এ সময় মূলত গবেষণাধর্মী কাজেই বেশি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি বলেন, এ সময়কার গবেষণাই মূলত তার লেখালেখিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

 ‘বাংলা একাডেমি আমাকে গবেষণাধর্মী কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। সেখান থেকেই গবেষণাধর্মী কাজ শিখেছি। সেই শিক্ষাকেই পরবর্তিতে আমি সাহিত্যে রুপান্তর করার চেষ্টা করেছি।’

 বিবিধ মেধার অধিকারী হওয়া সত্বেও তিনি লেখালেখিকেই বেছে নেন। তার ভাষায়, ‘আমি কিন্তু অনেক কিছু করতাম, আমি গান করতাম, নাচ শিখেছি। গিটারও বাজাতাম। কিন্তু বাংলা একাডেমিতে কাজ করার পর আমি সব ছেড়ে লেখাকেই বেছে নিই। কারণ আমি জানি জানি এতকিছু করার চেষ্টা করলে আদতে কিছুই করা যাবে না।’

 সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের জীবনের বিয়োগান্তক ঘটনা নিয়েও লিখেছেন তিনি। নিজ কন্যা বৈমানিক ফারিয়া লারার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে লিখেছেন একটি উপন্যাস।

 প্রবল কষ্ট হলেও লিখতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই লেখাটিতে আমি দেখাতে চেয়েছি মা-মেয়ের সম্পর্ক, বাবা-মার সাথে সন্তানের সম্পর্কের টানাপোড়েন। কি করলে ভালো হয় সম্পর্ক, এ সম্পর্কে চিন্তা করেই লেখাটি লেখা।’

 ব্যক্তিগত দায়বোধ ও এই সমাজের জন্য কিছু করার লক্ষ্য থেকেই তিনি ট্রান্সফাপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ট্রাস্টি হিসেবে যুক্ত আছেন ও কাজ করে যাচ্ছেন। নিজ মেয়ের নামে একটি ফাউন্ডেশান খুলে কাজ করছেন তৃণমূলে।

 ‘আমি যখন রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয়ে পড়ি তখন আমি মাকর্স, এঙ্গেলস পড়ি। তখন খুব স্বপ্ন ছিলো ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য হয়তো কিছু করতে পারবো। মূলত ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের জায়গা থেকে কাজ করে যাচ্ছি।’

 লেখালেখি না করলে সোস্যাল ওয়ার্কার হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এখনো তিনি মানুষকে অধিকার সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছেন। তার মতে, ‘একমাত্র অধিকার সচেতন মানুষই পারে রাজনীতিকে সুন্দর করতে আর রাষ্ট্রক্ষমতাকে বদলাতে।’

 যত কিছুই করেন না কেন তার মতে শেষ ঠিকানা ও পরিচয় সেই লেখালেখিই। বর্তমানে তিনি ‘গেরিলা ও বীরাঙ্গনা’ নামে একটি উপন্যাস লিখছেন। এটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই সমাজ ও রাষ্ট্র বীরাঙ্গনাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারেনি। আমি দেখাতে চাই কিভাবে একজন গেরিলা যুদ্ধ করেছে, আর একজন বীরাঙ্গনা সেই যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়েছে।’ বইটি আগামী বইমেলায় আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.