একই অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া কেন?

দিনা ফেরদৌস:

রাজধানীর স্কলাসটিকা স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর ইভানা লায়লা চৌধুরীর আত্মহননের খবর এরই মধ্যে সবাই জানে। যিনি প্রায় দশ বছর আগে (২০১১ সালে ) ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ মাহমুদ হাসান রুম্মানকে বিয়ে করে আট বছর ধরেই অসুখী দাম্পত্য জীবন বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। যাদের আট ও ছয় বছরের দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে ছোট ছেলেটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিস্টিক) শিশু। ফলে স্বামীর পরকীয়ার কথা জেনেও ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না ইভানা। অথবা অন্যভাবেও বলা যায় যে, ডিভোর্সকে আমাদের সমাজ সহজে মেনে নেয় না বলেই ইভানাকে স্ত্রী হিসেবে সহ্য করতে না পেরেও রুম্মান সাহেব বহু কষ্টে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালিয়ে নিচ্ছিলেন। ফলে ইভানার উপর তিনি সব রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যাতে নিজ থেকে ইভানা রুম্মানের জীবন থেকে সরে দাঁড়ান। ভালোবাসাহীন, সম্মানহীন, অবহেলিত জীবন বয়ে বেড়াতে না পেরেই আজ ইভানা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। যার দায় আমাদের সমাজ কিছুতেই এড়াতে পারবো না।

ঠিক একইভাবে ২০১৯ সালে ডাক্তার আকাশও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্ত্রী মিতুর পরকীয়া সহ্য করতে না পেরে। কিন্তু তাদের তো কোন সন্তান ছিল না যে মা-বাবার বিচ্ছেদ হলে বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডা. আকাশ চাইলেই মিতুকে ডিভোর্স দিতে পারতেন। না দিয়ে তিনি কেনো নিজেকে শেষ করে দিলেন। এখন বেশিরভাগই বলবেন মিতুকে খুব ভালোবাসতেন আকাশ সাহেব। জ্বী, মরার আগে ভালোবাসার মানুষকে কীভাবে ফাঁসানো যায়, ঠাণ্ডা মাথায় বর্ণনা দিয়ে চিঠি লিখে গিয়ে ভালোবাসার যথেষ্ট প্রমাণ রেখে গেছেন! এই না হলে ভালোবাসা!

আরেক দল বলাবলি করছিলেন, কাবিনের টাকা শোধ করার যোগ্যতা না থাকায় ডা. আকাশ ডিভোর্স দিতে পারেননি। তখন বলতে হয়, ইসলামি নিয়মে গেলে স্ত্রী সাথে শারীরিক সম্পর্কে যাওয়ার আগেই দেনমোহরের টাকা শোধ করতে হয়। আর কেউ যদি ছেলের সামর্থ্যের বাইরে দেনমোহর চায়, তো সেখানে বিয়েই করাই উচিৎ না। ডাঃ আকাশের জন্যে কি মেয়ের অভাব দেখা দিয়েছিল? আসলে ঘটনা হচ্ছে, ডা. আকাশ প্রথম থেকেই ভেবেছিলেন যা চাইবেন, সব হাসিল করবেন যেকোনো উপায়ে। এমনকি বিয়ের পর বউকেও ভেবেছিলেন রাখবেন হাতের মুঠোয় ইচ্ছেমতো, শেষে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শেষের কবিতায়’ বলেছিলেন “শিকলওয়ালা বাঁধে বটে, কিন্তু ভোলায় না, আফিমওয়ালী বাঁধেও বটে, ভোলায়ও”। আফিম বলতে মায়াকে বুঝিয়েছিলেন। যেই সংসারে মায়া নেই, বিশ্বাস নেই সেই সংসারের ভরসাও নেই।

তবে সেদিন সারা দেশজুড়ে সবাই যেইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মিতুর উপর,  মেয়েটাকে ডাইনি বানিয়ে ছেড়েছিলেন। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, অবৈধভাবে আটক রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের মধ্যে রেখে তাকে দিয়ে ওই অবস্থায় ভিডিও বানানো হয়। তার মুখ দিয়ে তাকে বলানো হয়, সে নষ্টা -ভ্রষ্টা, আরও যা যা তকমা লাগানো যায়। প্রতিদিন মানুষ মিতুকে গালি দিচ্ছিল। তাকে কাছে পেলে কে কীভাবে রেইপ করতে পারতো, তারও বর্ণনা চলছিল। আজ সেই জাতি একেবারেই চুপ। যেন কিছুই হয়নি। মিতুকে যেই অপরাকে ডাইনি বানানো হয়েছিল, একই অপরাধে রুম্মানকে দৈত্য দানব বানানো যাচ্ছে না। কারণ রুম্মান একজন পুরুষ। পুরুষকে গালি দিয়ে আরাম পাওয়া যায় না। পুরুষকে বেশ্যা, খানকি, মাগী, বারোভাতারি বা ধর্ষণের হুমকি দিয়ে যৌন সুড়সুড়ির আরাম পাওয়া যায় না। সুশীল সমাজ গালি দেয়ার মধ্যেও আরাম খোঁজে। গালি যারা দেয় তারা যে শুধু রাগ থেকে দেয় বা প্রতিবাদ করতে গিয়ে দেয়, তা নয়। অবদমিত জাতি গালির মধ্যে থেকেও যৌনসুখ লাভ করে। আগে যেমন মানুষ বাথরুমের দেয়ালে লিখতো, কেউ জানলোও না, মনের সুখও মিটে গেল, ঠিক তেমনি।

এই লেখার অর্থ এই নয় যে, অপরাধের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিবেচনা করতে হবে। অপরাধী যেই হোক শাস্তি যেন সে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পায়। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দেখা যায় ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই আমরা জনগণ রায় দিয়ে দেই কে দোষী, আর কে দোষী না। কাকে রিমান্ডে নেয়া দরকার, কার জামিনের দরকার নেই, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকবারই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। অথচ ঘটনার পিছনের খবর আমাদের অজানাই থেকে যায়।

শেয়ার করুন:
  • 288
  •  
  •  
  •  
  •  
    288
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.