সুপারস্টার শাহরুখ খান নয়, বাবা শাহরুখের জন্য আমার সমবেদনা

সালমা লুনা:

সুপারস্টার শাহরুখ খানের চব্বিশ বছর বয়সী ছেলেটি মাদকদ্রব্য রাখার দায়ে পুলিশের কাছে আটক হয়েছে। এমন একজন মাদকসহ ধরা পড়ার পর হইচই হবে জানা কথাই। সুপারস্টারের সন্তান বলে কথা। সেই সুপারস্টার যে নাকি মাত্র ৫০ রুপি পকেটে আর দুই চোখে একটা স্বপ্ন নিয়ে চলচ্চিত্র নগরীখ্যাত মুম্বাইয়ে এসে বিখ্যাত হয়েছিল। ৩০ বছরের অভিনয় জীবনে সাফল্য এসেছে বহু আগেই। সেইসাথে এসেছে অঢেল অর্থ সম্পদ। জীবনে কোন অপ্রাপ্তিই নেই আর। পরিপূর্ণ এক জীবন। এমন সময় এই ঘটনা!

এ তো গেল বিখ্যাত একজনের কাহিনী।

অতি সাধারণের জীবনেও এমন ঘটনা ঘটে।
সব মানুষ সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় না। ছোট শহর থেকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বড় শহরে আসে মানুষ। কম বয়সের একান্ত কিছু স্বপ্ন, ভোগবিলাসকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র স্বপ্নটাকে লালন করে। অজস্র অপমান, অবহেলা অবসাদ পাশ কাটিয়ে দিনরাত খেটে নিজের চলার পথ নিজে তৈরি করে। সেই পথে চলে একসময় মানুষটার নিজের একটা বাড়ি হয়, দামি গাড়ি হয়, প্রিয় সঙ্গীকেও পাশে পেয়ে যায়। আসে সন্তান।
বাবা-মা দুজনে মিলে প্রিয়তম সন্তানকে আগলে রাখে। সন্তানদের সকল অপূর্ণতা সেই বাবা-মা পুরণ করতে চায় চোখের পলকে। তাদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়তে যা যা করা দরকার সবই করে। জীবনের এই স্বাচ্ছন্দ্য টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় মানুষটা তখন অনেক ব্যস্ত। সন্তানকে দেয়ার মতো অত সময়ও আর করে উঠতে পারে না।

এখন সেই দম্পতির সন্তান যদি ড্রাগ নেয়, কিংবা কোন বেআইনি কাজ করে, কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে তবে সমস্ত দোষ কেমন করে যেন ওই কষ্ট করে উপরে উঠে আসা বাবা-মায়ের উপরেই বর্তায়। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে কেন সে টাকা রোজগার করলো, ব্যস্ত রইলো, এজন্যই তার সন্তানটি বখে গেল।

এটা অবশ্যই ঠিক যে সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দিতে হয়, তার বেড়ে উঠার সময়ে তার হাতটা ধরে থাকতে হয়, নিজের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে সন্তানদের জন্য সময় বের করতেই হয়। তবেই সন্তান মানুষ হবে।
কিন্তু এই গৎবাঁধা কথাই কি সব?

যে যেমন আয় করে তার জীবনে ব্যস্ততাও তার সমানুপাতে আসে।

কিন্তু জীবনের অতি ব্যস্ততার জন্য যদি সন্তানের পিচ্ছল পথে পড়ে যাওয়া, অন্ধকারের পথে চলে যাওয়াটা নজরে না আসে তবে পিতামাতার দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন উঠতেই পারে। যে পিতা বৈধ অবৈধ সবরকম উপায়ে টাকা রোজগারের নেশায় ছুটে বেড়ায়। মা সেই টাকায় শাড়ি গহনার শোডাউন করে আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে পার্টি করে বেড়ায় তার সন্তান যেমন বখে যেতে পারে। তেমনি যে বাবামা দুজনই কষ্ট করে রোজগার করে, সন্তানকে সচ্ছলতা দেয়ার পাশাপাশি সময়ও দেয় তাদের সন্তানও কিন্তু বখে যায়। সৎপথে রোজগার করা কত মানুষের সন্তানকেই দেখি ভুল পথে চলে গেছে, ফিরেও আসেনি আর। আবার অবৈধ রোজগার করা লোকের সন্তানকেও সুপথে থাকতে দেখেছি।

আবার একজন সিঙ্গল বাবা বা মা যিনি ঘরে বাইরে একলাই সব করে থাকেন, তার সন্তানও বিপথগামী হতে পারে। দিন আনি দিন খাই লোকের সন্তান যে মাদকাসক্ত হয় না তার স্বপক্ষেও তেমন শক্তপোক্ত কোন প্রমাণ দেখা যায় না।

বর্তমান এই সময়ে একটা সন্তানকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিতে মা বাবাকে কত যে কষ্টকর পথ পেরিয়ে যেতে হয় প্রতিটি অভিভাবকই জানেন। কতটা ছাড় দিতে হয়, কতবার ভেঙেচুরে নিজেকে বিনির্মাণ করতে হয়, নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে হয়, ইচ্ছা অনিচ্ছা সাধ্যের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হয় তা কেবল বাবামাই জানেন। তবু আমরা আকছার দেখি সন্তানের ভুলের জন্য, তার অপরাধের জন্য শুধুই বাবামাকে দায়ী করা হয়। যেন সেই সন্তানের কোন দায়ই নেই।

শাহরুখ খান আর গৌরি খানের সন্তান ড্রাগ নিয়ে ধরা পড়েছে। একের পর এক খবর দেখছি। ছেলে চারবছর আগে থেকেই ড্রাগস নিচ্ছে, অথচ মাবাবা জানেনা। ছেলে জেরার কোন এক পর্যায়ে বলেছে বাবা এত ব্যস্ত যে তার সাথে দেখা করতে হলে তাকেও এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। ব্যস অমনি মানুষ বলা শুরু করেছে, কী হবে এত টাকা দিয়ে, যদি সন্তানই নষ্ট হয়ে যায়। সব ভালোমানুষ মিলে পিতা শাহরুখ খানকে এখন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সেই কবে বেচারা মশকরা করে বলেছিল, সন্তান ড্রাগ নিলেও তার সমস্যা নেই – সেটাও কাল হয়েছে। অথচ একটা সাক্ষাতকারে দেখেছিলাম শাহরুখ বলেছে, যত রাতই হোক বাড়ি ফিরে সন্তানদের সাথে একঘন্টা সময় কাটান।

মানুষ ওইসব মনে রাখেনি।

সবাই দরদী, সঠিক প্যারেন্টিংয়ের উপর সবারই বিরাট দক্ষতা আছে। শুধু শাহরুখ আর যাদের সন্তান ড্রাগ নেয় তাদেরই নেই। সবাই যদি নিজ নিজ সন্তানের ভালোমন্দের এত খবরই রাখেন তাহলে এত মাদক যায় কোথায়! কারাই বা কেনে?

শাহরুখের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এক সহঅভিনেতা সোশ্যাল সাইটে মন্তব্য করেছেন, বিলিওনিয়ার হয়েও লাভ কী যদি ছেলে মাদকাসক্ত হয়।

চারদিকেই জাজমেন্টাল মানুষ।
কেউ বিপদে পড়লে এদের জ্বালায়ই অর্ধেক মরে যাওয়ার কথা!

মা বাবারা নিজেদের জীবিকার প্রয়োজনে ব্যস্ত হলে সবার সন্তানই বিপথে চলে যায় তাও না। তবে কেউ বিপথে গেলেই আঙ্গুল উঠে বাবামায়ের ব্যস্ততার দিকে। সন্তান পালনে তারা কতভাবে ব্যর্থ হয়েছে সবাই চুলচেরা হিসাবে মত্ত হয়।

সন্তান লালনপালনে ব্যর্থতার দায় অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাকেই নিতে হয়। অল্পবিস্তর ক্ষেত্রে, যেমন বাবা যদি খুব ধনী, বা বিখ্যাত কোন সেলিব্রেটি হন তাহলে তাকে নিয়েও সমালোচনা হয়।

আজকাল সন্তান মানুষ করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। কী করলে কী হবে, সন্তান মানুষ করার সবচেয়ে ভালো উপায় কী, কীভাবে সন্তানকে মাদক থেকে দূরে রাখা যাবে, অসৎ সঙ্গে পড়লো কীনা তার খবরই বা পাওয়া যায় কীভাবে সেসবের ঠিকঠাক তরিকা কে বলতে পারে!

দুইটা বাচ্চার মা হয়েও আমি আজও জানি না। আমি শুধু নই, আমার মতো অনেক নারীই সন্তানদের দিকে একটা মুরগি মায়ের মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে রাখেন। মুরগির মতো করে পাখনা মেলে মানুষের বাচ্চা লালন করা যায় না বলে আবার সমালোচনাও খুব হয়।
সন্তানকে সঠিক পথে রাখতে কার কর্মপদ্ধতি ঠিক বা ভুল তার বিচার না করাটাই যে ভালো সেটিও কেউ মনে রাখে না।

এটা ঠিক যে সবার তরিকা এক হবে না। স্বভাব, আচরণ ভেদে লালনপালন করার পদ্ধতিও আলাদা। কেউ হলফ করে বলতে পারবে না যে সবচেয়ে ভালো শিক্ষাদীক্ষা দিলেই সন্তান সুপথে থাকবে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো থাকলেই সন্তানের মানসিক গঠন ভালো হবে, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা থাকলে সন্তান মাদকাসক্ত হবে না, বেশি টাকা থাকলেই সব সন্তান নষ্ট হয়, কো এডুকেশনে পড়লেই নারীদের সম্মান করতে শিখবে। কেউ বলতে পারে না আসলে ঠিক কী করলে কী হবে!
সেজন্য তুলনা করাটাই অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

যে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক তারও কিছু দায়দায়িত্ব আছে। নিজের পিতামাতার প্রতি, তাদের আদর ভালোবাসা যত্নের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কর্তব্যও সে এড়াতে পারে না। জীবনে জয়ী হওয়া পিতামাতার পেছনের লড়াইটা তারা দেখে না। স্টারডম কিংবা আর্থিক সচ্ছলতার পেছনে তাদের ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঘাম আছে সেসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা জগতের সব বুঝলেও এটা বোঝে না।

সবচেয়ে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েও একজন মানুষ চোর হয়, খুন করে, ধর্ষণ করে। আবার একজন তথাকথিত শিক্ষার আলোহীন সুবিধাবঞ্চিত রিক্সাচালকও শ্রেষ্ঠ মানুষের মত আচরণ করে। এসব যেমন পিতামাতার শিক্ষার গুণ তেমনি পারিপার্শ্বিক থেকেও শেখা।

শুধু পরিবার না।
সমাজের দায় আছে।
রাষ্ট্রেরও দায় আছে।
আমাদের প্রত্যেকেরই দায় আছে।

এখন বেশিরভাগ অভিভাবক অন্যের কাছে নিজের সন্তানের কোন দোষের কথা শুনলে বিষয়টা শত্রুতা হিসেবে দেখেন। অথচ আমাদের ছেলেবেলায় পাড়াতো চাচা-চাচি, খালাম্মা-খালুরাই আমাদের কোন অন্যায় দেখলে শাসন করে দিতেন। বড় আপা ভাইয়ারা তো ছিলেনই। বাবা-মায়ের কান পর্যন্ত যেতোই না।
অথচ এখন ছেলেমেয়েরা তো বটেই, বাবামাও ভীষণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এমনটা কেউ করলে।

আসলে সময় বদলেছে, আরো বেশি বদলে গেছি আমরা।
আমরা ব্যক্তি স্বাধীনতা চিনেছি, কিন্তু ভুলে গেছি আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতির স্বকীয়তা। আমরা কাজ করি, কিন্তু দায়িত্ব বুঝি না। আমরা আঙ্গুলের খোঁচায় বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনতে শিখেছি, মাদক চিনেছি, পর্ণ চিনেছি কিন্তু ভুলে গেছি সম্পর্ক, তার মাহাত্ম্য।

এতোকিছুর পর আমার কেন যেন শাহরুখ গৌরি দম্পতির জন্য খুব মন কেমন করে।
তাদের প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করি। নায়ক শাহরুখ নয়, বাবা শাহরুখের জন্যই আমার সমবেদনা।

মা বলে বুঝতে পারছি, কে কী বলছে এসব কানে এলেও বুকে এতোটা বিঁধবে না যতটা বিঁধছে সন্তানকে গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদে ভেঙে পড়তে দেখে।

বাবামা সুপারস্টার হোক কিংবা ফ্যাক্টরি শ্রমিক, সন্তানের বিপদের দিনে তাদের মতো অসহায় আর কে!
আরেক বাবা-মাই শুধু সেটা অনুভব করতে পারে। বাবা-মা না হলে কেউ এই কষ্ট উপলব্ধি করতে পারবে না।

তবে এও ঠিক সন্তান সবার হয় না, তেমনি সন্তান হলেই সবাই বাবা-মাও হতে পারে না। তাই হয়তো যে সন্তান নিয়ে বিপদে পড়েছে তাকেই দায়ী করতে এই সমাজ পিছপা হয় না।

শেয়ার করুন:
  • 8.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    8.6K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.