চোখের জল কিংবা পানি, সে তো নোনতাই থেকে যায়

সুবর্ণা চৌধুরী:

এ আমার কষ্টের দিন, আমার বিষন্নতার দিন। আমি বাংলাদেশের নাগরিক, আমি বাঙালি। হিন্দু পরিবারে জন্মসূত্রে আমি হিন্দু। কিন্তু আমার কাছে উৎসব, উৎসবই।তাই আমি পূজোয় যেমন হুল্লোড় করতে পারি, ঈদে নতুন পোষাক পরে বন্ধুদের সাথে ঘরে ঘরে গিয়ে সেমাই না খেলেও মন ভরে না। বৌদ্ধ পূর্ণিমায় ফানুস না ওড়ালে অসম্পূর্ণ মনে হয়, ক্রিসমাসের দিন সান্টা ক্লজের গিফটের জন্য অপেক্ষা করি এখনও। মাইকে যখন আজান বা ঢাকের আওয়াজ কিংবা ত্রিপিটক পাঠের শব্দ ভেসে আসে, আমার ছোট্ট মেয়েটার প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলি, এগুলো প্রার্থনা করার শব্দ। একেক মানুষ একেকভাবে প্রার্থনা করে। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিশ্চান শব্দগুলো সে এখনও জানে না।

বছর তিনেক আগে অনেকগুলো শিক্ষিত মানুষের সাথে আমাকে এক মাস কাটাতে হয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, আমি বাংলাদেশের নাগরিক, আমি একজন শিক্ষক, এটা আমার পরিচয় নয়; আমার বড় পরিচয় আমি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু। স্বাধীনতাবিরোধী এক বিতর্কিত কবি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আকারে ইঙ্গিতে আমাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, আমি হিন্দু তাই এই মুসলিম কবিকে সহ্য করতে পারি না। একজন আমাকে বলেছিল, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা অনেক সুবিধা ভোগ করে, প্রশাসনের উঁচু উঁচু পোস্টে তারা নিয়োগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই লেকচারারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার জানামতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা কোন আইন আছে কিনা! বলেছিলাম, সংখ্যালঘুরা যদি কোন সুযোগ পেয়ে থাকে, সেটা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পেয়েছে। যথাযথ উত্তর দিতে না পারলেও অনেক প্রভাবশালী আত্মীয়ের খবর জানিয়ে সেই শিক্ষক বলেছিল, তাই সে একথা সাহস করে বলতে পারে! সেই প্রথম জানলাম, প্রভাবশালী আত্মীয় থাকলে সংখ্যালঘুদের হেয় করে কথা বলার অধিকার জন্মায়! সেই একমাসে আমি জেনেছি, কবিরও জাত আছে; কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম কবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু।

শিক্ষাক্রমে ধর্মশিক্ষা কেন থাকবে, এই প্রশ্ন করে আক্রমণের শিকার হয়েছি। ধর্ম পারিবারিক বিষয়, স্কুলে পাঠ্য বিষয় হতে পারে না। স্কুলে থাকবে সব ধর্ম সমন্বয়ে নৈতিক শিক্ষা। শুধুমাত্র পরীক্ষার আগের দিন পড়ে পরীক্ষা দিয়ে আমি কখনো ৮০ এর নিচে নম্বর পাইনি, কারণ ধর্মের এই বিষয়গুলো আমি ছোট থেকে বড়দের কাছে গল্পের মতো শুনেছি। বন্ধুদের ইসলাম ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের ২০ নম্বরের এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেও ভালো নম্বর পেয়েছি, কারণ এই বিষয়গুলোও গল্পের মতো করে শুনেছি বাবার কাছে।

শিক্ষক এবং শিক্ষায় যখন গলদ থাকে সেখানে ভালো কিছু আশা করা যায় না। প্রচণ্ড বিষন্নতায় আমি খুব এলোমেলো হয়ে যাই, যা বলতে চাই তাও এলোমেলো হয়ে যায়। যা লিখতে চাই, লিখতে পারি না তার একাংশও। যখন কেউ শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানায়, তখনও কষ্ট আমাকে গ্রাস করে। শুভেচ্ছা বাণীরও তবে ধর্ম থাকে(!)?

আমি খুব অবাক হয়ে দেখছি, আমার বন্ধু তালিকায় অনেকের মুখোশ খুলে পড়ছে। অনেকে বিতর্কিত হবার ভয়ে কোন মন্তব্য করছে না। আমার জন্য ভালো হলো, বন্ধু তালিকা ছোট করতে সুবিধা হবে। যারা ধর্মীয় সংখ্যাগুরু হয়েও প্রতিবাদ করছে, তারাও সংখ্যালঘুদের মতো আক্রান্ত। তবুও মনে হয় এই মানসিকতার দিক থেকে সংখ্যালঘু মানুষগুলো আছে বলেই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এখনও ‘শুভ বিজয়া’ বলতে পারে।

মৃন্ময়ী মায়ের ভগ্নস্তুপের মধ্যে শুধু নয়, রক্ত-মাংসের মাকেও ক্ষত-বিক্ষত করার মধ্য দিয়ে শেষ হলো দুর্গোৎসব। যাদের জীবনে বিজয়া আর কখনও শুভ হয়ে আসবে না, আসবে আতংক হয়ে। রক্তের আলাদা কোন রঙের সন্ধান কেউ পেয়েছে কিনা জানি না। চোখের জল কিংবা পানি চিরকাল নোনতাই থেকে যাবে।

সুবর্ণা চৌধুরী
চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.