একজন ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ ছিলেন কমলা ভাসিন

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

না, কমলা ভাসিন আনুষ্ঠানিকভাবে একজন কম্যুনিস্ট ছিলেন না বটে, কিন্তু তার লড়াইটা চূড়ান্ত বিচারে কম্যুনিস্টদের সংগ্রামের সাথেই এসে মিলে যাওয়ার কথা ছিল। একজন কবি ছিলেন কমলা ভাসিন, ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আমরা ওঁকে নারীবাদী বলি বটে- কেননা তিনি দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী নেটওয়ার্ক সাংগাতের পুরোধা ছিলেন, ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং আন্দোলনের নেতা ছিলেন, মেয়েদের জন্যে নারীবাদী তত্ত্ব ও কর্মপদ্ধতির ওয়ার্কশপ করতেন, নারী অধিকার নিয়ে বক্তৃতা করতেন, নেচে-গেয়ে নারী অধিকারের শ্লোগানে গগন বিদীর্ণ করতেন, তাঁকে নারীবাদী বলবেন না তো কী বলবেন? তবুও আমি ঐ কথাটাই বলবো, কমলা ভাসিন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই ছিলেন। নারীদের রোজকার যেসব অভিযোগ অনুযোগ- হোক সে যৌতুকের জন্যে নারীর উপর অত্যাচার বা শৈশব থেকে শুরু করে সারা জীবন যৌন নির্যাতন বা যৌন হয়রানি বা সকল প্রকার অত্যাচার নির্যাতন এই সবকিছু থেকে মুক্তিকে তিনি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার দাবি হিসাবে। তিনি জেনেছিলেন এবং সবাইকে জানিয়েছিলেন যে নারীর অধিকারের দাবি আসলে স্বাধীনতার দাবি।

ভারতীয় অনেক ভাষায়ই স্বাধীনতার প্রতিশব্দ হচ্ছে আজাদি। অন্য ভাষা থেকে এলে বাংলায়ও আজাদি শব্দটা অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলতে পারি। এই আজাদি শব্দ ও আজাদি শ্লোগান নিয়ে গত কয়েক বছরে ভারতে কিরকম তুলকালাম কাণ্ডটাই না হয়ে চলেছে। জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কম্যুনিস্টদের আজাদি শ্লোগান কী হল্লাই না তুলেছিল ভারতবর্ষ জুড়ে। আজাদি কথাটার এইরকম ব্যবহারের সাথে কমলা ভাসিনের কাজ ও পরিচয়ের একটা সংযোগ আছে। ১৯৯১ সনের কথা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উইম্যান স্টাডিজ সংক্রান্ত একটা সম্মেলনে দেখা গেল বছর চল্লিশেক বয়সের একজন নারী ছোট একটা ঢোল বাজাতে বাজাতে ‘আজাদি’ শ্লোগান দিচ্ছেন- পেট্রিয়ার্কি থেকে চাই- আজাদি, হায়ারারকি থেকে চাই- আজাদি ইত্যাদি। ঐ নারীটি ছিলেন আমাদের কমলা ভাসিন। আপনারা যারা কমলা ভাসিনকে সামনে থেকে দেখেছেন, বা ওর কোন কর্মসূচির সাথে যুক্ত ছিলেন বা ওর সাথে কোন না কোনোভাবে কাজ করেছেন আপনারা নিশ্চয়ই আজাদি নিয়ে কমলা ভাসিনের কবিতা আর শ্লোগান আর গান শুনেছেন, হয়তো আজাদির সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছেন, আজাদির সাথে নেচেছেন।

আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন কমলা ভাসিন যে এইভাবে গাইতেন, শ্লোগান দিতেন আজাদি নিয়ে, সেইখানে কিন্তু নারীর মুক্তি নিয়ে বা নারীবাদ নিয়ে সকল তত্ত্বের একটা সরল সংক্ষিপ্ত তিন শব্দের রূপ চলে আসতো।

কমলা ভাসিনের সেই আজাদি শ্লোগান আর এটা নিয়ে ওর কবিতা এগুলি কেন এরকম সর্বব্যাপী এবং সর্বজনগ্রাহ্য হয়? কেন দিল্লীর ছাত্র কম্যুনিস্টরা একজন অকম্যুনিস্ট কমলা ভাসিনের শ্লোগান নিয়ে গোটা ভারত তোলপাড় করে ফেললো? এই কথাটা বলার আগে এই শ্লোগানের উৎস বলে নিই, সেইসাথে কমলা ভাসিনের জীবনের কয়েকটি অধ্যায়।

রাজস্থানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে এমএ পাশ করে কিছুদিন কৃষি সংক্রান্ত সংস্থায় কাজ করেছেন কমলা। এরপর তিনি যোগ দেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায়। জাতিসংঘে কাজ করার সুবাদে তাঁকে বাংলাদেশে থাকতে হয়েছিল কিছুদিন। সেসময় তিনি আমাদের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণস্বাস্থ্য এদের সাথে কাজ করেছেন। ডা. জাফরুল্লাহ ও গণস্বাস্থ্য তাঁকে অনেকখানি প্রভাবিত করেছিল। এর কিছুদিন পর ১৯৮০ কী ৮১ সনে কমলা ভাসিন গেলেন পাকিস্তানে। আপনাদের মনে থাকবে হয়তো পাকিস্তানে সেসময় জেনারেল জিয়াউর হকের অধীনে সামরিক শাসন চলছিল আর পাকিস্তানের আইন কানুনের আরও বেশি বেশি ইসলামিকরণও চলছিল সেই সময়ে। পাকিস্তানে কমলা ভাসিন আজাদি শ্লোগানটা শোনেন পাকিস্তানের নারীদের মিছিলে। বলে রাখি, পাকিস্তানের সামরিক শাসন এবং ইসলামিকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রথম জোয়ারটা এসেছিল নারীদের দিক থেকেই। পাকিস্তানের নারীদের এই আজাদি শ্লোগান- আওরাত কী নারা- আজাদি, বাচ্চো কী নারা- আজাদি, হাম লেকে রাহেঙ্গে- আজাদি, হায় পেয়ারা নারা- আজাদি ইত্যাদি- এই শ্লোগান কমলা ভাসিনকে খুব অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তার আজাদি শ্লোগান, আজাদি কবিতা।

আর অনুপ্রাণিত করবেই না বা কেন? শেষপর্যন্ত তো আমরা সকলেই স্বাধীনতাই চাই। একজন কম্যুনিস্ট বা একজন সমাজতন্ত্রী নারীবাদী বা একজন রেডিক্যাল বা আদিবাসী নারীবাদী আমরা কী চাই? আমরা চাই শোষণ থেকে মুক্তি, বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্তি। চাই যে সমাজের প্রতিটা মানুষ সমান মর্যাদা নিয়ে মানুষ হিসাবে পৃথিবীতে বসবাস করবে। সকলেই সমাজের বিকাশে অবদান রাখবে আর সকলেই তার নিজের নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করতে পারবে। এই চাওয়াটাই আমরা সকলে নানা কায়দায় অর্জনের চেষ্টা করি- কিন্তু চাই তো মুক্তিই, নাকি? আপনি আপনি যদি বৈষম্য, শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্তির কথা বলেন তাইলে সেটা তো আজাদিই চাওয়া হলো।

আজাদি কী? রুশোর সেই কথাটা আপনারা সকলেই জানেন, মানুষমাত্রই স্বাধীন হয়ে জন্ম নেয়, কিন্তু জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সে কোন না কোনোভাবে শৃঙ্খলিত। রুশো কথাটা বলেছিলেন রাষ্ট্রের উৎপত্তি প্রশ্নে সামাজিক চুক্তি মতবাদের কথা বলতে গিয়ে। রাষ্ট্রের উৎপত্তির সাথে মানুষের শৃঙ্খলিত হওয়ার সম্পর্কটা কী? রুশো এবং অন্যান্য পশ্চিমা দার্শনিকেরা যখন সামাজিক চুক্তির কথা বলেন, সেই কথাটার অর্থ হচ্ছে সভ্যতার বিকাশের একটা পর্যায়ে এসে একেকটা সমাজ নিজেরদের মধ্যে একটা চুক্তিতে পৌঁছেছে, যে নাগরিকেরা সবাই একটি কর্তৃত্বের হাতে শাসনভাবের তুলে দেয়। কী শর্তে? যে ঐ কর্তৃপক্ষ, হোক সে রাজা বা সরকার, সে সমাজের শৃঙ্খলা ইত্যাদি বজায় রাখবে আর বিনিময়ে নাগরিকরা ওদের স্বাধীনতার কিছু অংশ সমর্পণ করবে সেই কর্তৃপক্ষের হাতে। পশ্চিমা এইসব দার্শনিকদের অনেক আগে, খ্রিস্টের জন্মেরও ছয়শ বছর আগে গৌতম বুদ্ধের জন্ম (কেউ কেউ বলেন তিনশ বছর আগে), সেই বুদ্ধ রাষ্ট্রের উৎপত্তি প্রসঙ্গে বলেছেন মহাসম্মতির কথা। মহাসম্মতি কী? যখন সমাজে তণ্ডুল বা খাদ্যশস্য উৎপাদন পর্যাপ্ত বা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়, তখন সমাজে নানারকম বিশৃঙ্খলা হতে থাকে। তখন নাগরিকরা ওদের মধ্যে উত্তম একজনকে নির্বাচন করে তার হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে- যে ঐ উত্তম ব্যক্তি দুষ্টের দমন করবেন, সকলকে রক্ষা করবেন, বিনিময়ে নাগরিকরা তাঁকে উদ্বৃত্ত তণ্ডুল থেকে একটা অংশ তাঁকে প্রদান করবে।

আর মার্ক্সিয় ব্যাখ্যায় রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে কীভাবে? আদিম সাম্যবাদী সমাজ ভেঙে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব হয়, তখন শ্রম বিভাজনের সরল ধরনটা পাল্টে যায়। সেই সাথে পাল্টে যায় পরিবারের ধরনটাও। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধিকারের জন্যে এবং অধিক উৎপাদন ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন হয় সন্তান। এইজন্যেই নারী ও পুরুষ মিলে পরিবার গঠনের ধারণা শুরু হয়- কেননা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে হলে তাঁকে নিশ্চিত করে পুরুষটির সন্তান হওয়া প্রয়োজন। সেই থেকে শুরু পিতৃতন্ত্র আর এই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৈষম্য ইত্যাদি মিলিয়ে একটা সমাজ কাঠামো তৈরি হলো সেই কাঠামোটা ধরে রাখার জন্যে প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রের।

তাইলে দেখেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তি, পিতৃতন্ত্রের উৎপত্তি আর রাষ্ট্রের উৎপত্তি এইগুলি একই সুতোয় গাথা। এবং এই সবকিছুরই একটা অনিবার্য অনুষঙ্গ হচ্ছে যে নাগরিকরা আর সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকতে পারলো না, ওদের নিজেদের সার্বভৌমত্বের একটা অংশ সমর্পিত হয় রাষ্ট্র বা সরকার বা রাজার হাতে। এখন মানুষের মধ্যে সকল বৈষম্য যদি আপনি চূড়ান্তভাবে দূর করতে চান, তাইলে আপনাকে পিতৃতন্ত্র ভাঙতে হবে, রাষ্ট্র ভাঙতে হবে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ করতে হবে। এইটাই হবে আধুনিক সাম্যবাদী সমাজ। এই সমাজ আপনি চট করে কল্পনা করতে পারবেন না, কেননা আমরা সেরকম দেখতে অভ্যস্ত নয়- অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের সংস্কৃতি চেতনাও ঐভাবে পাল্টে গেছে। ফলে এখন আমাদের কাছে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক সমাজই সাধারণ মনে হয়। মানুষের তাইলে কী চাই? মানুষের চাই আজাদি- আর আজাদিটা আপনি পাবেন না যদি না আপনি পিতৃতন্ত্র ভাঙতে পারেন এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভাঙতে পারেন।

এইই হচ্ছে আজাদি। কমলা ভাসিন নিজেকে বলতেন, প্রাপ্ত প্রশিক্ষণের বিবেচনায় আমি একজন সমাজতাত্ত্বিক, কথাটা তিনি বলতেন ইংরেজিতে by training I am a sociologist এইভাবে। এবং সত্যিই প্রকৃত একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেই তিনি মেলাতে পেরেছিলেন যে পিতৃতন্ত্র থেকে মুক্ত না হলে নারীর আবার কীসের আজাদি? আর ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাষ্ট্র ইত্যাদি না ভেঙে আলাদা করে তো পিতৃতন্ত্র উৎখাত করা যাবে না। এইভাবে কমলা ভাসিনের কথায় গানে শ্লোগানে নৃত্যে চিৎকারে ঘুরে ফিরে আসতো ঐ কথাটাই- আজাদি।

না, বক্তৃতায় বা কর্মশালায় তাঁকে নারীর প্রতিদিনের সংগ্রামের কথাই বেশি আলোচনা করতে হতো। সেইটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আপনারা যাকে বক্তৃতা করতে শুনেছেন, শ্লোগান দিতে দেখেছেন, গাইতে দেখেছে, ওর সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছেন, নেচেছেন- আপনারা মনে করে দেখুন ‘আজাদি’ এই কথাটিই কি তার সকল কথা ও কাজের মূলসূত্র ছিল না?

কমলা ভাসিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন গতকাল। তিনি কম্যুনিস্ট ছিলেন না। নারীবাদী থিওরির হিসাবে তাঁকে মোটামুটিভাবে সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী হিসাবেই চিহ্নিত করতো সকলে। অনেক খবরের কাগজ ও সংবাদ গণমাধ্যম তাঁকে লেখক হিসাবে উল্লেখ করে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেছে। আমার কাছে তিনি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবেন সারাজীবন- কেননা তিনি লিখেছেন আজাদির কথা, বলেছেন আজাদি, গেয়েছেন আজাদি, নেচেছেন আজাদি, হেসেছেন আজাদি, চিৎকার করেছেন আজাদি বলে।

আপনি আমাদের সাথে সবসময়ই থাকবেন কমলা ভাসিন- আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, আ সোশিওলজিস্ট বাই ট্রেইনিং। আপনি আমাদের প্রতিটা আজাদির শ্লোগানে, গানে আর নৃত্যে চিৎকারে উপস্থিত থাকবেন।

শেয়ার করুন:
  • 162
  •  
  •  
  •  
  •  
    162
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.