সাম্প্রতিক দাঙ্গা ধর্মীয়, না রাজনৈতিক!

মেহজাবিন সিদ্দিকী:

একদিন ঘুম ভেঙে যদি শুনতে পাই বাংলাদেশ বেদখল হয়ে গেছে, কে বা কারা দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ, আমি অবাক হবো না। ঠিক যেমনটি হয়েছে সাম্প্রতিক কালে আফগানিস্তানে। যে দেশের মানুষ এতো বিভক্ত, যে দেশের একদল আরেক দলের প্রতি এতোটা অসহিষ্ণু আচরণ প্রকাশ করে, সে দেশ কতদিন স্বাধীন থাকবে, আজ তা রীতিমতো প্রশ্নবোধক রেখার মতোই তীব্র। আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, বর্তমানে স্বাধীনতার যে নকশা দেশের সর্বত্র বিরাজমান তা একটি সুস্থ দেশ -সংস্কৃতির জন্য কতোটা সহায়ক, তা পাঠকই ভালো বলতে পারবেন।

আমি বরং অবাক হচ্ছি এই দেখে যে দেশটি এখনও টিকে আছে। জ্বি ঠিকই পড়েছেন টিকে আছে, এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে টিকে আছে? একে অপরকে দোষারোপ করে, একে অন্যের অধিকার খর্ব করে, সামাজিক – অর্থনৈতিক বৈষম্য চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে, ধর্মের নামে মানুষকে বিভাজন করে, একটি ধর্ষক জাতি হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছে, এতে তার প্রমাণ মেলে। এসবই অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং অমানবিক।

আমি বেশ কিছু লাইভ আর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে যা জানতে পারলাম, তা হলো ঘটনার সুত্রপাত হয়েছে কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ে একটি পূজা মন্ডপে মূর্তির পায়ের কাছে মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কে বা কারা রেখে গেছে। একজন ব্যক্তি সেই ঘটনার লাইভ করেছে সামাজিক মাধ্যমে। সেই লাইভে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর লোকজনও উপস্থিত ছিল, যাদের কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই তখন পর্যন্ত খবরে আসেনি এবং লাইভ করা ব্যক্তির চেহারা সেই লাইভে আসেনি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে বহিরাগত কিছু লোক মই বেয়ে দেয়াল টপকে পূজা মণ্ডপে প্রবেশ করে মূর্তি ভাংচুর উত্তর নিরাপদে চলে যেতে সফল হয়েছে। দফায় দফায় আক্রমণ হলেও বারংবার প্রশাসনের সহায়তা চেয়েও পাওয়া যায় নি।

বেশ কিছু আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্যে আমি একটি অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে বলতে চাই। সাইফুর সাগরের উপস্থাপনায় “ফেস দ্য পিপল” অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অনেকের সাথে, গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক- মহাসচিব বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট। তিনি এই ঘটনাটিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন। কেবল উনিই নয়, অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল ব্যক্তিই বিষয়টিকে রাজনৈতিক দাঙ্গা বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে প্রায় সকলেই নিজের দলকে সমর্থন করে অন্য দলকে দোষারোপ করেছে। প্রবাসী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোল্লা বেশ কিছুটা নিরপেক্ষ জায়গায় এসে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন এবং ব্লেইম গেম বন্ধ করে সামগ্রিক ঘটনাটিকে নিরপেক্ষ জায়গায় এনে এই অরাজকতার অবসান ঘটানোর আহবান জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে প্রায় সকলেই একমত হয়েছে যে, কোন সচেতন হিন্দু তার মন্দিরে কোরআন রেখে মন্দিরকে অপবিত্র করবেন না, অপরদিকে কোন মুসলমানও তার পবিত্র গ্রন্থকে মূর্তির পায়ের তলায় রেখে আসবে না। একটি গভীর অভিসন্ধি চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে একটা স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
জনাব প্রামাণিক স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন স্থানীয় এলাকার এম পি এবং মেয়রের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করেই প্রশাসনের সহায়তায় এই ঘৃণ্য ঘটনাটি ঘটিয়েছেন কেবলমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারের জন্য। এই ঘটনা থেকে বুঝা যায় আমরা জাতি হিসেবে সামগ্রিক স্বার্থকে কতটা ভীষণ ভাবে জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে কতটা উঁচুতে স্থান দিয়েছি। আরো বলতে বাধ্য হচ্ছি, এরকম স্বার্থান্বেষী,অসংঘবদ্ধ, বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন জাতি আমরা সবসময়ই ছিলাম। আমাদের নিজেদের ভেতরের ঐক্যের অভাবে বার বার বহিঃশক্তি লুট করেছে সোনার বাংলাদেশ।

সেই অসংঘবদ্ধ জাতি কোন এক ঘটনার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা শব্দটিকে নিজের করে নিয়েছিল পঞ্চাশ বছর আগে। যার খেসারতের শুরু হয়েছিল ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের রাতে জাতীর মেধাবী সন্তানদের বিসর্জনের মাধ্যমে। সেই থেকে শুরু হলো আমাদের অধঃপতন। রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং দেশসমূহ খুব ভালো করেই জানতো, মেরুদণ্ড ভেঙে কাউকে স্বাধীন করে দিলেও সে কোনদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আদতে হয়েছেও তাই। বিগত পঞ্চাশ বছরে পদে পদে বেঁচে যাওয়া মেধাদের নানাভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ১৭ কোটির মানুষের দেশে প্রায় অর্ধেক মানুষকে বিরোধী পক্ষ ভেবে দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসাতে চাইছে অপর বিরোধী দল।

আর এই পঞ্চাশ বছরে প্রতি ক্ষণে বিভক্ত হয়েছে বাঙালি জাতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও একটি সমগ্র জাতি হতে পারেনি কোনদিন। আমরা সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় কোন ব্যবস্থাতেই সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। আমরা মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভাজন করেছি ধর্ম দিয়ে, অর্থনৈতিক – রাজনৈতিক ভাবে।

এখন আমার প্রশ্ন হলো, এই ঘটনার সূত্রপাতের সময় হতে প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে সুষ্ঠু ও সামঞ্জস্য অবস্থা বজায় রেখে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে? ঘটনার সূত্রপাত বেলা ১১ টায়, কিন্তু প্রশাসন সাহায্য করতে আসে বেলা ৩ টার দিকে, বিভিন্ন অনলাইন খবরের বরাতে জানা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের এহেন আচরণের পেছনের কারণ কী? যদি আদতেই প্রশাসন নিরপেক্ষ হয়, তবে কেন তারা সাহায্যের হাত প্রসারিত করেনি?

বাঙালী বরাবর আবেগপ্রবণ জাতি। আর ধর্ম সংশ্লিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে অরাজকতার ইতিহাস নতুন নয়। সব ধর্মের লোকজন নিজেকে এবং তার ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ভেবে অন্য ধর্ম আর সেই ধর্মের লোকজনদের হীন ভেবে মহান হতে চায়। এই রকম সংবেদনশীল একটি ঘটনা অল্প সময়ের ভেতর ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তে ছড়িয়ে গেল সমগ্র বাংলাদেশে। প্রশাসনের কারো মাথায়ই কি আসেনি এই ঘটনা কতটা ভয়াবহতা ছড়াতে চলেছে বা বুঝেও বুঝতে চায়নি তা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশাসনের উচিত ছিল, দেশের সমস্ত পূজা মণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ করা তৎক্ষণাৎ নিরাপত্তার অংশ হিসেবে। আর পর্যায়ক্রমে অরাজকতা সৃষ্টিকারী লোকদের বিচারের আওতায় এনে উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রশাসন তা করেনি। যার ফলশ্রুতিতে আজ জ্বলছে পুরো বাংলাদেশ। যে দেশে একজন অভিনেত্রী বা নায়িকাকে গ্রেফতার করার জন্য মুহূর্তে দুশো পুলিশ হাজির হয়ে যায়, সেই একই দেশে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধান করার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাওয়া যায় না! আফসোস!

পরিশেষে বলি, আমার মতে এই পুরো ঘটনাটি হলো ব্যর্থতার মধ্য গগনের তপ্ত সূর্য। যে অস্তমিত হবার আগে অঙ্গার করে দেবে তরুণ প্রজন্ম। আমি আশাবাদী মানুষ, তাই এতোকিছুর পরেও সুন্দর সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় থাকতে চাই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.