ট্রিবিউট টু কমলা ভাসিন

ফারদিন ফেরদৌস:

সমতার সমাজ গড়ার প্রবক্তা,
জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, খ্যাতিমান জেন্ডার প্রশিক্ষক, উন্নয়ন কর্মী, কবি, লেখক এবং সমাজ বিজ্ঞানী কমলা ভাসিন অনন্ত মহাকালে তাঁর নাম লেখালেন।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি এই মহান মানুষটির প্রতি।
নারীর প্রতি সহিংসতাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে এই অবস্থার পরিবর্তনে ভয়মুক্ত হয়ে নিজেদের বদলে ফেলার আহ্বান জানিয়ে গেলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত নারী অধিকার নেত্রী কমলা ভাসিন।
কমলা ভাসিন তাঁর বক্তৃতায় বলতেন, ‘তোমার-আমার ব্যক্তিগত জীবন না বদলালে পিতৃতন্ত্র যাবে না। সুতরাং আমি নিজের দিকে আঙুল রাখছি, তোমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিজের দিকে আঙুল রাখো।’
১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া কমলা বড় হয়েছেন ভারতের রাজস্থানে। রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জেন্ডার সমতা, মানবাধিকার, শান্তি প্রতিষ্ঠাসহ বেশিকিছু বিষয় নিয়ে তার শক্তিশালী লেখালেখি আছে। তিনি নিজেকে একজন গীতিকার হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। বিভিন্ন গণআন্দোলনের সময় তিনি গান লিখেছেন। শিশুদের জন্য, নারীদের হয়ে নানা সময় তিনি কবিতা লিখেছেন। নিজের সম্পর্কে যার মূল্যায়ন ছিল: আমি একজন নারীবাদী, আমি একজন মানবাধিকার কর্মী, আমি একজন কবি, সমাজসচেতন মানুষ, আমি কমলা।
তিনি নারী বা প্রতিবাদকারীকে ভিকটিম হিসেবে নয়, একজন সারভাইবারস হিসেবে দেখতেন।
নারীর জন্য চারপাশের বন্ধ দুয়ার খুলতে ওই নারীকেই অগ্রগণ্য হতে হবে এমনটাই মনে করতেন।
কমলা বলতেন, সারা পৃথিবী জুড়েই নারীর ওপর সহিংসতা চলছে। মূলত পুরুষদেরকেই এজন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু আমি কখনোই বিশ্বাস করি না যে একজন পুরুষ নিপীড়ক বা সহিংস হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এই সমাজ ব্যবস্থা একজন নিপীড়ক তৈরি করে। তাই আজকের দিনে সমতার সমাজের জন্য সংগ্রাম একই সঙ্গে নারী ও পুরুষের যৌথ সংগ্রাম।
কেবলমাত্র পুরুষের চোখ দিয়ে বিশ্ব দেখবার দিন শেষ | নারী বা পুরুষ নয় কেবল, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে সবকিছু জাজ করবার মন্ত্রণাই আমৃত্যু দিয়ে গেলেন কমলা ভাসিন |
হাজার বছরের লালিত পিতৃতন্ত্রকে বুঝতে হবে কেউ স্বচ্ছায় অবলা নারী হয়ে জন্মায় না | পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার আত্মস্বার্থে নারীকে দুর্বল আখ্যা দেয় এবং গৃহশোভার অবজেক্ট মনে করে রমণী সাজিয়ে রাখে |
কোথাও না কোথাও এমন একপেশে দিন বদলের জন্য কমলা ভাসিনের মতো মানুষকে কথা বলে যেতে হচ্ছে | আমরাও তেমনটা বলে চলেছি | মানুষের ঐকতানে পৃথিবী হোক সুন্দর ও সুষমামন্ডিত |
কমলা ভাসিন
আপনি সসম্মানে রয়ে গেলেন
আমাদের অন্তরে |
আপনার রচিত এই শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আরেকবার স্মরণ করছি |
কিঁউকি ম্যায় লডকি হুঁ, মুঝে পঢ়না হ্যায়। Because I am a girl, I must study. আমাকে অবশ্যই পড়তে হবে, কারণ আমি একজন মেয়ে
একজন বাবা তার মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন:
পড়াশোনা? কেন পড়াশোনা করা উচিত?
আমার অনেক ছেলে আছে যারা পড়াশোনা করতে পারে।
মেয়ে, তুমি কেন পড়াশোনা করবে?
আমার স্বপ্ন উড়ানোর জন্য, আমার অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে
জ্ঞান নতুন আলো নিয়ে আসে, তাই আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে, আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, কারণ আমি একটি মেয়ে।
পুরুষদের সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
আমার নীরবতা দূর করার জন্য, আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
সমস্ত শ্রেণিবিন্যাস ধ্বংস করতে, আমাকে অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে
আমি একজন মেয়ে, আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে।
আমি বিশ্বাস করতে পারি এমন বিশ্বাস তৈরি করার জন্য, আমাকে অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে
নতুন আইনের ন্যায়সঙ্গত পথ দেখাতে আমাকে অধ্যয়ন করতে হবে
শতাব্দীর ধুলো ঝেড়ে ফেলতে, আমাকে অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে আমি যা চাই তা পেতে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য, আমাকে অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে
আমি একটি মেয়ে, আমাকে অবশ্যই অধ্যয়ন করতে হবে।
ভুল থেকে সঠিক জানতে আমাকে পড়াশোনা করতে হবে।  একটি প্রতিবাদী কণ্ঠ খুঁজে পেতে, আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
নারীবাদী গান লিখতে হলে আমাকে পড়াশোনা করতে হবে
যেখানে মেয়েরা মানানসই এমন একটি পৃথিবী তৈরি করতে আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে
কারণ আমি একজন মেয়ে, আমাকে অবশ্যই জ্ঞানচর্চা করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

শেয়ার করুন:
  • 109
  •  
  •  
  •  
  •  
    109
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.