অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষা হোক পরিবার থেকে

শারমিন রহমান শ্রাবনী:

ছোটবেলা থেকে সবাই প্রথম যা শেখে তা হচ্ছে পরিবার থেকেই, শিশুর হাতেখড়িই হয় বাবা-মায়ের কাছে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত কী পড়তে হবে, কী করতে হবে, আপাদমস্তক সব। তবে আরও বড় পরিসরে শিশু যখন বাইরে অর্থাৎ বাসার গণ্ডি পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখনই শুরু হয় আসল ট্রেনিং। কীভাবে সবার সাথে মিশতে হবে, কথা বলতে হবে, সেইসব পাকাপোক্তভাবে বাসার অভিভাবকরা শিখিয়ে দেন। তাই অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষা যদি প্রত্যেকটি শিশু তার পরিবার থেকে ছোটবেলা শিখে তাহলে সে কখনোই ধর্মীয় পরিচয়ে অন্যকে বিচার করবে না। ঘৃণা জন্মাবে না তারই সাথে বেড়ে ওঠা অন্য ধর্মের শিশুর প্রতি। বরং নিজ ধর্মের প্রতিই ভালোবাসবে অন্য ধর্মকে।

আমি মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছি। অন্য সবার মতো নিজ ধর্মকে সেরা মনে হয়। সেটা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। তবে সেই শ্রেষ্ঠত্ব অন্য ধর্মের সাথে তুলনা করা অথবা অন্য ধর্মের লোকের কাছে বড়াই করা অন্যায়। আমার ধর্ম যেমন আমার কাছে শ্রেষ্ঠ, তেমনি একজন হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, তার কাছেও তার ধর্মটিই শ্রেষ্ঠ। এটাই প্রত্যেকটি মানুষের বিশ্বাসের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।

ছোটবেলা থেকে আব্বা অন্যসব বিষয়বস্তুর মত ধর্ম নিয়েও কথা বলতেন, বই পড়তে দিতেন। কখনোই তাকে অন্য ধর্মকে খাটো করে কোনো কথা বলতে দেখিনি। বরং অনেক রক্ষণশীল আত্মীয়দের প্রতি তার জবাবই বুঝতে পারতাম, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে হয় না। আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে তিন বোনের ডাক নাম শ্রাবনী, লাবনী ও স্মরনী। অনেকেই নাম শুনে আব্বাকে বলতেন, মেয়েদের তো হিন্দু নাম রেখেছেন! আব্বা স্পষ্ট ভাষায় জবাব দিতেন, হিন্দু নয়, বাংলায় নাম রেখেছি।

আম্মাকে সবসময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে দেখেছি। রমজান মাস রোজাও রাখতেন নিয়ম মেনে। বলে রাখি, আম্মাকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি বোরকা পরতে। কিন্তু কখনো তার মনে কোনো উগ্রবাদ দেখেনি। তিনি আরো গর্ব করে বলেন, তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী সেবিকা রানী দাসের কথা। ছোটবেলায় তাদের একসাথে খেলা, খাওয়া, বেড়ে ওঠা সবকিছু। এসব গল্প যখন বলেন, দেখি তার চোখ চকচক করে। ছোট্টবেলার সেই বান্ধবীর সাথে এখনও আম্মার যোগাযোগ আছে, যাতায়াতও হয়। বলে রাখি, আব্বা ও আম্মা দুজনেই ওমরাহ হজ করেছেন। কই কখনোও তো শুনিনি তার বান্ধবী হিন্দু; তাদের বাসায় যাওয়া বা খাওয়া যাবে না!

আম্মা তো ১৯৭১ সালের গল্পও করেন। তখন তিনি খুব ছোট, স্মৃতিতে যা মনে আছে তাই আনন্দ দিয়ে বলতে থাকেন। তখন তিনি খুব ছোট, বলেন শুধু কুচি দেওয়া প্যান্ট পরি, জামা গায়ে তখনও ওঠেনি। আম্মাদের বাড়ি নরসিংদী জেলায়, তখন তো নারায়ণগঞ্জ নামে কোন জেলা ছিল না, পুরোটুকুই নরসিংদী জেলা। সেখানের গোপালদী এলাকার একটি গ্রামে আম্মারা বড় হয়েছেন। সেখানে প্রায় সবই হিন্দু বাড়ি। মাঝে মাঝে দুই একটা মুসলিম পরিবার বাস করে। আমাদের নানাবাড়িটা ছিলো কিছুটা সেরকমই। চারপাশে হিন্দু পরিবারের বাস। বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর সময়ে প্রায়ই হিন্দু বাড়িগুলোতে হামলা আর লুটপাট হতো। ভয়ে দিনের বেলায় এলাকা ছাড়া থাকতেন অনেক হিন্দু পরিবারের লোকজন, আর রাতে নানাদের বাড়িতে লুকিয়ে থাকতেন। মুসলিম বাড়ি হওয়ায় সেখানে আক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কম ছিল। বিকেল থেকেই আশপাশের বাড়ির মায়েরা, ঝিয়েরা এখানে এসে রাতটা কাটাতেন। অনেকের টাকাপয়সা আর স্বর্ণ রাখতেন আমার বড় মামার কাছে। কী যে বিশ্বাস, আম্মা বড় বড় চোখ করে বলতেন। আম্মার সেই কথা শুনে মনে হয় এখন আর সেইসব স্বপ্নেও সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ লাগে….তখন তো সবাই সবাইকে ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়, পাড়ার আপনজন মনে করতেন। সবাই মানুষ হিসেবেই সবার পাশে দাঁড়িয়েছে।

তাহলে সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে আমরা কী পেছনের দিকে হাঁটছি? আমার সন্তানদের আমার সময়ের কোন এমন সম্প্রীতি আর অসাম্প্রদায়িকতার গল্প কী কখনও বলা হবে, তাও জানি না। আমরা তিনবোন ছোটবেলা থেকে দুর্গাপূজা দেখতে যাই, যতই বড় হয়েছি এ বিষয়ে আগ্রহ বেড়েছে। ছোটবেলা জামা পরে গেলেও বড় হওয়ার পর লাল আর সাদা শাড়ি কেনার সুপ্ত বাসনারও জন্ম হয়। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে, অনেক সময় টিউশনির টাকা দিয়ে লাল আর সাদাও কিনেছি। মোহাম্মদপুর থাকার কারণে রায়ের বাজারের সব পুরানো মন্দিরে আমাদের পা পড়তোই, একবার তো সাহস করে এক বান্ধবীকে সাথে নিয়ে কলাবাগানেও গিয়েছিলাম। কই কখনোই আমাদের আব্বা ও আম্মাকে বলতে শুনিনি, ওই উৎসবে যেও না, ওটা হিন্দুদের উৎসব। এভাবেই আমরা বড় হয়েছি, আর তাই বলি অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষা হোক পরিবার থেকেই।

বিয়ের পরও স্বামীকে সাথে নিয়ে পূজা দেখতে গিয়েছি। মেয়েদের নিয়েও দেখতে যাই। একটা ঘটনা না বললেই নয়, আমার বড় মেয়ে যখন হয় তখন রমজান মাস ছিলো। রোজা রেখে রক্ত দেয়া যায় না, তাই আমার জন্য ব্লাড ডোনার হিসেবে আমার স্বামী ঠিক করেছিলেন তার অফিসের এক খ্রিস্টান সহকর্মীকে। যদিও শেষ পর্যন্ত তার রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হয়নি, তবুও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। সেই মেয়ে এখন একটু একুট করে বড় হচ্ছে। স্কুলে তার বান্ধবীর কেউ খ্রিস্টান, হিন্দু আর চাকমা। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু খ্রিস্টান, তাদের বড়দিনে যাওয়ার সে কী আগ্রহ আমার মেয়ের! সবাইকে সেই ক্লাসের বন্ধু হিসেবেই চিনে। আমরাও চাই সেভাবেই সে বেড়ে ওঠুক, ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে কখনও যেন তাদের বিচার না করে। আর এলাকায় তার প্রিয় বান্ধবী হিন্দু। সেই বান্ধবী আর তার খেলাধুলা করতে এ বাসা আর ও বাসায় আসা-যাওয়া তো প্রায়ই হয়। দুজন নিজেদের জন্মদিনে দাওয়াত খায়। যেদিন কুমিল্লায় ঘটনা ঘটলো সেদিন পাশের বিল্ডিংয়ে ওই পরিবার মানে আমার মেয়ের বান্ধবীর মা আমাদের দশমীর দাওয়াত দিলেন। শুক্রবার সকাল থেকে ডাক, কখন আসবেন, ছোট মেয়ের শরীরটা একটু খারাপ থাকায় পুরো পরিবার যেতে পারিনি, তবে বড় মেয়েকে পাঠিয়েছি। মেয়ের বাবা জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় মেয়েকে দশমীর দাওয়াতে দিয়ে আসলেন। মেয়ে সারাদিন থেকে যখন রাতে আসলো, সেই বাড়ি থেকে সাথে নিয়ে আসলো খাবারের বক্স। আমরাও রাতে সেই খাবার খেয়েছি। অথচ এ ধর্মের পার্থক্য করে সেদিন নোয়াখালীর চৌমুহনীতে হিন্দুদের ইস্কন মন্দিরে হামলা হলো, শুনেই লজ্জিত হলাম।

এর পরদিন শনিবার অফিসে এসেই ছুটি থেকে ফেরা হিন্দু সহকর্মীদের কাছে নাড়ু খাওয়ার আবদার। যেটা প্রতিবারই করে থাকি। নিজে তো খাই, ভাগে বেশি পড়লে বাসায় এনে মেয়েকেও দেই। সেই ছোট্টবেলা থেকে আব্বা-আম্মা এভাবেই আমাদের শিখিয়েছেন। মায়ের সাথে গ্রামের বাড়ি গেলে আশপাশের হিন্দু বাড়ি যারা এখনও ভিটেমাটি, এ দেশটাকে ছেড়ে যাননি তাদের বাড়ি যাই, তাদের হাতে তৈরি পায়েস আর নাড়ু খাই। আমিও সন্তানদের নিয়ে সহকর্মীর বাসায় দাওয়াতে যাই, যেখানে অন্য ধর্মের সহকর্মীরাও থাকে। এ কারণে বলি অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষাটা আসলে দরকার পরিবার থেকেই।

দিনশেষে আমরা তো সবাই রক্ত মাংসের মানুষ। নিজ নিজ ধর্ম পালন করুন। আমি নিজেও করি। নিজের ধর্মটা যেমন আপনি সম্মান করেন, অন্যেরটাও তেমনি ভাবে সম্মান করুন। নিজে ধর্ম সম্পর্কে যেমন জানা জরুরি, তেমনি অন্যের ধর্মটাকেও জানুন। কূপমণ্ডুক হয়ে নিজ ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দেবেন না। পৃথিবীর এ যাবত যত ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে, সবখানেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শান্তির কথা বলা হয়েছে, পরস্পরকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। কোন ধর্মের মূলনীতিতে অন্য ধর্মকে অসম্মান করার কথা বলা হয়নি। তাহলে আমরা মানুষরা কেন ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষকে আঘাত দেই? পরিবার কী আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়, পড়ালেখা করে আমরা কী এই শিক্ষাই পাই, ধর্ম অবমাননার নামে যে কাউকে হত্যা করার অনুমতি আমাদের কে দিয়েছে?

ছোট শিশুর মগজে মননে সুপ্ত বীজ যখন ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয় তখন থেকেই সন্তানকে মানবিক হওয়া শেখানো উচিত। মানবিকতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। পরিবারের শিক্ষাই দিনশেষে শিশুর ভবিষ্যত জীবন যাপনে প্রভাব ফেলে। তাই আবারো বলতে চাই, অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষা হোক পরিবার থেকেই।

লেখক: (সহযোগী বার্তা সম্পাদক, একাত্তর টেলিভিশন)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.