বড় বেদনার এই কাল!

সুপ্রীতি ধর:

আমাদের প্রিয় কমলা-জী, কমলা ভাসিন, দক্ষিণ এশিয়ার তথা পুরো বিশ্বেরই অন্যতম নারীবাদী একজন নেতার প্রস্থান ঘটলো গতকাল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। এইতো কিছুদিন আগেই বন্ধুরা জানালো যে উনার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। যাবেন, সে তো জানাই ছিল, তাই বলে এতো দ্রুত? গতকাল খবরটি শোনার পর থেকে এই বেদনার কাল অসহ্য ঠেকছে, কী করলে, কোথায় গেলে, কার সাথে কথা বললে একটু শান্তি পাবো, জানি না।

প্যারিসে ঘুরতে এসে পরিকল্পনামতো সারাদিনই ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু সারাক্ষণ মনের মধ্যে কী একটা নাই, কেউ একজন নাই, এই নি:সঙ্গতা আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে। ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে হোটেল রুমে ফিরেও মন থেকে সরাতে পারছিলাম না কমলা ভাসিনের থাকা, না থাকার পৃথিবীটা আসলে কেমন লাগবে আমাদের! উনি যেমন আমাদের মেয়েদের ভয়েস রেইজ করার কথা বলতেন, চিৎকার করে নিজেদের অধিকারের কথা জানান দিতে বলতেন, তেমনি করে আজ যদি একটু চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম একান্ত পরম বন্ধুদের গলা জড়িয়ে ধরে, তবে হয়তো আপনজন বিচ্ছেদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতো। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে বসে এমন একটি শোক সময় পার করার বেদনা খুব বেশি করে বাজে। আমি ও আমরা পার করছি সেইরকমই একটি সময়।

কমলার সাথে আমার পরিচয় প্রশিকায় চাকরি করতে গিয়ে। ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে মানিকগঞ্জের কৈট্টায় ১৪ দিনের এডভোকেসি ট্রেনিংয়ে উনার দুইটা সেশন ছিল। সেই দুটি সেশন আমার সামনে নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তারপর কতবার যে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, সবাই মিলে আড্ডা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। এই তো কিছুদিন আগেই যখন আমাদের আরেক প্রিয়জন নার্গিস জাহান বানু, আমার প্রিয় নার্গিস আপা যখন চলে গেলেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে, যাকে কমলাজী সুন্দরী বলে ডাকতেন, সেই তাঁর স্মরণে আয়োজিত অনলাইন সভায় দেখা হলো, কথা হলো। এইসব একেকজন মানুষের প্রস্থান আমরা যারা নারীবাদী আন্দোলনে মাঠে আছি, আমাদের ভীষণ একা করে দিচ্ছে। সেই যখন প্রথম দেখেছিলাম কমলাজীকে, আমার নারীসত্তা নতুন করে আবিষ্কার হয়েছিল অধিকারের মাপকাঠিতে। আমার মনে পড়ছে না কমলাজীর আগে আমি ‘নারীবাদ’ বিষয়টা অতোটা গভীরভাবে ভাবতাম। জীবনের পরতে পরতে যতটুকু শিখেছিলাম তাই ছিল শিক্ষা। আর হ্যাঁ, নারী অধিকার সংক্রান্ত অসংখ্য বক্তৃতা আমি শুনেছি, লেখা পড়েছি পত্রিকা বা বইয়ের পাতায়, বিশেষ করে বেগম রোকেয়া এবং তসলিমা নাসরিনের লেখায় তো অবশ্যই চিনেছি নিজেকে, সেগুলো ছিল লেখার অক্ষরে। পরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে যাই, তখন নারী অধিকারটুকু অনুভব করেছি পুরো সমাজব্যবস্থায়, এ একে অন্যরকম জীবনব্যবস্থা তা বুঝতে শিখেছি, কিন্তু কমলাজী যখন জলজ্যান্ত একজন মানুষ আমার সামনে দাঁড়িয়ে এতো সহজ ভাষায় সেশন দুটি নিয়েছিলেন তখন প্রচণ্ড এক শক্তি যেন আমার ভিতরে জাগ্রত হয়েছিল। তারপরও অনেক বছর লেগেছিল নিজেকে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে ছাড়িয়ে আনতে। এখনও যখন অনেক প্রশ্নের উত্তর পাই না, তখন এই মানুষগুলোই তো পরম শিক্ষক।

নারীবাদ সংক্রান্ত তেমন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বই আমার পড়া হয়নি, কিন্তু এক কমলা ভাসিনই ছিলেন সমস্ত বইয়ের এক অসামান্য কমপাইলেশন। তাঁকে জানলে, তাঁর কথা শুনলে, তাঁকে পড়তে পারলে আরও অনেক বই না পড়লেও চলে, এটা আমার একান্ত মতামত। একজন দক্ষিণ এশিয় নারী হিসেবে আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জীবনের প্রতি সবাইকে একসূত্রে গেথে দেয়। তাঁর কথা, তাঁর বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, প্রাণবন্ত উপস্থিতি, এসবই তাঁকে একান্তই নিজের করে তোলে। তাই তাঁর প্রস্থান বড্ড বেশি বাজছে মনে।

মানুষ তো যাবেই, সবাই আমরা যাবো একদিন, কিন্তু এই থাকার বেলাটুকু কে, কতোটা কার্যকরি করে তুলতে পারছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল থেকে আমার বন্ধুদের একের পর এক পোস্ট আমাকে আরও ভেঙেচুরে দিচ্ছে। কেউ চলে গেলে আমরা যে বলি, এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল তাঁর মৃত্যুতে, এটা একদম শতভাগ সত্যি কমলা ভাসিনের ক্ষেত্রে। আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় নারী জীবন মাত্রই এক পা দু পা করে এগোচ্ছিল, আবার পিছিয়েও যাচ্ছিল পুরুষতান্ত্রিকতার নিষ্পেষণে, তখন এসব কণ্ঠ আরও অনেক বছর উচ্চকিত থাকার দরকার ছিল, যাতে করে আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। অন্তত পরাজিত যেন না হই সেজন্যও কমলাজীকে আমাদের অনেক প্রয়োজন ছিল।

আর সে কারণেই বিদায় বলবো না কমলাজী। তোমার বিদায় হয় না। আমাদের প্রতিটা কর্মে, পথচলায় তুমি ছিলে, তুমি থাকবে। তোমার অবর্তমানে তুমি আরও বেশি করে উপস্থিত থাকবে আমাদের জীবনে। এটুকুই তোমার প্রতি ভালবাসা।

শেষে রবী ঠাকুরের দ্বারস্থ হয়ে বলি,
“আছে দুঃখ আছে মৃত্যু, বিরহবেদন লাগে! তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে!!”

উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে তোমাকে স্যালুট কমলাজী, প্রিয় কমলা ভাসিন। তোমার মৃত্যু নেই, তোমার ক্ষয় নেই, তুমি অবিনাশী। আমরা লাখো সৈনিক রয়ে গেছি তোমারই রথটুকু টেনে নিতে।

শেয়ার করুন:
  • 95
  •  
  •  
  •  
  •  
    95
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.