‘জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা’ …

রওনক খান:

সত্তরের দ্বারপ্রান্তে এসে মুক্তি মিলল শাহেলা জামানের (কাল্পনিক নাম)। উচ্চশিক্ষিত, চিন্তাচেতনায় আধুনিক, মুক্তমনা, চলনে বলনে দুর্দান্ত স্মার্ট এই নারীর অন্তর ততদিনে ক্ষয়ে গেছে নিরন্তর বিড়ম্বনার নানান অভিঘাতে। দীর্ঘদিনের পঁচে যাওয়া ক্ষতে নতুন করে ব্যাথাহরা প্রলেপ লাগাতে প্রায় পঞ্চাশ বছরের কলুষিত দাম্পত্যের ইতি টানলেন তিনি। সংসার নামের খাঁচার খিলটা নিজ হাতে যত্নে উন্মুক্ত করে নিজেকে ছড়িয়ে দিলেন অসীম ভুবনে।

ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম শাহেলা জামানের। পিতামাতার স্নেহের ছায়ায় কেটেছে শৈশব, কৈশোর, উচ্ছ্বল তারুণ্য। উচ্চশিক্ষা শেষে আরও একটি অভিজাত পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে নতুন জীবনে পদার্পণ। দিব্যকান্তি, পদস্থ চাকুরে স্বামী। সবকিছু বেশ তরতরিয়ে চলছিল।
বিয়ের কিছুদিন যেতেই শাহেলা জামান অনুভব করলেন তিনি শেকলে বাঁধা পড়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে প্রগতিশীল পরিবারটি পুত্রবধূকে ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ রাখতে বদ্ধপরিকর। মেনে নিলেন। অল্পদিনের ব্যবধানে স্বামীর অভিজাত চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য রূপ একটু একটু করে উপলব্ধি করলেন।

ততদিন সংসার তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও মুখ বুঁজে সংসার আগলে রইলেন। উদ্দেশ্য দুটি সন্তানদের সুদৃঢ় ভবিষ্যৎ। সময় গড়াতে গড়াতে যৌবন বিদায় নিল। অসামান্য রূপসীর চেহারায় দেখা দিল ভাটার টান। ইতিমধ্যে স্বামীর স্বেচ্ছাচারিতা তুঙ্গে উঠেছে। কালের ঘণ্টা জানিয়ে দিল এবার সময় এসেছে ডানা মেলে দেবার। ইতিমধ্যে দু’সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত। দুজনেই সংসারিও হয়েছে। তাদের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে দুর্বিনীত স্বামীর সাথে কাগুজে সম্পর্কের ইতি টানলেন শাহেলা জামান। সমাজের সহস্র ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে ফিরে এলেন পিতার রেখে যাওয়া সেই পুরোনো ডেরায়। পৈতৃক সম্পদে তার একার জীবন হয়ে উঠলো সহজ সরল, মসৃণ। ফেলে আসা সংসারের জন্য মাঝে-মধ্যে মন কেমন করা দুঃখগুলো অনায়াসে তিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। পাশে থেকে সাহস, সহমর্মিতার জোগান দিয়ে যায় তার দুটি মাতৃভক্ত ছেলেমেয়ে। বাকি জীবনটার জন্য একটা চমৎকার ছক কষে এগিয়ে চলেছেন শাহেলা জামান। সংসারের এবড়ো থেবড়ো পথের স্মৃতিগুলো তার মনকে আর তেমন অবিন্যস্ত করে না। বরং সম্মুখের একটি সুচারু, মসৃণ পথের মায়ায় তিনি এখন এক বিমোহিত পথিক।

মধ্য ষাটের হোসেইনোদ্দৌলা (কাল্পনিক নাম)। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। সরকারি চাকরির সুবাদে অগাধ বৈধ-অবৈধ সম্পদের মালিক। তার চল্লিশ বছরের জীবন সঙ্গিনীটি বড্ড বেশি সাদামাটা, সেঁকেলে। দিনরাত রান্না ঘরের ধোঁয়ায় বসে পরিবারের জন্য চর্ব্য চোষ্য প্রস্তুতে ঘেমে নেয়ে একসা হন। আটপৌরে শাড়ির আঁচলে সর্বদা তেলঝোলের ছোপ। তাই দেখে প্রায়শ বিরক্ত হোন হোসেইনোদ্দৌলা সাহেব। জোহরা বানুর (কাল্পনিক নাম) বয়সও এখন ষাটের কোঠায়। এতোদিনের সংসার ধর্ম, সন্তান পালন, স্বামী এবং পরিজনদের মন জুগিয়ে চলতে চলতে অনেকটা যেন অজান্তেই শরীরে, মনে ঘুণ ধরেছে। তার চেয়েও দ্রুতগতিতে আলগা হয়েছে স্বামীর সঙ্গ মনের বন্ধনটুকু। দিনে দিনে দায়িত্ব কমেছে। বেড়েছে বিশ্রামের অবকাশ। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিঃসঙ্গতা। ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের জগতে সদা ব্যস্ত। মায়ের প্রতি দৃষ্টি দেবার মতো সময়ের বড় অভাব তাদের। চাকরি থেকে সদ্য অবসর নিয়েও স্বামীর রহস্যময় অস্থিরতা। যখন তখন সেজেগুজে বাবু হয়ে বেরিয়ে যান। ফেরেন মধ্যরাতে। ইদানিং স্বামী-স্ত্রীতে কথাবার্তাও কমে গেছে। অবশ্য দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই হোসেইনোদ্দৌলা তার বোকা বোকা স্ত্রীটিকে কখনও ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি।
সংসার অন্তপ্রাণ জোহরা বেগম একদিন আচমকা শুনতে পেলেন তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়েতে আগ্রহী। একটি অপেক্ষাকৃত কমবয়সী মেয়েকে তার মনে ধরেছে। বজ্রাহত হলেন জোহরা বেগম। মুহূর্তে দুলে উঠলো তার চিরচেনা সংসারটি। স্বামী তো দূরে সরে গিয়েছিল অনেক আগেই। আজ যেন আরও বেশি অচেনা মনে হলো তাকে। তবে চিরদিনের শান্ত স্বভাবের জোহরা বেগম মতিচ্ছন্ন স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে বিনা বাক্যব্যয়ে অনুমতি দিলেন। শুধু বিনীত স্বরে তার অপরাধের একটি ব্যাখ্যা চাইলেন। জবাবে হোসেনোদ্দৌলা নিতান্তই একটি খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করালো। তার অভিযোগ, জোহরা বেগম গৃহিণী হিসেবে পুরোপুরি ব্যর্থ। একটি বিশৃঙ্খল সংসার জীবনে নাকি তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।
চল্লিশটা বছর যে মানুষটা মুখ বুঁজে সংসারে প্রত্যেকের চাহিদার যোগান দিয়ে গেছেন, তারই যত্নে সজ্জিত একটি নিটোল সুন্দর গৃহে দিনশেষে কর্মক্লান্ত হোসেইনোদ্দৌলা চল্লিশ বছর ধরে ক্লান্তি ঝরিয়েছেন, শেষ বয়সে এসে তাকে অসংসারী তকমা দিয়ে সংসারচ্যুত করার এই পাঁয়তারাটি বলাবাহুল্য একটি চমকপ্রদ প্রহসন।

নতুন বিয়ে করে বৌ নিয়ে অন্য একটি ফ্ল্যাটে উঠলেন হোসেইনোদ্দৌলা। নিঃসঙ্গ জোহরা বেগম নিজ অধিকার বলে রয়ে গেলেন তার আপন হাতে গড়া গৃহকোণটি আগলে। জোহরা বেগমের নিত্যসঙ্গী এখন সীমাহীন একাকিত্ব, পরিণত দাম্পত্যের অসম্মান, তার নারী জীবনের নানান অমর্যাদা। শাহেলা জামানের মতো করে ভাববার সাহস তার নেই। সমাজের ভ্রুকুটি তিনি পায়ে ঠেলতে শেখেননি। সনাতন বাঙালী নারীর মতোন করেই জোহরা ভাবতে শুরু করেন, এ জীবনের যাবতীয় অবমাননার দায়ভার তার একার। এমন ভাবনায় নিজেকে ধিক্কার দেন অহর্নিশি। সমাজ সংসার থেকে এক লহমায় নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ইঞ্জিনিয়ার হোসেইনোদ্দৌলার প্রথমপক্ষের স্ত্রীর পরিচয়ের লজ্জা বয়ে চলেন নিভৃতে।

দুজন পড়ন্ত বয়সী নারীর জীবনের গল্পে ভিন্নতা থাকলেও কষ্টগুলো প্রায় একই। তবে একজন পেরেছেন নিয়মভাঙার পথে হাঁটতে, অন্যজন আঁকড়ে রইলেন বহু পুরাতন এক অচলায়তন।

বিবাহিত জীবনে অসুখী নারীর সংখ্যা সমাজে নগণ্য নয়। সামাজিক নানা প্রতিকূলতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভাবনা, সর্বোপরি পাছে লোকে কিছু বলে, ইত্যাকার নানাবিধ কারণে একটি অশান্ত জীবন কোনমতে কাটিয়ে দেওয়াই যেন কালে কালে প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় শেষ বয়সে এসে যখন জাগতিক নানান দায়িত্বের বোঝা হালকা হয়ে যায় তখনও অনেকে একটি প্রণয়শূণ্য, আবেগহীন দাম্পত্যকে খড়কুটোর মতো আগলে ধরে বাঁচতে চান।
সীমারেখা টেনে দেন আরও একটি নবতর জীবনের আকাঙ্ক্ষার মূলে। মৃত হয়ে যায় ঘুরে দাঁড়াবার ইচ্ছেটুকুও।

তবে এসবই নিতান্ত নেতিবাচক ভাবনা। দীর্ঘদিনের একটি ভগ্নপ্রায় বৈবাহিক জীবনের মলিনতাকে দুপায়ে মাড়িয়ে, হারিয়ে যাওয়া প্রত্যাশাগুলোকে নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত করা বোধহয় একেবারে অসম্ভব নয়। একজন শাহেলা জামানই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শেষ বলে কিছু নেই। যে কটা দিন বাকি আছে, তাই বা কম কী?

দেরিতে হলেও অসম্মানের পায়ে মাথা না খুটে বরং শক্ত খুঁটিতে বেঁধে নেওয়া যায় সম্মুখের ক’টা দিন। সমস্ত বঞ্চনা জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু উজ্জ্বল, প্রাণময় দিনের জন্য প্রত্যয়ী হওয়ার ইচ্ছেটুকুই নারীকে ফিরিয়ে দিতে পারে তার একান্ত একটি আপন ভুবন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরর কাছ থেকে ধার করে নিয়ে এভাবেও বলা যেতে পারে…

জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা
ধুলায় তাদের যত হোক অবহেলা।

শেয়ার করুন:
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
    13
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.