কোভিড পাল্টে দিল আমার জীবনটাকে

সাদিয়া গুলশান:

ভাবছিলাম আমার একান্ত ব্যক্তিগত কথা এখানে লিখবো কিনা। তারপর মনে হলো কেউ যদি মন খারাপ করে ভাবেন কিছু হবে না জীবনে, তাই তাদের জন্য আজকের লেখা। যাদের পড়তে ইচ্ছা করবে, পড়বেন।

কোভিডে যেমন অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে, তেমনভাবে ২০২০ এর মার্চ মাসে আমাকে সাময়িকভাবে লে অফ করা হয়। প্রথমে খুব খুশি হলাম যে কানাডায় আসার পর কখনও ব্রেক পাইনি, একটু আয়েশ করে নিই। সরকার থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার কানাডিয় ডলার করে দিলো। প্রথমে তো বুঝিনি, পরে বুঝলাম যে চাকরি নাই, কিন্তু বাড়ির মর্টগেজ আর বিল তো আর থেমে থাকবে না। আর একটু একটু করে আট বছরের পুরান কাজটা খুব মিস করতে লাগলাম। তখন মনে হলো যখন আমাদের কাছে কোনকিছু থাকে আমরা তার মূল্য বুঝি না। আমার নিজের একটা অফিস রুম ছিলো। কী দাপটের সাথে কাজ করেছি। আমার কাজই ছিলো ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সাথে। তাদের সুখ-দু:খের কত কথা তারা আমাকে বলে। যখন কেউ এসে বলতো, ‘সাদিয়া, একসিডেন্ট হয়েছে’, আমি প্রথমে জিজ্ঞেস করতাম “তুমি ঠিক আছো তো”? তারপর আমার আয়ত্তের মধ্যে যতটুকু করার তাড়াতাড়ি করতাম, আর যখন কিছু করতে পারতাম না, তখন মনে হতো ওদের জন্য একটা যদি ফান্ড থাকতো!

কতজনের সাথে কত কথা। একদিন একজন ড্রাইভার বলেই ফেললো, “সাদিয়া, আমাদের সারাদিন কাস্টমারের বকা ঝকা খেয়ে অফিসে এসে তোমার হাসি দেখলে মনটা ভালো হয়ে যায়”। আমার কাছে এটা বড় পুরষ্কার। বেশিরভাগ ড্রাইভার সোমালিয়ান, আমাকে সিস্টার বলে সম্বোধন করতো। কী ব্যস্ত থাকতাম সারাদিন। যখন ইনসুরেনস সেকশনটা বন্ধ হয়ে গেলো ২০১৮ এ, আমার সিইও আমাকে বললেন, তোমাকে ছাড়তে চাই না। তোমার জন্য একটা নতুন পোস্ট বানিয়েছি। তোমার অধীনে কর্মচারি থাকবে, তোমার পড়াশোনা এখন কাজে লাগাতে পারবে। আমার সিইও আমার উপর সব ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তো এতো rewarding job ছেড়ে কী করবো ভাবছি। যতদিন কাজ না পাই ততদিন তো কিছু একটা পাশাপাশি করতে হবে। বন্ধুরা বললো, আমি যেহেতু গাড়ি চালাতে পছন্দ করি তাই আমার গাড়ি নিয়ে Amazon আর Uber Eats শুরু করতে পারি। আমি সাথে সাথে এ্যাপস ডাউনলোড করে রেজিস্টার করলাম। এটা এখনও আমার কাছে মিরাকল যে আমার যেসব বন্ধুরা আমাজনে রেজিস্টার করতে পারেনি, আমাজন ওদেরকে ওয়েটিং লিস্টে রেখেছে, আর আমি কোনদিক দিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। তখন বাসার কাছে আমাজনের সেন্টার ছিলো না, তাই Whitby centre এ গিয়ে ডেলিভারি করতে হতো। আর ওখান থেকে Oshawa তে ডেলিভারি করতে হতো। তিন ঘণ্টায় ৩০-৩৩ টা পার্সেল ডেলিভার করা মুখের কথা না। যখন যেভাবে পারি Amazon আর Uber Eats দুটাই চালিয়ে যেতে থাকি। আমার পুরান গাড়ি একদিন রাস্তায় থেমে যায় আর ঠাণ্ডার কারণে বরফের মধ্যে গাড়ি নিয়ে পার্ক করা, ডেলিভার করা কঠিন হয়ে যাবে। এক বন্ধু তখন বুদ্ধি দিলো সিকিউরিটি গার্ডের কোর্স করতে। একদিন ক্লাসে, আর বাকিগুলো অনলাইনে। তাড়াহুড়া করে তিনদিনে সব লেসন শেষ করে পরীক্ষা দিলাম, আর পাশ করে লাইসেন্স পাওয়ার আগে এক এজেন্সির মাধ্যমে চাকরি রেডি। ওরা আমাকে শনি ও রবি প্রতিদিন ১২ ঘন্টার শিফট দিলো। আমি সোম থেকে শুক্র চাকরি খুঁজি, ইন্টারভিউ দেই আর Amazon আর Uber eats করতে থাকি। এর মধ্যে অনেক পরিচিতজনদের বলে রাখি চাকরির জন্য।

এক বন্ধু বললো, ওদের ওখানে একটা চাকরির পোস্টিং আছে। তবে কাজের বিবরণের সাথে আমার সিভির কোন মিল নাই। ওটা ছিলো আমার জন্য সবচেয়ে কম আকাঙ্খিত চাকরি। কিন্তু আমার বন্ধু নাছোড়বান্দা, আমাকে দিয়ে এপ্লাই করালো, বললো, কোন ভালো জব পেলে ছেড়ে দিতে। তিন ধরনের ইন্টারভিউ হলো, আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দেই এবং ওরা আমাকে পছন্দ করে। জাপানিজ কোম্পানিতে work from home document administration পদে ফুলটাইম জব শুরু করি। সেই সাথে শনি ও রবিবারের  সিকিউরিটি জব তো আছেই।

সিকিউরিটি গার্ডের অভিজ্ঞতাটা অন্য রকম। ১২ ঘন্টা এক কন্ডো বিল্ডিং এ reception এ বসে থাকা। এতো আরামের জব কখনো দেখিনি। তখন মনে হলো, এতো কষ্ট করে অ্যামাজন এবং উবার ইটস এ জব করার চেয়ে এটা কতো আরামের। বাইরে তুষার পড়ছে ,আমার কোন টেনশন নাই। ওখানকার বাসিন্দা আর যারা ওটা দেখভালের কাজ করে, তাদের সাথে ভালো ভাব হয়ে যায়। জীবনকে আরেক দিক দিয়ে দেখি। মানুষজন দেখি আর ভাবি, এগুলো মিলিয়ন ডলারের কনডো। কেউ থাকে রিটায়ারমেন্টের পর আর নইলে অল্প বয়সের।

জীবনে সব ধরনের অভিজ্ঞতার দরকার আছে।
এর মধ্যে আমার পুরান জব থেকে বলে বাসায় বসে কাজ করতে।
কী মুশকিল! আমার পাঁচটা জব!
কোনটা রেখে কোনটা করি! সিকিউরিটি জব যেহেতু আমার উইকএন্ড ব্লক করে রাখে, আর সামারে আমি ঘুরতে চাই, তাই ওটা বন্ধ রাখলাম। করলাম তো ছয় মাস এক নাগাড়ে সাতদিন কাজ।
এখন আমি রেডি ফর সামার। কিন্তু সেখানেও বিধিবাম। আমার সার্জন ক্যান্সার  সন্দেহ করছে। আমি আর পরিকল্পনা করতে পারি না দূরে কোথাও যাওয়ার। আমার সাতদিনের কাজের মধ্যেও আমি সপ্তাহে একদিন কিছুক্ষণের জন্য বাইরে ঘুরেছি, যা ছিল আমার চালিকাশক্তি। ওই যে বললাম আমার নেশা হলো গাড়ি চালানো এবং প্রকৃতি ও নিসর্গ উপভোগ করা। সারাদিন বাসায় থেকে কাজ করে একটু তাজা বাতাসে নি:শ্বাস নিতে অ্যামাজন ডেলিভারি করতে বেরিয়ে যাই, যদিও অপশন থাকে আমার পুরান জবের ফাইলগুলো দেখে দেয়ার, কিন্তু একটা কম্পিউটার বন্ধ করে আবার আরেকটা খুলতে ভালো লাগে না।
এর মধ্যে কিন্তু কয়টা বিয়ের ডালা কুলার অর্ডার নিয়েছি। কোন আর্ট স্কুলে যাইনি বা একেবারেই প্রফেশনাল না এ ব্যাপারে, কিন্তু আমার মন ভালো থাকে এমন creative কিছু করলে।

ইউটিউবে দুইটা চ্যানেল খুলেছি রান্নার এবং ভ্রমণের জন্য Bhromon Buddy. কীভাবে YouTube এ একাউন্ট বানাতে হয়, tripod দিয়ে নিজের রান্নার ভিডিও কীভাবে করতে হয়, সব নিজে নিজেই করেছি।
একটা সংকলনে আমার দুইটা কবিতা আর একটা গল্প ছাপা হয়েছে।
নিজেকেই নিজে বাহবা দেই মাঝে মাঝে।

কোভিডে সবার মেন্টাল হেলথ অনেক চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় পড়েছে।
এতোকিছু বলা বা লেখার একটাই অর্থ। আপনাকে সব সময় পজিটিভ চিন্তা করতে হবে। আমাকে দিয়ে কিছু হবে না, আমার জীবন শেষ, এসব ভাবা যাবে না। আমার কাছে মনে হয়, যতক্ষণ আমার হাত পা আছে, আমি নিজে চলতে পারছি, ব্যস! আর কিছু লাগবে না। আর হ্যাঁ, সবসময় নিজের একটা শখ ঠিক করে রাখুন, আর ওটা ধরে রাখুন। শুয়ে শুয়ে খালি চিন্তা করলে হবে না, আমার এটা নেই, ওটা নেই, বরং কী আছে তাতে মনোযোগী হোন। সবাই ভালো থাকুন আর জীবনটাকে উপভোগ করুন।

সাদিয়া গুলশান
সেপ্টেম্বর ২৬,২০২১

শেয়ার করুন:
  • 170
  •  
  •  
  •  
  •  
    170
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.