পূজামণ্ডপে হামলা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

জেরীন আফরীন:

পূজামণ্ডপে নারকীয় হামলা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মন্দিরে হামলা প্রতিমা ভাঙ্গাতে আপনারা লজ্জিত, শোকে স্তব্ধ!
অথচ খুব ভালো করে ভাবুন এমনটাই কি হবার কথা ছিল না? ঝড় কিন্তু হুট করে আসে না। ঝড়ের আগে থাকে পূর্বাভাস, যেখানে ঝড়ের মাত্রাটাও লেখা থাকে।

প্রখ্যাত অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের সিঁথিতে সিঁদুর দেখে, তাঁর হিন্দু ধর্মালম্বিতার কারণে যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া পুরো বাংলাদেশ দেখিয়েছিলো তাতে লজ্জা দেওয়া বাংলাদেশীর তুলনায়, লজ্জিত হওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল বড়োই অপ্রতুল।

আমাদের প্রিয় ক্রিকেটার সাকিবের মায়ের মাথায় সিঁদুর ছিলো না। তিনি মুসলিম হয়েও; বাংলাদেশের বর্তমান প্রচলিত হিজাব কিংবা ঘোমটা তার মাথায় ছিলো না বলে তিনি ধর্মান্ধদের তীব্র সমালোনার মুখে পড়েছিলেন। যেটা বিশ বছর আগেও কেউ চিন্তা করতে পারতেন না, কারণ গত বিশ বছর এমনকি দশ বছর আগেও মায়েদের জন্য শাড়ী পডরে আঁচল সামনে টেনে নেয়াটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। অথচ এই গর্বিত মায়ের ছবিতে শুধুমাত্র মাথায় কাপড় না থাকবার কারণে যেই ধরনের কটুক্তি এবং সমালোচনা হয়েছিল, তাতে স্পষ্টই বোঝা গিয়েছিলো বদলে গেছে আমাদের চিরচেনা বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা চেতনা।

এই সাইবার সংস্কৃতিতে ঘরে বসেই গুগল ম্যাপে ঘুরে আসা যায় হাওয়াই, শপিং করা যায় বিশ্বের সেরা শপিং স্টোর থেকে। একইভাবে ঘরে বসেই দেখতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের আমজনতার ভাবনা চিন্তা কিংবা সংস্কৃতির বিবর্তন। ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যেকোনো পাবলিক পোস্টের কমেন্ট বক্সে গেলেই সেই বিষয়টা খুব তীব্রভাবে টের পাওয়া যায়। আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত যেকোনো সাধারণ পোস্টেই ধর্মান্ধ মুসলিমদের যেই ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় যে বর্তমান বাংলাদেশে শুধুমাত্র হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নয়, বরং লিবারেল সাধারণ মুসলিমরাও এখন হয়ে গেছে আলাদা দল কিংবা অন্য।

বলুন তো, বাংলাদেশের নারীদের জাতীয় পোষাক কী? আপনাদের কি মনে আছে ছোটবেলায় সার্ক গেইম কিংবা এই ধরনের আয়োজনগুলোতে বাংলাদেশের নারীরা পরিপাটি শাড়ী পরে, বাংলাদেশের প্ল্যাকার্ড হাতে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে যেত অন্য দেশের সাথে! সেই শাড়ী কিংবা শাড়ী পরার তৎকালীন স্টাইল ছিল বাংলাদেশের শহুরে নারীদের জন্য কমন স্টাইল। আমার চারপাশের নারীরা তখন ঐ স্টাইলটাই ফলো করতেন, যদিও গ্রামাঞ্চলে শাড়ী পড়ার স্টাইলে ছিল পার্থক্য। কিন্তু বারো হাতের শাড়িই ছিল আমাদের নারীদের জাতীয় পোশাক।আজ থেকে বিশ বছর আগে আমার নানী- দাদীরা শাড়ীর উপরে পডরতেন বড় একটি ওড়না। আবিয়া, হিজাব, নেকাব এই পোশাকগুলো সেই সময়টাতে ছিল নিতান্তই অপরিচিত।

অবশ্য কে কী পোশাক পরবে সেটা সম্পূর্ণই তার নিজস্ব রুচি এবং মূল্যবোধ থেকে নেয়া সিদ্ধান্ত, এখানে কারো কিছু বলবার নেই। তবে আমজনতার মূল্যবোধ এবং চিন্তাতে যখন নতুন কোন মতাদর্শ হাজির হয়, যা পূর্ববর্তী সংস্কৃতি তথা নিজস্ব ঐতিহ্যকেই নাকচ করে দেয়, তখন অবশ্যই ভাবনার প্রয়াজন আছে এবং সতর্ক হবার দরকার আছে বলেই আমি মনে করি। কারণ প্রচলিত যেই প্রবল মতাদর্শ পুরো একটি জেনারেশনের চিন্তা – ভাবনাকে আমূল বদলে দিয়ে, নিজ সংস্কৃতিকেই ভুল/বিদআত (নেতিবাচক অর্থে) চিহ্নিত করছে; সেই প্রবল মতাদর্শে পূজা মণ্ডপে হামলা, প্রতিমা ভাঙ্গা, খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
আজ হামলা হয়েছে পূজা মণ্ডপে; তবে জেনে রাখুন সেইদিনও খুব দূরে নয় যেদিন নিষিদ্ধ হবে বাউল মেলা, প্রবারণা উৎসব, বাংলা নববর্ষের মতো প্রচলিত অনুষ্ঠানিকতাগুলো; তীব্র বাঁধা আসবে নারী শিক্ষা এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনাতে নারী নেতৃত্বও।

যখন কেউ ভুল করে কোন অপরাধ করে, তখন আইন -আদালত, কাউন্সেলিং, জরিমানা বিভিন্ন পন্থাতে দোষী ব্যক্তিকে প্রতিরোধ করা যায়, কিংবা পরবর্তীতে যেন একই ঘটনা না ঘটে সেই বিষয়টিকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু একটা দেশের প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী মতাদর্শিকভাবেই যখন অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না, নির্বিঘ্নে পূজা করতে দেয়াটাকেই যারা বিশাল গুণাহ মনে করছেন, যারা মনে করেন একমাত্র মুসলিম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মালম্বীদের পরকাল নেই, সেই উলুবনে হিন্দুদের উপর নির্যাতন নিয়ে কথা বলাটাই আমার কাছে বরং বিশাল প্রহসন মনে হয়। সমস্যা যখন মস্তিষ্কে; তখন হাতে, পায়ের অসাড়তায় মলম লাগানো কোন কাজের কথা হতে পারে না।

** তীব্র সমালোচনা জানাচ্ছি চৌমুহনীর মন্দিরগুলোসহ দেশজুড়ে আরও পূজামণ্ডপগুলোতে নারকীয় হামলার।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.