পূজামণ্ডপে ভাঙ্চুর, আমাদের ধর্মবিশ্বাস ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

সারওয়ার-ই আলম:

শুধুমাত্র কোরআন কেন, যেকোনো ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা রক্ষা করাই প্রতিটি বিবেকবান ও পরমতসহিষ্ণু মানুষের সামাজিক কর্তব্য। আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবান মানুষ; তিনি নিজে ধর্ম পালন করুন আর না করুন অন্য ধর্মগ্রন্থকে তিনি অবমাননা করতে পারেন না— কারণ সকল ধর্মের প্রতি তার সমান শ্রদ্ধা থাকে। আর যারা ধর্মচর্চ্চায় নিবেদিতপ্রাণ তাদের ক্ষেত্রে তো অন্য ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় দেব-দেবীকে আঘাত করার প্রশ্নই আসে না। কারণ কোন ধর্মই এই হিংস আচরণের শিক্ষা দেয় না।

কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় আমরা কী লক্ষ্য করলাম? আমরা দেখলাম হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দূর্গা পূজা চলাকালে একটি পূজামণ্ডপে দেবতার পায়ের ওপর কোরআন শরীফ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত মুসলমানদের একটি অংশ মণ্ডপে ভাঙ্চুর চালায়। ফেসবুকের মাধ্যমে এই খবর শহরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য পূজামণ্ডপে ভাঙ্চুরের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটির উত্তেজনা শুধুমাত্র কুমিল্লাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরদিন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এই উত্তেজনার জের হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামন্ডপে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙ্চুরের পাশাপাশি পৃথক পৃথক সংঘর্ষে চারজন মানুষ নিহত হন। ফলে এবছর হিন্দু সম্প্রদায়কে তাদের দূর্গাপূজার সমাপ্তি ঘোষণা করতে হয়েছে আনন্দের পরিবর্তে অত্যন্ত ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে; যা খুবই দু:খজনক।

কিন্তু এই যে পূজামণ্ডপে কোরআন শরীফ পাওয়া যাওয়ার খবর রটে গেল আর সে খবরের ওপর ভিত্তি করে হিন্দু সম্প্রদাযকে এত বড় মূল্য দিতে হলো এর জন্য তাদের দায় কতটুকু— আমরা কি একবারও নিজেদেরকে সে প্রশ্ন করেছি? কোন একটি স্বার্থান্বেষী চক্র যদি পূজামণ্ডপে কোরআন রেখে এসে সহিংসতা সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্র হিসেবে তা রটিয়ে দেয় তাহলে সে ঘটনার দায় দায়িত্ব কেন হিন্দুদেরকে নিতে হবে? কেন তাদের অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করা হবে? কেন নিজ দেশে তারা স্বাধীনভাবে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারবে না?— এই প্রশ্নগুলো কি আমরা আমাদের বিবেককে জিজ্ঞেস করেছি?

এইরকম ঘটনা এটাই প্রথম নয়।
দু:খজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সমাজে মানবতার চেয়ে ধর্মের মর্যাদা অনেক বেশী। এ দেশগুলোত মানুষ ধর্মের কাছে এতটাই নতজানু যে ধর্মভিত্তিক ইস্যু নিয়ে সত্যাসত্য যাচাই না করে খুব সহজে মানুষ মানুষকে খুন করে ফেলতে পারে। জীবন্ত মানুষকে সর্বসম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত লাগার অযুহাতে নির্বিচারে প্রতিপক্ষের বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। অথচ একাবারও নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞেস করার দরকার মনে করেনা যে এরকম মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে ধর্ম আদৌ বিন্দুমাত্র লাভবান হয় কিনা।

কুমিল্লার ঘটনাটিতে লক্ষ্য করুন কীভাবে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে পৃথক সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। এই যে মানুষগুলো নিহত হলো তাদের জীবনের চেয়েও কি ধর্মের মর্যাদা অনেক বেশি?

ধর্মতো একটি অস্তিত্বহীন সত্তা মাত্র। একটি বিশ্বাস। কিন্তু মানুষ প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা জীবন্ত সত্তা। ধর্মের কোন অনুভূতি নেই। কিন্তু মানুষের হাসি, আনন্দ ও কষ্টের অনুভূতি আছে। কুমিল্লার ঘটনায় চাঁদপুরে যে চারজনকে মেরে ফেলা হলো তাদের ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা মানুষ। এই মানুষগুলোকে হত্যা করা হলো ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগে সৃষ্ট উত্তেজনায়। অথচ এদের কেউই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। যে ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করার অযুহাতে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হলো, সে ধর্ম কি আদৌ আমাদেরকে সে অধিকার দেয়— আমরা বিবেকের কাছে এই প্রশ্নটি রাখি না। রাখি না বলেই ‘৯২ সালে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনায় লক্ষাধিক লোককে প্রাণ দিতে হলো। দুই হাজার দুই সালে গুজরাট রায়টে প্রায় দুই হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। গতবছর লালমনিরহাটের একটি মসজিদে কোরআন শরীফ হাত থেকে পড়ে যাওয়ার অপরাধে একজন মানুষকে হাজারো মানুষের সামনে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলা হলো। লোকটির অপরাধ এতটাই বড় ছিল যে বলপ্রয়োগপূর্বক হত্যাই ছিল তার একমাত্র নিয়তি। এরচেয়ে চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ আর কী হতে পারে! যে ধর্মের মর্যাদা রক্ষার অযুহাত আমাদেরকে হিংস্র হতে বাধ্য করে, যে ধর্মের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখার জন্য জন্য আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে কুণ্ঠিত নই, সে ধর্ম পালন করার সার্থকতা কী? ধর্ম যদি আমাদের বিবেককে জাগ্রত না করে, ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত লাগার অযুহাতে আমরা যদি হিংস্র পশুতে পরিণত হই তাহলে সে ধর্ম জীবনের জন্য কতটা উপযোগী— আসুন নিজেদেরকে এই প্রশ্ন করি।

আসুন ধর্মকে স্বর্গ পাওয়ার সোপান হিসেবে ব্যবহার না করে, ধর্মকে ব্যবহার করি মানবিক বোধ জাগ্রত করার মাধ্যম হিসেবে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান— সবার জন্যই এই আহ্বান। আসুন ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালবাসি; মানবতার প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল হই। অস্তিত্বহীন ধর্মের মর্যাদা উপরে তুলে ধরতে অস্তিত্ববান মানুষ কতলের অসুস্থ, বর্বরোচিত চর্চা থেকে আমরা নিজেদেরকে বের করে নিয়ে আসি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ধর্মের চেয়ে মানুষের মর্যাদা অনেক, অনেক বেশী। আসুন ধর্মের অপব্যাখ্যা নয়, ধর্মের অসুস্থ চর্চা নয়, সঠিকভাবে ধর্ম পালনের পাশাপাশি মানবিকতার চর্চা করি। এভাবে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার কাছে নিজেদের বিবেককে বন্ধক রেখে মানবিক সমাজ গঠন একেবারেই অসম্ভব। ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষগুলো আমাদেরকে সে বার্তাই দেয়।

তাই আসুন সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম-প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি করার মাধ্যমে আমরা ধর্মভিত্তিক সমাজ নয়, পরমতসহিষ্ণু মানবিক সমাজ তৈরি করি। আসুন সাম্প্রদায়িক কারণে নিজেদের হাতকে ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত না করে, উদারনৈতিক মানবিক চেতনার স্নিগ্ধ সুষমায় সাজাই সমাজটাকে; সর্বত্র ছড়িয়ে দিই সুনির্মল শান্তির শাশ্বত বাণী!

(ফিচারে ব্যবহৃত ছবিটি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া, Mahmud Hossain Opu/Associated Press)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.