একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন আমাদের

সুপ্রীতি ধর:

যে মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আমাদের পূর্বসুরিরা, আমরা তা থেকে অনেক অনেক বছর পিছিয়ে গেছি। এটা স্পষ্টতই দৃশ্যমান এখন। বিশেষ করে গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে যা যা হলো এবং সরকারের পক্ষ থেকে যেরকম নির্লিপ্ত আচরণ করা হলো, তাতে আর বুঝতে বাকি থাকে না কার ইঙ্গিতে, কীসের লোভে এহেন আক্রমণ, হত্যা। আমরা একে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক হামলা যে নামেই ডাকি না কেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ নিরীহ জনগণ। বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এই প্রান্তিক মানুষেরা কখনও ভাবতেও পারেনি বছরকার একটি বড় ধর্মীয় উৎসব এভাবে শেষ হবে, এতো রক্তগঙ্গা বইবে!

আজকাল ভোঁতা হয়ে গেছে অনুভূতিগুলো। আমার চারপাশের সব বন্ধুদেরই একই অবস্থা। এতোটা উগ্রতা, এতোটা ধর্মান্ধতা, এতোটা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন একটা সম্প্রদায়কে দেশের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তৎপর, এটা আমরা মানতে পারছি না, ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের ভূলুণ্ঠিত হওয়া ঐতিহ্য ও বাঙালী সংস্কৃতির পুন:প্রতিষ্ঠাই এখন পারে এ থেকে দেশকে টেনে তুলতে। এজন্য প্রয়োজন এখন একটা বিশাল ঝড়ের, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঝড়।

দেখুন, আমার জন্ম রাষ্ট্রধর্ম সম্বলিত একটি সাম্প্রদায়িক দেশের এক সংখ্যালঘু পরিবারে, সেই অর্থে আমি একজন সংখ্যালঘু। নামের শেষে সেই সংখ্যালঘু চিহ্নিত পদবীটা জ্বলজ্বল করে সবসময়। মেয়ে হয়ে জন্মে আরও লঘু হয়ে গেছে আমার অবস্থান। দিনে দিনে বড় হতে হতে আমার কর্মের কারণে লঘু থেকে লঘুতর হয়ে গেছি আমি। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ধর্মের মাঝে থেকেও ধর্ম না মানা সংখ্যালঘু, নারী সংখ্যালঘু, উচ্চকণ্ঠ বেয়াদব নারী সাংবাদিক সংখ্যালঘু, অ্যাক্টিভিস্ট সংখ্যালঘু, আরও কত কত!
কিন্তু জানেন তো, আমি নিজে এজন্য গর্ববোধ করি। কারণ মাথা উঁচু করে আমিই বলতে পারি, বিশ্বের নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন আমি। নির্যাতক সংখ্যাগুরুদের কেউ নই। তাই আমার কোন লজ্জা হয় না।

দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই যখন কেউ কেউ বলে, “একজন ‘মুসলমান’ হিসেবে এই ঘটনায় লজ্জাবোধ করছি”, আমার কেমন যেন অস্বস্তি হয়। কেন জানেন? কারণ এই যে নিজেকে সত্যি সত্যি একজন ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্ত মনে করছেন, হয়তো আপনি সত্যিই প্রগতিশীল, সুস্থ চিন্তার মানুষ, কিন্তু তারপরও শরীর থেকে ওই ধর্মীয় আবরণটা সরাতে পারছেন না, এখানেই মূল সমস্যাটা থেকে যায়। ভারতে যখন উগ্রপন্থী হিন্দুরা নির্যাতন চালায় মুসলমানদের ওপর, কই আমার তো একবারও মনে হয় না যে হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণকারী হিসেবে আমার লজ্জিত হওয়া উচিত! আমার তখন কষ্ট হয় মানবতার পতন দেখে, মানুষ হয়ে মানুষের ওপর হামলা দেখে, সত্যিকারের মন্যুষত্ব আক্রমণকারীদের নেই বলে। শুধুমাত্র মুসলমান পরিবারে জন্ম বলেই তাদের লজ্জা পেতে হবে, এ কেমন কথা! যে বা যারা নিজেদের মুসলমান ভাবছেন, তারা কি নিজেদের কেবলই একজন মানবিক মানুষ ভাবতে পারেন না? কারণ গত কয়েকদিনে দেশে যা হচ্ছে বা হলো, তা তো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এথনিক ক্লিনজিং, সহজ করে বললে। এভাবেই দেশে দেশে সংখ্যালঘুদের মেরে-কেটে বিতাড়িত করে দিয়ে জায়গাজমি দখল করে নেয়া হয়। সুতরাং এ ধরনের ঘটনায় একজন মানুষ হিসেবেই সবার লজ্জিত হওয়া উচিত, ক্ষমা চাওয়া উচিত ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদেরকে রক্ষা করতে না পারার জন্য নিজেকে ধিক্কার জানানো উচিত, শুধুমাত্র ‘মুসলমান’ হিসেবে না।

আমার বিশ্বাস যে নিজেকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে না পারলে মুখে যতোকিছুই বলা হোক না কেন, তা শেষপর্যন্ত ভয়াবহ ফলাফলই বয়ে আনে দেশের ও দশের জন্য। এই চর্চাটাই ভয়ংকর। আফগানিস্তানে গত কয়দিনে বেশ কয়েকটি হামলায় যারা মারা গেছে এরা সবাই মুসলমান। ওখানে তো হিন্দু, বৌদ্ধ বা আর কেউই নেই। তাতে কী, মারতে হবে, ধর্ম তাদের শিখিয়েছে বিধর্মীদের কতল করতে, তাই মেরেছে। বাংলাদেশও একসময় অন্য ধর্মের কেউ থাকবে না, তখন নিজেরাই নিজেদের হাতে মরবে। এমনটা হবেই। মিলিয়ে নিয়েন।

এই যে রাষ্ট্রের একটি ধর্ম নির্দ্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, এ নিয়ে কয়জন কথা বলে? দু’একজন বললেও তাদের এমনভাবে চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে তারা আর যে কয়দিন বেঁচে আছেন, মনে হয় না আর মুখ খুলবেন। তারপরও গুটিকতক তো বলেই চলেছি অনেকদিন ধরে। কথাগুলো বললেই তো অনুভূতিতে আঘাত লেগে যায় একদলের, আরেকদল তখন চুপ থাকে। ফলে অনুভূতিওয়ালারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে নিধনযঞ্জে নামে, তা না পারলে মামলা-হয়রানি করে। এই তো চলছে। ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যতোটা চিন্তিত, তার এককণাও চিন্তিত না ওই ওয়াহাবি আগ্রাসনে। মাঝখান থেকে ‘বাঙালীয়ানা’ একেবারেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আজ।

দেশে অনেক বছর ধরেই অধিকাংশ কর্মজীবী হিন্দু বিবাহিত নারী শাঁখা-সিঁদুর পরা ছেড়ে দিয়েছে নিরাপত্তার কারণে। এবারের ঘটনার পর বাতাস যে কোনদিকে বইবে, তা ধারণাও করতে পারছি না। শুধু এটুকু বুঝতে পারি যে রক্ত দিয়ে এবং চোখের জল দিয়ে যে উৎসব মুছে দেওয়া হলো, সেখানে সম্প্রীতির বাণী, অসাম্প্রদায়িকতার মতোন শব্দগুলো হাস্যকর শোনায়!

তাই বলছিলাম কী, নিজের ধর্ম পরিচয়টা এখন গা থেকে খুলে ফেলুন। একজন মানুষ হিসেবেই বরং মানুষের পাশে দাঁড়াই, মানবিক দেশ গড়ে তুলি। সেজন্য দরকার আবারও একটি যুদ্ধের। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বা বিপ্লব আনা প্রয়োজন। সম্প্রীতি আনার চেষ্টা না করে বরং রাষ্ট্রকে ধর্মমুক্ত করুন, আর সেইসাথে চলুন সবাই মিলে প্রতিটি জনপদে আবারও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাই। তাইলে এমনিতেই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা পাবে। নইলে এইদেশকে টেনে তোলা সম্ভব হবে না আর।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.