চলুন, ভাবা প্র্যাকটিস করি

সুমু হক:

ধর্ম তাই যা আমাকে ধারণ করে।
কিছু নৈতিকতার ধারণা, ন্যায়-অন্যায় বোধ, কিছু ভালো-মন্দের সহজাত ধারণা, সেটার জন্যে কোন হিন্দু-মুসলিম কিংবা অন্য কোন ধর্মের সাইনবোর্ড লাগে না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ধর্মের এই মূল বিষয়টাকে ভুলে গিয়ে আমরা এখন কেবল এর আচারবহুল দিকটা অর্থাৎ বাহ্যিক দিকটাকে নিয়েই পড়ে থাকি।
সেই আচারগুলোকে পার হয়ে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ধর্মের বার্তাটুকু পর্যন্ত পৌঁছতে পারি না।

যে নামাজ নিয়ে মুসলমানরা এতো লাফালাফি করেন, সেই একই ভঙ্গিতে তো অর্থোডক্স ইহুদিরাও প্রার্থনা করে থাকেন! তাহলে?
শুধু তাই নয়! কখনও সূর্য প্রণাম করে দেখেছেন? আমি করেছি। আমি ছেলেবেলায় নামাজও পড়েছি। দেখেছেন কি যে নামাজের প্রতিটি আসনের সাথে সূর্য প্রণামের অনেকগুলো আসনেরই কী অদ্ভুত মিল?
একবারও কি ভেবে দেখেছেন, যে এই বাহ্যিক আচারগুলোর ভেতর লুকিয়ে থাকা ধর্মের মূল মন্ত্রগুলো এক হলেও হতে পারে?
এই যে গত তিনদিন ধরে যারা ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলামে মূর্তি ভাঙার কথা বলা হয়নি বলে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেন, তারা জানেনকি যে স্বয়ং মুহম্মদ কাবা দখল করে তার ভেতরের ৩৬০ টি মূর্তি ভেঙে ফেলেছিলেন?

এই প্রসঙ্গে মনে পড়লো আপনারা কি জানেন হুসেনি ব্রাহ্মণদের কথা? ব্রাহ্মণ হয়েও যারা কারবালার যুদ্ধে হজরত আলীর পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন এবং শহীদ হয়েছিলেন? যাদের বংশধরেরা আজও ব্রাহ্মণ হিসেবে নিজেদের সমস্ত ধর্মীয় আচার মেনে চললেও মুহররম পালন করে থাকেন? আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না, অনলাইনে বসে অশিক্ষিত অর্বাচীন ব্যক্তিদের অশ্লীল ওয়াজ না শুনে আর পর্ন না দেখে বরং অনলাইনে এসব বিষয় নিয়ে একটু পড়াশোনা করে দেখুন, সব জানতে পারবেন। বিস্তর সব জ্ঞানীগুণী মানুষেরা এই নিয়ে গবেষণা করে লেখালেখি করে গেছেন, তথ্যচিত্রও বানিয়ে গেছেন।

আমার একজন মুসলমান শিক্ষিকা আছেন, যিনি হজ্জ্ব করে এসেছেন, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, কিন্তু তাঁর কোন গোড়ামি নেই.
তাঁর ঘরে ঢোকার মুখেও একটা শোকেসে এরকম আল্লাহু লেখা একটা শোপিসের পাশাপাশি নটরাজ শিব, বুদ্ধের মূর্তি, পঞ্চপ্রদীপ, গণেশ এবং এমন আরো অনেক জিনিসই সাজানো থাকতো যা নাকি তথাকথিত মুসলিমদের কাছে শিরক করা বলে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু আমি তো সেই কোন ছেলেবেলা থেকেই এই দেখেই বড় হয়েছি, আমার কাছে কিন্তু বিষয়টা আশ্চর্য মনে হয়নি! এবং চাকরি জীবনের শেষের দিকে তাঁকে যখন ছোট ছোট ক্লাসের ইসলামিয়াত ক্লাস নিতে বলা হলো, তিনি কিন্তু আজীবন যেমন সুন্দর সাজগোজ করে টিপ পরে ক্লাস নিতে যেতেন, তেমনভাবেই সেই ইসলামিয়াত ক্লাসগুলোও নিতে যেতেন!
বড় হয়ে আমিও আমার ঘর আমার সেই শিক্ষিকার মতো করেই সাজিয়েছি। আমিও তাঁর মতো করেই শাড়ি পরি, টিপ ছাড়া কখনও থাকি না!
কই, আমার প্র্যাকটিসিং মুসলিম ভাইয়ের তো তাতে আমার বাড়িতে আসতে, আমার হাতে খেতে কিংবা আমাকে বোন বলে স্বীকার করতে কোন অসুবিধে হয়নি! সমস্যা হয়নি আমার মায়েরও, যিনি নিজেও প্র্যাকটিসিং মুসলমান! যেমন হয়নি আমার স্কুলের সম্পর্কে রক্তের চেয়েও বেশি ছোট বোনের পার্টনারের আমার হাত থেকে রাখি নিতে! আসলে সবটাই সহজাত করে নেয়ার ব্যাপার।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি খাঁটি গুজরাটি বৈষ্ণব বলে আমার ঘরেও তুলসী আছে, ওর কথা রাখতে সেই তুলসীতে রোজ হলুদ কুমকুম লাগাই। আমার বন্ধুটিও তেমনি এই মুসলমানের মেয়েটিকে নিজের ঘরের সব পুজোআচ্চায় অংশ নিতে দিতে, নিজের সাথে এক টেবিলে খাওয়াতে দ্বিধা করে না। দ্বিধা করে না আমার বাড়িতে এসে খেতে।

আবার আমার আরেকজন ভালোবাসার মানুষ এনে দিয়েছিলেন বলে আমার ঘরে একটা কারবালার স্যুভেনিরও রাখা আছে! আমার কাছে এর সবটাই ভেতর থেকে আসা, সহজ, স্বাভাবিক, সহজাত। যিনি এই লাইফস্টাইলটাকে মেনে নিতে পারেন না, তিনি আমার কাছে না এলেই পারেন!
সৃষ্টিকর্তা যদি কেউ থেকে থাকে তো তিনি আমাদেরকে মানুষ হিসেবেই তৈরি করেছেন, চিন্তাশক্তি দিয়ে, তাই না? তাহলে সেটা নিশ্চয়ই ব্যবহার করবার জন্যে?
তা নাহলে নিশ্চয়ই গরু ছাগল করেই পাঠাতেন! তাহলে কেন শুধু শুধু নিজেদেরকে ওদের পর্যায়ে টেনে নামাচ্ছি আমরা? দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটু ভুল হয়ে গেল! ওরাও কিন্তু এতো নৃশংসভাবে একে অন্যকে খুন করে না!

তাই আসুন, আমরা এই আচার-বিচারের কূটকচালে নিজেদের ভেতরের মনুষত্বটাকে বিসর্জন না দিয়ে নিজের মস্তিষ্কটাকে একবার কাজে লাগাই। একবার শুধু এই বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে দেখি। চলুন, ভাবা প্র্যাকটিস করি!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.