কেবল জন্মসূত্রে একটি পরিচয় পাওয়ার নামই পরিবার নয়

শাহানা লুবনা:

শিক্ষকতা করার কারণে অনেক ছাত্র এবং অভিভাবকের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছে। সেইসাথে সঞ্চিত হয়েছে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। অনেক সময় গৌরবান্বিত হয়েছি আবার অনেক সময় ভেঙ্গেচুরে নিজেকে সামলে নিয়েছি।

আজ থেকে বিশ বছর আগে শিক্ষকতা পেশাটি যে অবস্থানে ছিল এখন সেটির চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। বাংলা অভিধানে বহুল ব্যবহৃত ‘গুরু -শিষ্য’ শব্দ দুটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে। এর পেছনে অবশ্য নানাবিধ কারণ রয়েছে। একতরফা ভাবে কাউকে দায়ী করবার কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমানে এই যুগকে বলা হয় ডিজিটাল যুগ। তাই এ যুগের ছেলেমেয়েদের হেন্ডেলিং এর সিস্টেমটাও ভিন্ন। মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়ে তাদের হেন্ডেল করতে হয়। কোনো ধরনের মারধর, বকাঝকা কিংবা তার পার্সোনালিটিতে আঘাত পায় এমন কোনো কথা বলা যাবে না। এটাই এখন বিধিবদ্ধ। প্রতিটি বাচ্চাকে এই একই সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। এটি কিন্তু মোটেই সহজ কার্য নয়। কেননা এক একটি বাচ্চা এক একটি পরিবার থেকে আসে। পারিবারিক এনভায়রনমেন্টের ভিন্নতার কারণে তাদের মানসিকতারও ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। সে কারণে সব বাচ্চা স্পিচ বা যথোপযুক্ত বাক্য ব্যবহারে মোটিভেটেড হবে এমন নাও হতে পারে।

আমার কাছে এমন অনেক অভিভাবক আসেন যারা বলেন, আমার সন্তানকে মানুষ করার জন্য আপনার যা যা করার করবেন, ‘দরকার হলে মেরে তক্তা বানিয়ে দিবেন, আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না।’ তখন আমাকে হেসে উত্তর দিতে হয়, রাষ্ট্র আমার হাত বেঁধে দিয়েছে। যে কাজটি আপনি বা আপনারা করতে পারেন সেটি আমি বা আমরা পারি না। আমাকে আমার পথ ধরেই এগোতে হবে।

একজন শিক্ষকের আপ্রাণ চেষ্টা থাকে তাঁর ছাত্রদের মানুষ করে গড়ে তোলার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যক্রম শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য সচেষ্ট থাকেন তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ের উপর শিক্ষা দিতেও শিক্ষকের নিরলস প্রচেষ্টা থাকে। তথাপি কিছু শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে যেটিতে পরিবারের ভূমিকা মুখ্য। সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য যেমন একটি সুশৃঙ্খল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার তেমনি দরকার একটি সুস্থ পরিবার, সুস্থ পরিবেশ।

এখন কথা হলো ‘সুস্থ পরিবার’ বলতে আমরা কী বুঝি। অনেকেই মনে করেন ‘সুস্থ পরিবার’ হচ্ছে সংসারে বাবা- মায়ের যৌথ উপস্থিতি। কিন্তু কেবল যৌথ উপস্থিতিকেই কি একটি ‘সুস্থ পরিবার’ বলা যায় ? যে পরিবারে সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকে না, যে আদর্শ একজন সন্তানকে সুস্হ পরিবেশ দিতে পারে না, উপরন্তু তার মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করে তাকে কী করে আমরা ‘সুস্থ পরিবার’ বলি !!

মূলত ‘সুস্থ পরিবার’ হলো সেই পরিবার যেখানে সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকে। আমি এক বাবাকে জানি যিনি তার তিন কন্যা সন্তানকে একাই মানুষ করে গড়ে তুলেছেন। মা হীন তিন কন্যা সন্তানের জন্য তিনি একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন । ফলে আজ তার কন্যারা নিজ নিজ অবস্থানে সফলকাম হয়েছে। আবার অনেক সিঙ্গেল মা আছেন যিনি একাই বাবা মায়ের যৌথ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সফলভাবে সন্তানদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। এ সবই সম্ভব হয়েছে সন্তানদের জন্য একটি সুস্থ পারিবারিক বলয় সৃষ্টি করা এবং মাথার উপর মা কিংবা বাবার শক্ত একটি ছায়ার উপস্থিতির কারণে।

কিছুদিন আগে আমার এক ছাত্রী ক্লাসে কোনো কারণ ছাড়াই অনবরত কাঁদতে লাগলো। কোনো ভাবেই তার কান্না বন্ধ হচ্ছে না। আমি তাকে ডেকে নিয়ে আলাদা ভাবে জিগ্যেস করলাম কেন সে কাঁদছে। বাচ্চাটি বললো, ‘মাঝে মাঝে আমার এমন হয়,অনবরত কান্না আসে।’ ১৩/১৪ বছরের এক বাচ্চা মেয়ের এই কথা শুনে বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। পরে তার কাছ থেকে জানতে পারলাম, বাবা মায়ের বিভোর্স হয়ে গেছে। মা আরেকটি বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এদিকে বাবাও আরেকটি বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন। সে এখন সৎ মায়ের সংসারে বড় হচ্ছে।

এই বাচ্চাটি হয়তো তার হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনাকে বইতে না পেরে কোনো এক সময়ে চোখের জলস্রোতে ভাসিয়ে দেয়। মানসিক ভাবে কতটা বিপর্যস্ত হলে আজকে তার এই অবস্থা। কিন্তু তার মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বটা কার ছিল। নিশ্চয়ই তার বাবা মায়ের। অথচ সেই দায়িত্ব পালনে তারা অক্ষম। উপরন্তু বাচ্চা পরীক্ষায় খারাপ করলে এরাই আমাদের কাছে ছুটে আসেন কেন সে পরীক্ষায় খারাপ করলো।

নিজেদের জীবন গোছাতে গিয়ে বাচ্চার জীবনটাকে এলোমেলো করে দেয়ার অধিকার একজন বাবা কিংবা মা কারোরই নেই। সন্তান জন্ম দিয়ে কেবল তার অন্ন , বস্ত্র, বাসস্থান নিশ্চিত করার নামই দায়িত্ব পালন নয়। তাকে যথোপযুক্ত পারিবারিক শিক্ষা প্রদান , তার এগিয়ে চলার পথটিকে মসৃণ করার দায়িত্বভার বাবা-মাকেই নিতে হবে।

শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর বলা হয়। অথচ এক্ষেত্রে অনেক সময় পরিবারই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক শিক্ষা বঞ্চিত সন্তানকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়। সন্তানের জীবনের প্রথম পাঠশালা হচ্ছে তার পরিবার। আর পরিবার যদি সেটি দিতে না পারে তবে তার দায়ভার পরিবারেরই।

কেবল জন্মসূত্রে একটি পরিচয় পাওয়ার নামই পরিবার নয়। সন্তানের জন্য পরম নির্ভরতার একটি স্থানের নাম পরিবার। একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সন্তানের মাথার উপর যে ছায়ার প্রয়োজন সে অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা কেবল অন্যায় নয়, পাপ ও বটে।।

শেয়ার করুন:
  • 131
  •  
  •  
  •  
  •  
    131
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.