ইভানাকে খোলা চিঠি

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

ইভানা,
মরার মাঝে কোন কৃতিত্ব ছিলো না, তোমার কষ্টের ভাগ আর কেউ না নিলেও তুমি কি নিতে পারতে না?
তোমরা মরে গিয়ে এই পুরুষতন্ত্রের শক্তি বাড়িয়ে দিয়ে যাও!
তোমরা কি বুঝিয়ে দিয়ে যাও জানো যে হাজব্যান্ড হাত ছেড়ে দিলে দুনিয়া ছেড়ে যেতে হয়! সবার কথা বাদ দিলাম, অবুঝ সন্তানকেও পর্যন্ত অগ্রাহ্য করতে হয়? বাবা সাথে থাকবে না বলে মায়েরও চিরতরে চলে যেতে হয়, তাইতো?

ইভানা,
এতোটা অসহায়ত্ব তোমাকে মানায় না।
যদি হৃদযন্ত্র চাপ সইতে না পেরে বন্ধ হতো,
যদি ব্রেইনস্ট্রোক হতো তাও মেনে নিতাম।
কিন্তু কোনটাই তো বিকল হয়নি
শুধু বিকল হয়ে গেলো তোমার মনোজগৎ।
নিজেকে তুমি মেরে ফেলেছো!
অবুঝ সন্তানকে তুমি ছেড়ে চলে গেছো!
এটা কী করে মানি বলো?
যদি ভার বইতে পারলে না তবে
গর্ভে রেখেছিলে কেন!
জলজ্যান্ত ছোট্ট প্রাণকে ছেড়ে চলে গেলে একটা বর্বর সঙ্গীর জন্য?
যে তোমাকে সঙ্গও দিতো না! অথচ সন্তান, যার কাছে কিনা তোমার সঙ্গই আরাধ্য ছিলো!

তুমি বাঁচার চেষ্টা কি করতে পারতে না?
বিয়ে ভেঙে গেলে মরতে হবে কেন? মা,বাবার কাছে মেয়ের জীবন বড় না বিয়ে টিকিয়ে রাখার স্বপ্ন? বিয়ের সাথে কীসের সম্মান জড়িত যে ভাঙলে তা হারাবে? বিয়েটাকেই জীবন বানিয়ে দিলে তো এদিক থেকে ওদিক হলে নিশ্চিতভাবেই মরতে হবে।

শিক্ষা, চাকরি নামক অবলম্বন সবই তোমার ছিলো। অনেক মেধাবী মেয়ে চাকরির গোল্ডেন অপরচুনিটি হারায় এই সংসার নামক শব্দটির জন্যে, শ্বশুরবাড়ির সন্তুষ্টির জন্যে। তারপরও এরা খুশি হয় না, সংসারটাও হয় না, আর নির্যাতন, সেটারও কমতি হয় না। এমন কোন হেনস্থা নেই যার শিকার তাকে হতে হয় না। তারপরও মানুষ শূন্যের মাঝেও চেষ্টা চালিয়ে যায়।
আর পরকীয়া প্রেম? এদের তোমার মৃত্যুতে কিছু আসবে যাবে না। বরং আরো তিনটা মেয়ে প্রেমে পড়ে যেতে পারে তোমার ব্যারিস্টার হাজব্যান্ডের ওয়াইফ পোস্ট খালি দেখে।

সমাজ ঐ পুরুষ আর তার সহচর নারীর দিকে আঙুল না তুলে তোমার দিকে তুললে এই পতিত সমাজের আঙুল গুঁড়িয়ে না দিয়ে এভাবে চলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। নিজে মরলে সমাজ তো মেরেই আনন্দ লুটবে। নিজে সৎ হলে অসৎ সমাজকে গ্রাহ্য করা সবার আগে ত্যাগ করতে হবে। যত কষ্টই হোক তাতে।

সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ করলে সে আত্মহননে উৎসাহী করবে। সে শেখাবে তুমি মরো, তোমার মাঝেই বিকশিত হবে আমাদের নোংরা পুরুষতন্ত্র। কত মহিমান্বিত করে গেলে এ সমাজকে। শিখিয়ে দিয়ে গেলে মরে যেও কিন্তু সে হাত ছেড়ে দিলে।

কিন্তু তুমি হয়তো জানো না সব মেয়ের বাবা, মা তোমার বাবা, মায়ের মতো হয় না। যারা মেয়ের বিয়ে বিচ্ছেদের খবরে মরে যাবে, কিন্তু লাশ নিয়ে বেঁচে থাকবে। কিছু মেয়ে এর চেয়েও হাজার গুণ কষ্ট সয়েও শুধু আত্মহত্যা করলে বাবা, মা স্পট ডেড হয়ে যাবে, বাচ্চার জীবন জলে ভেসে যাবে ভেবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ তাদের মা, বাবা মেয়ের বিয়ে ভাঙাগড়া নিয়ে যত ভাবে, তার চেয়ে বেশি ভাবে মেয়ের বাঁচামরা নিয়ে। তারা সব মেনে নিতে পারলেও মেয়ের অকাল মৃত্যু মানতে পারবে না। তারা তাদের ঘরের চাবি মেয়ের হাতে দিয়েই রাখে জন্ম থেকে, যাতে কখনোই ঘরে ঢুকতে অসুবিধা না হয়, আর যদি তাও হয়, তবে শক্ত হাতে মেয়ে লাশ হওয়ার আগেই হাত ধরে নিয়ে আসে মেয়ের জন্ম যে ঘরে সেখানে। আমাদের সামাজিক অবস্থায়, পারিবারিক নির্যাতনে জ্যান্ত লাশ বনে যাওয়া মেয়েকে ফিরে পেলেও তারা ভাবে, বেঁচে তো আছে আমার মেয়ে। কষ্ট তাদেরও হয় ফুলের টোকা গায়ে না লাগা মেয়েটাও যখন অত্যাচারিত, নিগৃহীত হয় সেটা দেখলে।

একটা বাচ্চা খুব কষ্ট পায় মা অত্যাচারিত হচ্ছে তারই বাবা এবং তার পরিবার দ্বারা সেটা দেখলে, আর যে বাচ্চা জানবে আমার মায়ের মৃত্যুই হয়েছে বাবা এবং তার পরিবারের জন্য তার অবস্থা একবার ভেবেছো? যদি ভাবতে, তুমি মৃত্যু মুখ থেকেও ফিরে আসতে ইভানা। দড়ি, বিষ, ছাদ পাশে রেখেও তুমি বাঁচতে চাইতে। ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে নিজের কষ্ট থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলেও তাকে সহনশীল মাত্রায় রাখতে।

জানোই তো তুমি যাকেই তোমার কষ্ট বলো কেউ পাশে দাঁড়াবে না সত্যিকারের ভালবাসে যারা, তারা ছাড়া। যেই মেয়েটা দশজনের সাথে লিভ টুগেদারের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সেও জ্ঞান দিতে পিছাবে না সংসারের মহিমার কারণ সতী নারীর তো এক পতিই থাকে, যে ছেলেটা সংসার রসাতলে দিয়ে শত নারীর সাথে শোয়াবসা করে সেও বলবে, সংসারের দিকে খেয়াল দেয়া উচিৎ ছিলো তোমার, নয়তো সংসার ভাঙবে কেন!! সংসার ভাঙেই মেয়েদের জন্য, যেমনটা ভাঙতে বসেছে তার। এদের পরিবারও এতে সায় দেবে ঘটনার সত্যতার।এদের মতো কীট নারী-পুরুষের মিলন মেলাই তো আমাদের সমাজ। যেখানে সৎ, সভ্য, ভদ্র মানুষেরা অসহায় বোধ করে, কখনও অকালে ঝরে যায় নোংরামো সইতে না পেরে।আমি জানি কেউ সুস্থ মস্তিষ্কে আত্মহত্যা করে না বা করতে পারে না। তবে যেই কষ্টে মরে যাওয়া যায়, সেই কষ্টের জেদে কিন্তু বেঁচে থাকাও যায়। শুধু শক্ত থেকে নিজেকে বলতে হয়, দেখি কে আমাকে মেরে ফেলার সাহস দেখায়!

বলতে দ্বিধা নেই এসব অজস্র ত্রুটিবিচ্যুতির কারণেই আমি এই সমাজকে ঘৃণা করি। এটা একটা হিপোক্রেট, অসভ্য সমাজ।

এই সমাজকেই তো আমি দিনেরাতে কটুক্তি করি।
তাই তার আমাকে নিয়ে কটুক্তির সাহস হয় না।
সমাজ এতোদিন সমাজচ্যুত করে এসেছে মানুষকে ,
আর আমি এ সমাজকেই সমাজচ্যুত করে বসে আছি।
তার অযাচিত দাদাগিরি আসলেই আমার ধাতে সয় না।

একটা বার সাহস করে বাঁচো,
একটা বার রুখে দাঁড়াও,
ডাক্তারের কাছে যাও,
ডিপ্রেশন, ফ্রাস্ট্রেশন, ডিপ ট্রমায় ভুগলে
লাগলে ওষুধ খাও,
বাচ্চাকে বুকে নাও,
বাবা-মাকে বলো আমায় ধরে দাঁড়াও,
ভাইবোন থাকলে তাদের জড়িয়ে ধরো,
ভয়ানক কষ্ট জানি,
তোলপাড় হয়ে যাবে ভিতর, তাও জানি,
মরণও দেবে কখনও স্বেচ্ছায় সমপর্ণের হাতছানি
তবুও মরণ আসলেই শুধু মরো,
এর আগে নয়।
মনে রেখো,
আজকে যাকে নিয়ে নিন্দা হবে
কাল সেই মেয়েই উদাহরণ হবে।
কারণ সে হার মানেনি,
অন্যায় না করে সে অন্যের অপবাদে,
জীবনকে অবহেলা করেনি।
জীবন তাকেই প্রণতি জানায়
যে বার বার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ায়।

ইতি
নষ্ট সমাজকে বুড়ো আঙুল প্রদর্শনকারী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.