লাভ বোম্বিং -যেটা আজকে আদর, কালকে নিপীড়ন (পর্ব-১)

প্রমা ইসরাত:

মানুষ অনেক সময়ই একটা বিষাক্ত সম্পর্কের ভেতরে আটকে যায়। কেউ একদমই নিরুপায় থাকে, নানান সামাজিক, অর্থনৈতিক চাপে পড়ে, কেউ সন্তানের কথা ভেবে আটকে থাকে। বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে মানসিকভাবে বের হওয়া খুব সহজ কিছু না। এটা তো মেশিনের সুইচ এর মতো কিছু না যে অফ করে দিলেই অফ হয়ে যাবে। মানবিক সম্পর্কগুলো, বিশেষ করে ইন্টিমেট সম্পর্কগুলোতে হরমোনাল বিষয় জড়িত থাকে।

অক্সিটোসিন, ডোপামিন, সেরোটনিন এই নানান রকম হরমোন এর মিশ্রণে যে ক্যামিকেল বন্ডিং হয় মানব মস্তিষ্কে তা, মানুষকে আটকে ফেলে একটা বিষাক্ত চক্রে। নিপীড়নের চক্রে।

তাই অনেক মানুষ, অর্থনৈতিক দিক থেকে সামাজিক দিক থেকে, শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে নানান রকম সুবিধাজনক জায়গায় থাকার পরও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কারণ মস্তিষ্ক তখন দখল করে ফেলে, এই হরমোন এর ককটেল।
এই বিষয়গুলো সেন্সেটিভ। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে সেন্সেটিভিটি নিয়ে শূন্য আশা রেখেই আমি লিখছি।
ম্যানিপুলেশন (Manipulation) – It is the use of devious means to exploit, control or otherwise influence others to one’s advantage. খুব সহজ করে বললে, কোনকিছুকে বা কাওকে নিজের সুবিধার জন্য, অসৎভাবে বা অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

লাভ বোম্বিং (Love bombing) এই সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশনের একটা মাধ্যম।
যারা সাইকোলজি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন, তারা আশা করি জেনে থাকবেন প্রফেসর মার্গারেট সিঙ্গার এর নাম। যিনি কাল্ট (Cult) সাইকোলজি নিয়ে কাজ করেছেন। তার বই এ বিস্তারিত লেখা আছে লাভ বোম্বিং সম্পর্কে যে কিভাবে একটা গ্রুপ, বা গ্রুপের দলনেতা লোকজনকে দলে টানে, তাদের ব্রেইন ওয়াশ করে । সেখানে লাভ বোম্বিং একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভালবাসার বোমা মেরে মেরে একটা মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়া, এবং ইচ্ছে মতো তাকে ব্যবহার করা।
এখন কী এই লাভ বোম্বিং? সহজ কথায়, ভালোবাসা, আদর আহ্লাদ দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া। Love bombing is an attempt to influence a person by demonstrations of attention and affection. নিপীড়নের যে চক্র আছে, সেখানে এই লাভ বোম্বিং একটা বড় পার্ট।
যখন কোন ইন্টিমেট সম্পর্ক শুরু হয়, তখন অবশ্যই সেখানে, প্রেমময় কিছু বিষয় আদান প্রদান হয়। রোম্যান্টিক কথা, আচরণ ,ভালো লাগার প্রকাশ ইত্যাদি। সবকিছুই তখন খুব ভালো লাগে।

লাভ বোম্বিং এর বিষয়টা হচ্ছে, সম্পর্কের স্বল্প সময়েই ভালোবাসার বোমা ফাটানো।
যেমন নানান ধরনের প্রশংসা করা- মানে প্রশংসার কোন শেষ নেই। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত নানান রকম প্রশংসা। “আমি পাগল, তোমার জন্য”, “তুমি এত্ত সুন্দর কেন?” “আমি এরকম পারফেক্ট একটা মানুষ আর দেখি নাই”, “এই জীবনে তোমাকে পেয়েছি, আমার আর কিচ্ছু পাওয়ার নাই”, “আমার শুধুই তোমার সাথে টাইম স্পেন্ড করতে ইচ্ছা করে।“ “তোমাকে না পেলে আমি মরে যাবো”, “এই জীবনটা তুমি আসার পরই সুন্দর হয়েছে” ইত্যাদি। এরকম রোম্যান্টিক কথা বলাতে কোন সমস্যা নেই। নির্দোষ কথা। কিন্তু ধরুণ খুব কম সময়ের পরিচয়ে, বা অতিরিক্তভাবে এইরকম কথা গুলো যদি কেউ বলে, তা আসলে রেড সিগন্যাল।

উপহার দেয়া- উপহার মানেই কিন্তু ওই গিফট প্যাকে মোড়ানো কোন বস্তু না। সেটা যে কোন কিছুই হতে পারে। ওই ব্যক্তির পছন্দ অনুযায়ী। যিনি কবিতা লিখেন, তিনি হয়তো এই যে তোমার জন্য কবিতা লিখেছি, যিনি ছবি আঁকতে পারেন তিনি ছবি এঁকে দিয়ে বললেন, এই যে তোমার ছবি এঁকেছি, যার পকেট ভারী তিনি শাড়ি গয়না কিনলেন, বই দিলেন, চিঠি দিলেন, রান্না করে নিয়ে গেলেন, ইত্যাদি। মোট কথা হচ্ছে, মন পাওয়ার জন্য পছন্দ অনুযায়ী কিছু দেয়া। এবং সেটা উপলক্ষ্য থাকুক বা না থাকুক।
নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ- ফোন কল, টেক্সট, ইমেইল সব কিছুতেই একদম চিপকে লেগে থাকা। সকালে, দুপুরে,বিকালে, সন্ধ্যায়, রাতে, কল, ঘন্টায় ঘন্টায় টেক্সট। মানে, দিনের পুরোটা সময় নিজের উপস্থিতি জানান দেয়া। সকালে গুড মর্নিং, বাবু খাইছো, খেয়ে নিও, দুপুরে খাইছো, তুমি না খেলে আমি খাবো না, কি করো? এখন কি করো, মিস ইউ, ছবি পাঠাও, তারপর সেটা পাওয়ার পর নিজের ছবি দেয়া। মানে ঘুম থেকে ওঠার পর ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, এতো এতো ম্যাসেজিং ফোন কল, কমিউনিকেশন এগুলো হেলদি কোন সম্পর্কের ধরন না। লাভ বোম্বার যিনি তিনি এগুলো করে, খুব তাড়াতাড়ি এটাচমেন্ট তৈরি করে ফেলতে পারেন। এতে ম্যানুপুলেট করতে বেশি সুবিধা হয়। এবং এই লাভ বোম্বিং এর ফলে, একটা নির্ভরতা, অভ্যস্ততা তৈরি হওয়া শুরু করে, অনেক তাড়াতাড়ি।

এর পেছনের কারণ হচ্ছে লাভ বোম্বার রা সব সময় এটেনশন চায়। কোন কারণে তার দিক থেকে যেন এটেনশন না সরে এটাই সর্বোচ্চ চেষ্টা।
সোলমেট কনসেপ্ট: আমরা সোলমেট, আমরা জন্ম নিয়েছি একজন আরেকজনের জন্য, এটা আমার ভাগ্যে ছিলো, তুমি আমাকে সবচেয়ে বোঝো, তোমার মতো করে আমাকে আর কেউ বোঝে না। এরকম বলতে থাকবে।

এই রকম লাভ বোম্বিং এ পড়ে, ব্যক্তির কথা শুনে এমন লাগবে যে, উনি এই রিলেশন করে তার জান বাঁচিয়ে দিয়েছে। মানে, প্রিন্স চার্মিং পেয়ে ফেলেছি বা আকাশের পরী নেমে এসেছে উদ্ধার করতে এরকম ফিলিংস হবে। এটা অনেকেরই বাসনা আসলে, কিন্তু বাস্তবতা তো আর ঠাকুরমার ঝুলি না, ডিজনিল্যান্ডও না।
একটা রিলেশনশিপে যখন মনে হবে, সবকিছুই কেমন যেন হুট করে হয়ে গেলো , এবং ফিল হতে থাকবে যে, কী জানি একটা ঝামেলা আছে, এত্ত আবেগ ক্যারে? সেই রেড সিগন্যাল ইগনোর করা ঠিক হবে না।

যিনি লাভ বোম্বিং করে সাইকোলজিক্যাল ম্যানুপুলেশন করতে চায় তিনি ঠিক ওই কথাটাই আপনাকে বলবে, যা আপনি শুনতে চান। আপনার সাথে পুরাই একটা আয়নাবাজি গেইম খেলবে, যেটা দেখে মনে হবে আরে ওয়াও এই তো আমার সোলমেট। কেমন যেন ড্রামাটিক, ক্যারিশম্যাটিক কিছু একটা করতে থাকবে। চমকে দেয়ার জন্য, মুগ্ধ করার জন্য, হুক করার জন্য, ইম্প্রেস করার জন্য, যেটাই বলুন না কেন।

প্রশংসা শুধু রূপের করবে না, যে বিষয়টা নিয়ে আপনি প্যাশনেট, বা যেই বিষয় আপনার ফেভারিট সেটা নিয়ে প্রশংসা করবে, এবং সেটা নিয়ে খুব কেয়ার দেখাবে। এতোকিছু করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সম্পর্কটা নেক্সট লেভেলে নিয়ে যাওয়া, এবং আপনাকে সাইকোলজিক্যালি ইচ্ছেমতো ম্যানুপুলেট করা।
ভালোবাসা আদর, সবাই চায়, আদর মাখা কথা সবাই-ই শুনতে চায়। কিন্তু এরকম টাইপের লাভ বোম্বিং করা রেড সিগন্যাল।
এরকম কিছু মনে হলে, একটু থামা উচিৎ, বোঝা উচিৎ, অপরজন কি করছে, কী করতে চাইছে তা যাচাই করা উচিৎ।
কারণ লাভ বোম্বিং হচ্ছে একটা বিপদ সংকেত, যেটা দেখতে রোম্যান্স মনে হয়।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.