মানুষের বেদনার ইতিহাস ও প্রতিশোধের গল্প

কল্যাণী রমা:

ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে যাবো। সুপ্রিয় শিক্ষক গফ্‌ফার স্যার তাঁর প্রিয় ছাত্রীকে একপাশে ডেকে নিয়ে খুব নিচু স্বরে জানালেন, ‘যদি বোর্ডে ফার্স্ট হতে চাও, যে সেকেন্ড হবে তার থেকে যেন কমপক্ষে ত্রিশ নম্বর বেশি পেও। তা না হলে এক, দুই নাম্বারের ডিফারেন্স থাকলে যখন একদম শেষে পরিক্ষার্থীর সিরিয়াল নাম্বারের সাথে তোমার নাম মেলানো হবে, শুধুমাত্র হিন্দু নাম দেখেই তুমি সেকেন্ড হয়ে যাবে।’

মাঝে, মাঝেই দেখি গ্রাম থেকে আত্মীয় স্বজনের ১৫/১৬/১৮ বছরের মেয়ে এসে শহরের আত্মীয় বাসায় থাকছে। ব্যাপার কী? না, উঠতি বয়সের হিন্দু মেয়েদের আর গ্রামে রাখা যাচ্ছে না। তুলে নিয়ে যেতে পারে। তারচেয়ে একটু নিরাপদে শহরে কিছুদিন থাকুক। বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত রাখতে পারলে আরো ভালো।
হিন্দু কারো ঢাকায় একটা চারতলা বাড়ি করবার মতো পয়সাপাতি হলো। চল্লিশ বার ভাবনা। বাড়ি করাটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? তার চেয়ে যে দেশে জন্ম সেই দেশেই শিকড়হীন হয়ে ভাড়া বাড়িতেই পুরোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া ভালো নয় কি? ‘তুমি জামাই আদরে নিজের দেশে থাকতে পারো, ছেলের অধিকারে থেকো না।’
হিন্দু হয়ে পুলিশ, উকিল, ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদি হওয়ার স্বপ্ন দেখা যেতে পারে। কপালে থাকলে হবে। কিন্তু নিজ দেশে, দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নটা দেখলে কেমন হয়? ঘুমের মধ্যেও মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে নাকি? তোমার এ ঘুম যেন আর না ভাঙ্গে।

ক্লাশ ফোরে পড়ি। দুপুরবেলা। হঠাৎ শুনি সদর দরজার কাছে খ্যাঁক, খ্যাঁক, খিক, খিক হাসি। সাধারণতঃ এই ধরনের হাসি মানুষ হাসে যখন তারা অন্য মানুষের বুকের উপর দিয়ে চারটা চাকা চালিয়ে দেয়। হাসে লিঞ্চিং-এর সময় কালো মানুষকে আমেরিকার দক্ষিণে গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে শাদারা। গ্যাস চেম্বারে মানুষ ঢুকিয়ে দিয়ে হাসে নাজিরাও।
দিদা, দাদু, মা, মাসি, মামা সবাই দরজার কাছে। যেন তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা গড়ে ফেলবে। সবাই আমাকে আর আমার ছোট বোনকে সবসময়ের মত এবারও জগতের সব নিচতা থেকে আড়াল করে রাখবেই রাখবে। কিন্তু হায়! আমি তো জ্ঞান পিপাসু মাদাম কুরী। উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখি ড্রেন থেকে তুলে আনা একটা কাদা মাটি মাখা কচ্ছপ নিয়ে ওরা দাঁড়িয়ে আছে। আর মুচকি মুচকি কী বিকট যে হাসি। খবর পেয়েছে হিন্দুরা কচ্ছপ খায়।

বিয়ের পর আমরা দুটো কাছিম পুষতাম। নাম ছিল টুড্‌ল আর টিডা। সকাল, বিকাল মাছের খাবার দিতাম। তাছাড়া অন্যান্য সময়ে সবুজ, লকলকে কলমিশাক। কী ভালোই যে বাসতাম ওদের। অসাধারণ দেখতে। আর এ কাজ ক’রে আমি আর আমার পতিদেবতা এতটাই বিখ্যাত হ’য়েছিলাম যে প্রায় বিশ বছর পর আমাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে এখনও অনেকে বলে থাকে,‘ও যাদের বাড়িতে কচ্ছপ ছিল?’ চিরদিন পশু পাখি কোলে ক’রে ঘুরে বেড়ানো আমি কোন প্রাণীকে কষ্ট দেব না ব’লে বহু বছরের চেষ্টায় তো আজ ‘ভীগান’ হ’য়ে গেছি। কচ্ছপ কেন আমি তো আজ রিফাইন্ড সুগার খাই না, মাছ খাই না, মাংস খাই না, ডিম খাই না, দুধ খাই না, মাখন খাই না, ঘি খাই না, কেক-বিস্কুট-কালোজাম-পান্তুয়া খাই না, মৌমাছির কষ্ট হ’বে বলে মধু খাই না। শুধু অল্প কিছু ফল, পাতা, ফুল খেয়ে হিমালয়ের সন্ন্যাসী হ’য়ে কোনমতে বেঁচে আছি!

যাহোক অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক, ফ্যাদরা প্যাচাল ছেড়ে ক্লাশ ফোরের বর্তমানে ফিরি। তাকিয়ে দেখি বাড়ির সকলের মুখ অপমানে টক্‌টকে লাল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
আমরা কি এতোটাই ‘মালাউনের বাচ্চা’ যে নর্দমা থেকে তুলে আনা কচ্ছপ খেয়ে ফেলবো?
আমি আঠারো বছর বয়সে স্কলারশিপ পেয়ে ইন্ডিয়া গেছি পড়াশোনা করতে। হিন্দু বলে স্কলারশিপের কথা সু্যোগ পেলেই বলে ফেলি। পাছে কেউ না ভাবে মুসলিম বিয়ে করে বাড়ি থেকে পালাতে পারি বলে মেয়েকে প্যাকেট করে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

কলকাতায় একদিন দুপুরবেলা। আলোচনা হচ্ছে রবিঠাকুরের ‘গোরা’-র মঞ্চায়ন দেখতে যাওয়া নিয়ে। জাতপাত নিয়ে নানা কথা। কী অসম্ভব ভালো নাকি হয়েছে। তবে এও তো ঠিক কাগজে কলম ঘষলেই যেমন লেখক হওয়া যায় না, ‘গোরা’ পড়লেই প্রাণের ভিতরের শ্যাওলা পড়া দেয়ালে আটকে পড়া কুয়ার জল মহাসমুদ্র হ’য়ে ওঠে না।

হঠাত্‌ তড়িঘড়ি, ঝপাঝপ, ঠাসঠাস ঘরের ডানদিকের জানালাগুলো বন্ধ হওয়ার শব্দ। আত্মীয় করছে।
‘কী হলো?’
‘না, ওই মুছলমানের বাচ্চাদের মুখ দেখতে চাই না।’
আমি তো ভ্যাঁবাচ্যাকা। ‘কোন বাচ্চা?’
‘ওই দেখ্‌ না। মিস্ত্রীগুলো ঘর রং করছে। সব রাজাবাজার থেকে উঠে এসেছে। মুছলমানের বাচ্চা মিস্ত্রী ছাড়া আর কী হবে?’
‘সে কী? এমন ভয়ানক কথা কেন বলছো? বাংলাদেশে আমার সব বন্ধুই তো মুসলিম!

বাংলাদেশে শুধু হিন্দুরা বাঙ্গালী নয়, সবাই বাঙ্গালী, আদিবাসীরা ছাড়া। আর পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আমরা তো সবসময়ই ইউনিভার্সিটির বড় পুকুরটার পাশে, বাঁধানো সিঁড়িতে বসে গান গেয়েছি ‘ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে, হল কানায় কানায় কানাকানি এই পারে ওই পারে…।’ হাঁটুর বয়সী ভীষণ মিষ্টি ছোট মেয়েদের গরমকাল ব’লে ন্যাড়া মাথা। কিন্তু সে মাথাতেই তারা বেলীফুলের মালা হেয়ারব্যান্ডের মত ক’রে পরে সেজেছে। শাদা শাড়ী, লাল পাড় পরনে। কপালে বড় ক’রে একটা লাল টিপ। কখনো সিঁদুরেরও। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে সবাই মিলে একসাথে কতবার যে গেয়েছি, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ…।’ আমার বহু মুসলিম বন্ধু ‘গীতবিতান’ মাথার বালিশ ক’রে ঘুমায়।

আত্মীয়ের এক চোখ ঘৃণায় খুব তীক্ষ্ণ, সরু এবং ধারালো ছুরির মত হয়ে উঠলো। অন্য চোখ স্মৃতির জলে ভরে গেল। এখনও স্বপ্নের ভিতর বিন্নী ধানের খই ফোটে। গলায় শাপলার ডগা এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি ক’রে কেটে কেটে মালা, মস্ত শাদা শাপলা ফুলটা তার লকেট। ঠাকুরদাদার কাছে গল্প শুনে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী প্রজন্মের মোটামুটি সবাই বিশ্বাস করে ওদের পূর্ববঙ্গে জমিদারি ছিল। ফেলে আসা ভালোবাসা তো আসলে শুধু জমিদারি নয়। তার বিস্তার কয়েক সাম্রাজ্য।
‘জানিস্‌ কি কী ফেলে এসেছি? শুধুমাত্র বাস্তুদেবতা নীলকণ্ঠকে মাথায় করে এক কাপড়ে পালিয়ে এসেছি। জমিজমা, ভিটামাটি সব ফেলে। সেই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিনে শুরু হলো। সাত দিনে পাঁচ হাজার হিন্দু-কে মেরে ফেলল ওরা।’

রায়টের গন্ধে বাতাসে হাইস্যা, বটি দিয়ে কেটে ফেলা মানুষের শরীরের কালচে হ’য়ে যাওয়া রক্তের গন্ধ শুঁকি। আগুনে দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঘর। দেখতে পাই ছেলেবেলায় আত্মীয়ের প্রিয়তম বন্ধু সোলায়মানের সাথে ডাঙ্গা গুলি খেলতে গিয়ে কীভাবে গুলিটা গড়িয়ে গড়িয়ে আত্মীয়দের দীঘিটায় পড়ে গেল। সোলায়মান ছুটে গিয়ে কোনভাবে গুলিটা আত্মীয়ের হাতের মুঠোয় তুলে দিতে নিল। ততক্ষণে দিঘীটা সোলায়মানের আব্বার হ’য়ে গেছে।
আজো কিছুই ভুলতে পারছো না?
হাতদু’টো ধরলেই পিঁয়াজের গন্ধ লেগে যাবে?
গলা জড়িয়ে ধরলে পৈতাটা ছুঁয়ে দেবে?
দাঁড়িপাল্লায় লবণ আর জল মেপে বাকি জীবনটা কেটে যাবে। মানুষের বেদনার ইতিহাস প্রতিশোধের গল্প।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.