বন্ধুরা কখন ‘অ-বন্ধু’ হয়ে যায়!

পম্পা ঘোষ:

দিনকাল যা পড়েছে , বন্ধু বিয়োগ আসন্ন । না না, বালাই ষাট। তাদের পরমায়ু নিয়ে তারা থাকুন , কুকথা কইছি না । দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে আমি যখন দেশের নাগরিক হিসেবে আমার নিরাপত্তা আর অধিকার চাইলাম তাতে আমার অনেক বন্ধুরা ক্ষুন্ন হলেন। কারণ সংখ্যালঘু বিনাশকারীর সাথে যেহেতু তাদের ধর্ম কমন পড়ল তারা অনেকেই নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে মানুষের পরিচয়টা মনে রেখে নিজদেরকে এই নৃশংস দু’পেয়েদের বাইরে ভাবতে পারলেন না। অনেকের রূপকথার কল্পনায় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হল বলে আমার উপর গোস্বা করলেন।

তারপর ধরুন প্রতিদিনের ঝামেলাপূর্ণ জীবন সামলে ত্যক্ত বন্ধুরা হঠাৎ মালাউনরা চেঁচামেচি করে শান্তি নষ্ট করছে বলে বিরক্ত হলেন। “একটু আধটু ওরকম হয়ই” এইসব কুকথা বলে দেশের বদনাম করছি বলে সেটা বন্ধুত্বের অবমাননা করলো হয়তো। সবচেয়ে সচেতন বন্ধুও বোধকরি এতো বিরক্ত হয়েছে যে ভিন্ন প্রসঙ্গে সেদিন তারই কথার সংযুক্তিতে আমি ক’টা কথা বললাম, সেটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে আমার কথার প্রতিধ্বনি করা কথাটায় একটা লাইক ঠুকলো। কিছুই না। চোখে লাগল একটু। সচেতনভাবে এড়িয়ে যাবার কারণ বোঝা যায়।

এই বন্ধু আর ও ১০-১৫ বছর আগে থেকে কৃষক বোঝে, শোষণ বোঝে। দেশ-বিদেশ আরো অনেক কিছু বোঝে। সেদিনও সে সাম্প্রদায়িক নিষ্পেষণ, শোষণ , নির্যাতন দেখতে পায়নি, আজও পেল না নিশ্চয়ই। তবে পৃথিবীর যে কোন কোনে মুসলিম কেউ নিষ্পেষিত হলে দেখতে পায়। যাই হোক, পূজার সময় এবং পরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথা বলে যাদের অসন্তোষের কারণ হয়েছি, তারা আমার ভূতপূর্ব জীবনে যাই হয়ে থাকুন , সসম্মানে ছেড়ে যেতে পারেন। আমি মেকি সম্পর্কে বিশ্বাস করি না। বন্ধু সংখ্যাতে, ফলোয়ার সংখ্যাতেও কোন লোভ নেই। ১১ বছরের আইডিতে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে কাজ করার পরও আমার বন্ধু সংখ্যা ৭৫০ , আরো কমলেও কোন ক্ষতি নেই। এইবার স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার কারনে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ব্ল্যাকআউট সত্ত্বেও বিভৎসতার নমুনা কিছুটা হলেও দেখেছে লোকে – এই রকম একটা ভাবালু ধারণা হয়েছিল। মানুষের সমস্ত অস্বীকার করার প্রবল চেষ্টা দেখে উল্টো খারাপই লাগতে শুরু করলো। এই বিকল্প বাস্তবতার শান্তির বাংলাদেশের রূপকল্প থেকে তাদের টেনে বের করে তার সাধ্য কার , বিশেষ করে যখন ধর্মের মিলটা ধরে নিজের গায়ে দোষ লাগছে ভেবে ঢাল থলোয়ার নিয়ে ভাবমূর্তি রক্ষায় দৃঢ়সংকল্প একেকজন। এখন তারা খানিক শান্তি পেতে পারেন তাদের শান্তি কাগজে কলমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে , আমাদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অফিস তার দাপ্তরিক কাজগে সইসাবুদ করে দিয়েছে । সুতরাং আর কোন চাপ নেই।

যাই হোক এবার নিজের কথায় আসি,  আমার বিপন্ন অস্তিত্ত্বে যে আমার পাশে নেই , সে এমনিতেই আমার বন্ধু না। অনেকেই আমার সিনিয়র, জুনিয়র , সহপাঠী …. সত্যিকার অর্থে বন্ধু ভেবেছি বলেই তারা আমার তালিকায় ছিল । কিন্তু এটাতো সামান্য মতপার্থক্য নয় !! আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন অস্বীকার করে কেউ আমার বন্ধু নয় । কাউকে মারতে চাইনি , উৎখাত করতে নয় , কারো প্রতি সহিংসতা করিনি অথবা প্রশ্রয় দিইনি বা নীরব সম্মতিও নয় । স্রেফ সমান অধিকার চেয়েছি , আমার একটি পরিচয়ের প্রতি টার্গেট করে কয়েক দশক ধরে চলমান প্রতিটি অপরাধের কথা উচ্চারণ করেছি মাত্র ! বিচার , প্রতিকার চাইবার সুযোগও ঘটেনি । তাতেই এত লোক অসন্তুষ্ট হয়েছেন, cold shoulder দিচ্ছেন আর denial তো আছেই ।

আমার সাথে এই অপরাধগুলো হয় এটাই অনেক , হয়না বলে উড়িয়ে দিয়ে সেটাকে দুঃসহ করার লোক অন্তত “বন্ধুবেশে” দরকার নেই । একসময় হরদম দেখা হওয়া মানুষ , এক ক্লাসরুমে বসা মানুষ … যতক্ষণ সোনামুখ করে থাকি , হালকা হাওয়ায় চলে দ্বিতীয় সারির মানুষ হিসেবে হাসিঠাট্টা করি, কিছু অধিকার উচ্চারণ করি না ততক্ষণ ঠিক থাকে, করলেই সবার মুখ ভার। তো আমার একটু সমস্যা আছে। সেকেন্ডারী পজিশন স্বীকার করে আমি বন্ধুত্ব করি না।

যাদের কথা বলছি ,মানুষ হিসেবে তারা খারাপ তা নয় – শুধু সংখ্যালঘু ইস্যুতে তারা নিজেদের পরিচয় নিজেরাই ভুলে যায় অথবা আমি ভিন্ন ধর্মের হলেও মানুষ এবং আমার তাদের সমান অধিকার আছে বা আমার সাথে বৈষম্য, অত্যাচার হয় সেটা স্বীকার করতে তারা ভীষনভাবে ব্যর্থ। এইবার এতগুলো ঘটনা চোখের সামনে চলে আসাতে তারা অনেকেই বিব্রত হয়ে পড়েছেন আর সেগুলো বলছি বলে গোস্বা করেছেন আর কী !!!
ফলে এই সকল মহান মানুষজন আমার বন্ধু না থাকলে মঙ্গল। আবার বলছি ব্যক্তিজীবনে যারা আমায় বন্ধু ভাবেন না তারা ফেসবুকে বন্ধু না থাকলেই স্বস্তি বোধ করি। মাথা না থাকা যাদের কাছে মাথা ব্যাথার সমাধান তাদের বন্ধু পরিচয় দিতে আমি লজ্জা বোধ করি । এই বিয়োজনের অঙ্কে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক ছিল আমার। কারো কাছে আমার ব্যক্তিগত ঋণ আছে । আমি ঋণ স্বীকার করে চলা মানুষ, সারাজীবন মানুষ হিসেবে মানুষের উপকার মনে রাখি, প্রতিদান দিতে না পারলেও। ভেবে চলি তার দরকারেও থাকবো নিশ্চয়ই , বা আর কারো দরকারে।

এমন দুর্দিন পার হচ্ছি আর চিনতে পারি না কাউকে , অথচ এদেরকেই ভেবে এসেছি বন্ধু-স্বজন। এখন ভাবছি, এমন দিন আসতেই পারে যেদিন সত্যি আর তাদের সাথে নিয়ে চলতে পারব না। অস্বীকৃতির অপমান সয়ে চলার বদলে স্বেচ্ছা মুক্তি ভালো। ফলে সেই ঋণ স্বীকারের সুযোগও মিলবে না আর হয়তো। তাই ঠিক করেছি এই ক্ষুদ্র প্রাণে যত অসীম আত্মার অনুদান আছে তাদের প্রতি ঋণ স্বীকারপত্র লিখব। যতটুকু মনে পড়ে। তারা সেসব মনে রেখেছেন কী না জানিনা , আমি মনে রেখেছি সেটাই বলার। এমন নয় যাদের নামে লিখবো তারা সবাই insensible মানুষ, কিংবা পরিপূর্ণ মানুষ না হয়ে নিতান্তই ধর্মীয় পরিচয়ের নিজেকে এমনভাবে আবদ্ধ করে ফেলেছেন যে অন্যকেও তার বাইরে দেখতে ব্যর্থ হচ্ছেন ! তাই খতিয়ান দিয়ে দায় সারছি তাও নয় ! যাদের বিদায় বলতেই হবে , তাদেরও জানিয়ে রাখি একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের প্রতি যে ভালবাসা/ দায়িত্ব দেখিয়েছেন সেটুকু সারাজীবন সসম্মানে মনে রাখবো । শুধু যখন আমায় আর মানুষ ভাবতে পারছেন না অথবা আমার মতো অন্য অনেক অনেক মানুষের জন্মভূমির অধিকার অস্বীকার করলেন ঠিক সেখান থেকে আমাদের পথ আলাদা হলো। যাদের নিয়ে লিখবো ভাবছি তাদের কেউ কেউ সত্যি অসাধারণ মানুষ, এই অছিলায় লিখি না সবাইকে !? জেনে বা না জেনে তারা আমায় কত সুন্দর করে ছুঁয়ে গেছেন এইটুকু জানাতে ক্ষতি কী!

ডক্টরাল স্টুডেন্ট , ফ্লোরিডা স্টেইট ইউনিভার্সিটি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.