সুখে থাকার দায়

নাজনীন পারভীন:

কফিনের শেষ পেরেকটা পোঁতা হয়ে গেলো কিছুক্ষণ আগে। এবার কফিনকে শুধুমাত্র মাটিতে নামানোর অপেক্ষা। তারপর মাটি চাপা দেয়া। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের সম্পর্কের অবসান হলো। না কি এখনও কিছু বাকি রয়ে গেল?  আগে একটা সম্পর্ক শীতল হলো। ধীরে ধীরে কফিনে একটা একটা করে পেরেক পোঁতা হলো । তারই ধারাবাহিকতায় আজ শেষ পেরেক পুঁতে শেষ হলো একটি জীবনের অধ্যায়।

রেবেকা সুলতানা, পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি লম্বা, দুধে আলতা গায়ের রঙের হালকা গড়নের একজন নারী। কাজ করেন একটা নামকরা প্রাইভেট কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপ্যাল হিসাবে। রক্তাক্ত একাত্তরে জন্ম নেয়া রেবেকা দেশের মতো অর্ধশত জন্মবার্ষিকী পালন করবে। দেশের জন্মের অর্ধশত বছর পালনের উৎসবে গৌরব বোধ করলেও নিজের জন্য মনটা খারাপ লাগলো। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তো পার করে এসেছে রেবেকা। কতকিছুই তো করার পরিকল্পনা ছিল।
সেসব স্বপ্ন পূরণ করার সময় পাবে তো?
জীবন এতো অল্পতেই শেষ হয়ে যায়?

রায়হান ইসলাম রেবেকার স্বামী, দেশের স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানির ম্যানেজার। অফিসের গাড়ি, মাসে মাসে বিদেশ ট্যুর, মোটা অঙকের বেতন সব মিলিয়ে এলাহি ব্যাপার। পঁচিশ বছর আগে দুই কামরার ছোট ভাড়া বাসায় যখন সংসার শুরু করে ছিল, তাদের সম্বল বলতে ছিল ঢাকা কলেজের সামনে থেকে কেনা একটা খাট আর ছোট একটা ফ্রিজ। সময়ের সাথে সব বদলে গেছে। দুই কামরার ছোট ভাড়া বাসার জায়গায় গুলশানে তিন হাজার স্কয়ার ফিটের নিজস্ব বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতেই তুরস্ক থেকে আনা তুলোর মতো নরম কার্পেট, পুরোনো সব ফার্নিচারের জায়গায় বসে গেছে দেশের বাইরে থেকে আনা ফার্নিচার। বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় স্থান পেয়েছে বিভিন্ন দেশের দুর্লভ পেইন্টিং আর শোপিস। হাজারখানেক বইসমৃদ্ধ নিজস্ব লাইব্রেরি। বাড়ির পরতে পরতে আভিজাত্যের ছাপ। একমাত্র সন্তান রাহাত ইউনিভার্সিটি অফ ম্যালেতে পড়াশনা করে। সব মিলিয়ে এ যেন এক ভূ স্বর্গ যা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার কাছে অনুকরণীয় ও একই সাথে ঈর্ষণীয়। বৃদ্ধা শাশুড়ি, তার জন্য একজন সহযোগী নিয়ে এই বাড়িতে মোট চারজনের বসবাস। রায়হানকে অবশ্য মেহমানও বলা যেতে পারে। কারণ কাজের কারণে তাকে মাসে সাত-দশ দিন বাড়ির বাইরে কাটাতে হয়, কখনও দেশের ভেতর, কখনও বাাইরে।

রেবেকার সময় কাটে লাগামহীন ঘোড়ার মতো। সকালে শাশুড়ি, স্বামী ও নিজের নাস্তা রেডি করা, নিজের দুপুরের খাবার প্যাক করে সকাল আটটার আগে কলেজে পৌঁছানো। কলেজে সকাল আটটায় এসেম্বলি হয়। এরপর আটটা পনেরো থেকে ক্লাস শুরু। দিনে দুটো ক্লাস, কিছু প্রশাসনিক কাজ শেষ করে বিকেল চারটায় বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়া। বাড়ি পৌঁছাতে কখনও পাঁচটা, কখনো বা জ্যামের বদৌলতে আরো পরে। শীতকালটা বেশি খারাপ লাগে, মনে হয় ভোরে কলেজের জন্য রওনা দেয় আর বাড়ি পৌঁছানোর আগেই সূর্য প্রতিযোগিতা করে তার আগে চলে যায়। সন্ধ্যাটা রেবেকা নিজের ঘরে কাটাতে চায়। ওর বেডরুমের পশ্চিম দিকের দেয়ালটা থাই গ্লাস দিয়ে তৈরি। যেটা সে ভারী পর্দা দিয়ে রেখেছে। পর্দাটা সরালেই গুলশান লেক দেখতে পাওয়া যায়। সূর্য ডোবার সময় যে আলো- আঁধারী আর নানা বর্ণের খেলা চলে তা মুগ্ধ করে রেবেকাকে। সারাদিনের কাজ শেষে গোছল করে এক কাপ চা নিয়ে কখনও বিছানায় হেলান দিয়ে, কখনওবা বারান্দার টি টেবিলে বসে উপভোগ করে সূর্যের লুকোচুরি আর রাতের আঁধারে দিনের হারিয়ে যাওয়া। কতদিন ধরে সে এই দৃশ্য দেখছে, কিন্তু ভালোলাগা একটুও কমেনি। তবে আগের মতো জামা-কাপড় বা সাজে থাকে না ঋতুর আবহ। যা কিছু হাতের কাছ পায় তাই তুলে নেয় পরার জন্য। ইচ্ছেগুলো ধূসর হতে হতে মরে যাচ্ছে, জমে যাচ্ছে স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলা। আজকাল বেশিরভাগ দিন বিছানায় হেলান দিয়ে চা নিয়ে বসে। চেয়ারে বসাটাকে পরিশ্রমের মনে হয়। মনে হচ্ছে লাগামহীন দৌড়ে রাশ টানতে হবে। শরীর তাকে সংকেত দিচ্ছে বয়স হচ্ছে, ধীরে বৎস ধীরে।

এরপর আবার শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। রাতের রান্না, পরের দিন দুপুরের রান্না। সেসব শেষ করে শাশুড়ির সাথে বাংলা সিরিয়াল দেখা। মূলত তার সাথে সময় কাটানো। সারাদিন কী কী হলো, কাজের মেয়েটা তার সাথে কী কী করলো, কোন কথাটা শুনলো না এইসব আরকি। সবকিছু খুব মন দিয়ে শুনে রেবেকা, মাঝে মাঝে মেয়েটাকে বকা দেয় শাশুড়ির সামনে তার মন রাখার জন্য। আর ভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে তাকেও অপেক্ষা করে থাকতে হবে কে কখন কথা বলতে আসবে তার জন্য। বয়স্ক মানুষকে সময় দেবার সময় কোথায় কারও কাছে! রেবেকার শাশুড়ির তো তাও রেবেকা আছে, রেবেকার কেউ থাকবে তো? তার ছেলে যদি বাইরে সেটেল করে, তাহলে?

মাসের খরচের টাকা একবারে দিয়ে দেয় রায়হান। এরপর ড্রাইভারের বেতন, কাজের মেয়ের বেতন, নানা ধরনের বিল, মাসের বাজার, কাঁচা-বাজার সব রেবেকার দায়িত্ব। ওষুধ কোম্পানির ছোট চাকরি দিয়ে ক্যরিয়ার শুরু করেছিল রায়হান। তখন মাঝে মাঝে বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে যেত। তবু কাজের ফাঁকে সময় পেলে বিকেলের চা একসাখে খেত। বেশিরভাগ দিন রায়হান চা বানাতো। রেবেকার সাজে থাকতো ঋতুর ছোঁয়া, সে চেষ্টা করতো যা কিছু আছে তা দিয়ে নিজেকে বর্ণিল করে উপস্থাপন করতে। রেবেকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো আর তখন রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো টুং-টাং আওয়াজ। এরপর পাওয়া যেত গরুর দুধে চা পড়ার পর সৃষ্ট অসম্ভব মিষ্টি একটা ঘ্রাণ। কিছুক্ষণের মধ্যে রায়হান চলে আসতো চা আর টোস্ট নিয়ে। ওদের বারান্দায় বসার কিছু ছিল না। ওরা দাঁড়িয়ে চায়ে ভিজিয়ে টোস্ট খেত। সেই স্বাদ অমৃতের মতো এখনও মুখে লেগে আছে। এখন বিকেলের নাস্তায় কত পদের খাবার থাকে। তবু রেবেকা সেই চা আর টোস্ট মিস করে।
নাকি চায়ের সাথে রায়হানকে?

কালের চাকা ঘুরতে থাকে প্রকৃতির নিয়মে। রায়হান তড়তড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে। ব্যাস্ততা বাড়তে থাকে রায়হানের। রেবেকা রায়হানের কাজের জায়গায় কোন বিঘ্ন না ঘটুক এই চিন্তায় একে একে সংসারের সব ভার নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। রেবেকার নিজের ক্যারিয়ারও তো থেমে থাকেনি। লেকচারার থেকে এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ভাইস প্রিন্সিপ্যাল। তবু একহাতে সবকিছু সামলে নিয়েছে রেবেকো। রাহাতের স্কুল, টিউটর, প্যারেন্টস মিটিং, এরপর কলেজ, সব কিছু। কখনও ক্লান্তি আসেনি। তবে আজকাল মাঝে মাঝে বেশ ক্লান্ত লাগে। রায়হানকে বললে ও কোন উত্তর করে না, শুনছে কিনা তাও বোঝা যায় না।

কয়েকদিন ধরে শরীরটা রেশ খারাপ লাগছে। প্রচণ্ড পানি পিপাসা লাগে, মাঝে মাঝে মাথাটা ঘুরে উঠে। একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে বন্ধুর চেম্বার হয়ে আসে।ওর বন্ধু সুগার টেস্ট, ই.সি.জি আর কিছু হরমোন টেস্ট করে তার সাথে দেখা করতে বলে। পরের দিন ছিল শুক্রবার। রেবেকা রাযেহানকে বলে,
কাল সকালে আমার সাথে যাবে? কিছু টেস্ট করতে দিয়েছে ডাক্তার।
দেখি কী করতে দিয়েছে? দেখে বললো, এগুলো খুব সহজ কিছু টেস্ট, আমি জানি তুমি নিজে নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে। আমি একটু শান্তি করে ঘুমাতে চাই ছুটির দিনে।
পরদিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কছের ল্যাবএইডে গেল রেবেকা। মানি রিসিট কেটে পরীক্ষাগুলোর জন্য সিরিয়ালে বসে রইলো। হঠাৎ খেয়াল করলো রেবেকা শুধু একা বসে আছে, আর বাকি সবার সাথে কেউ না কেউ আছে।
মনটা খারাপ হতে শুরু করলো।
কেন তা নিজেও জানে না।

রেবেকা তো তার নিজের কাজ নিজেই করেছে সবসময়। কখনও তো একা লাগেনি। এমনকি রাহাত হবার সময়ও তো নিজে নিজে হাসপাতালে এসেছিল। রায়হান হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নতুন অতিথির আবির্ভাব হয়েছিল মর্তে। তখনও তো এমন একা লাগেনি!
তবে আজ লাগছে কেন? এতোটা একা আর অসহায়!

নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলো, কী আর হবে, বড় জোর ডায়াবেটিস ধরা পড়বে। এটা তো রেবেকার অজানা কিছু নয়। এটা তো পাবারই কথা পারিবারিক উপহার হিসেবে। টেস্ট শেষ করে রিপোর্ট যেগুলো পেলো তা নিয়ে বন্ধুর চেম্বারে গেল। রেবেকার আশংকা সত্যি প্রমাণিত করে উত্তরাধিকার সূত্রে ডায়াবেটিস নিয়ে বাড়ি ফিরলো। রেবেকার শাশুড়ি অনেক মন খারাপ করলো বউমার জন্য। কিন্তু রায়হান একবারও জানতে চাইলো না রেবেকার শারীরিক অবস্থা নিয়ে। দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে খেয়ে বিকালে সেজে-গুজে বের হয়ে গেল। রায়হান যে মায়ের প্রতি অনেক দায়িত্ব পালন করে তাও না। কালেভদ্রে মায়ের রুমে গিয়ে বসে অল্প সময়ের জন্য। মা তাতেই যেন অমাবশ্যার চাঁদ হাতে পেয়ে যান।

প্রথম এক সপ্তাহ রেবেকা ঘুমাতে পারলো না ডায়াবেটিস দু:শ্চিন্তায়। চোখের নিচে কালি জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে ডায়াবেটিসের সাথে বন্ধুত্ব করে নিল, যার সাথে বাকি জীবন কাটাতে হবে তাকে দূরে সরিয়ে রেখে লাভ কী! আগে সময় পেলে রাতে হাঁটতে নামতো। এখন রুটিন হলো নিয়মিত আধা ঘন্টা হাঁটা। মুখের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে রেবেকার। কোন খাবার খেতে ভালো লাগে না। একদিন রায়হানকে বললো,
চলো বাইরে থেকে খেয়ে আসি। নিজের রান্না খেতে খেতে অরুচি ধরে গেছে। অনেকদিন দুজনের কোথাও বের হওয়া হয় না। একটা আউটিং হয়ে যাবে।
আজ পারবো না, রেবেকা। তোমার কী খেতে ইচ্ছে করছে বলো, আমি ড্রাইভারকে দিয়ে আনিয়ে দিচ্ছি।
না থাক, তোমার অতো কষ্ট করতে হবে না।

কফিনের প্রথম পেরেক পোঁতা হয়েছিল সেদিন।
দিন যায় আর রেবেকা একটু একটু করে আবিষ্কার করে যে তার জীবনে বা সংসারে রায়হানের উপস্থিতি শুধু আর্থিক বিষয়ে। স্মৃতি হাতড়াতে থাকে, নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে নিঃশ্চয় কোথাও না কোথাও রায়হানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে! অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তাকে কোথাও পাওয়া গেল না। রায়হানের উপস্থিতি তার জীবনে আছে তা প্রমাণ করার জন্য একদিন বললো,
তুমি তো রোজ সন্ধ্যায় বাইরে বের হও, কখনও কলিগদের সাথে ড্রিংস করো, কখনও বন্ধুদের সাথে আড্ডা। ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা। আমার জন্য দুই- একটা সন্ধ্যা রাখতে পারো তো!
রেবেকা আমি একটা জটিল জায়গায় কাজ করি। অনেক দায়িত্ব, অনেক টাকা-পয়সার হিসেব নিকেশ। তাই সন্ধ্যার আড্ডটা আমার জন্য খুব জরুরি। এটা আমার জন্য রিক্রিয়েশন।

সত্যিই তো রায়হানের রিক্রিয়েশন দরকার। রেবেকা তো রায়হানের মত জটিল কোন কাজ করে না। সারাদিনে দুই-একটা ক্লাস, কিছু প্রশাসনিক কাজ, বাজার করা, রান্না করা এ আর এমনকি! ছাত্র-ছাত্রীদের গণ্ডগোল মেটাতে কখনও কখনও থানা পুলিশ পর্যন্ত করতে হয়। এ আর কী কাজ! এই সামান্য কাজের জন্য রিক্রিয়েশন ডিমান্ড করা সত্যিই অনুচিত। নিজেকে দম দেয়া পুতুল মনে হয় রেবেকার। যার যতক্ষণ দম থাকবে সার্ভিস দিয়ে যাবে। কিন্তু কোনকিছু দাবি করবে না। সময়ের সাথে সম্পর্কের মসৃণতাও কমতে থাকে। অনাদরে কোথাও কোথাও জং ধরতে শুরু করে।

নিজের জীবনের রিক্রিয়েশনের জায়গা খোঁজার বৃথা চেষ্টো করে রেবেকা। কতদিন সিনেমা বা নাটক দেখতে যায়নি রেবেকা। বিয়ের আগে কিংবা পরে ওরা মাঝে মাঝে যেত হলে কিংবা থিয়েটারে। ফেরার পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খেত। কিন্তু সেইসব স্মৃতি এতো দূরের যে সময়ের আস্তরণে ঢেকে ধূসর হয়ে গেছে। জীবনের এতগুলো বছর পার হবার পর নিজেকে সম্পূর্ণ একা আবিস্কার করলো রেবেকা।
হয়তো সব সময়ই একা ছিল।
তখন সংসার, বাচ্চা, চাকরি সব মিলিয়ে হিসেব করার সময় মেলেনি।

আজ জীবনের অর্ধশত বছর পার করার পর অংকের হিসাবটা মেলাতে পারছে না। অমিমাংসিত অংক হয়ে থেকে যাচ্ছে।
আগে বিটিভির নাটক কত উৎসাহ নিয়ে দেখতো রেবেকা। আজ শত চ্যানেল, হইচই, নেটফ্লিকস কত অপশন, কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না তার। জীবনের এই সময়টায় হয়তো সঙ্গী থাকাটা খুব জরুরি। দিনের পর দিন রায়হান রাত করে বাড়ি ফেরে। ভেতর থেকে দরজা খুলতে খুলতে এখন বড় ক্লান্ত রেবেকা। ক্লান্তিটা শুধু রাত জাগার নয়, ক্লান্তিটা অপেক্ষার। ক্লান্তিটা সুখে -দু:খে কাউকে না পাওয়ার। ক্লান্তিটা একটু একটু করে সম্পূর্ণরূপে একা হয়ে যাওয়ার।

আপাদমস্তক সুখী মানুষ ছিল রেবেকা। দুজনেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সবার কাছে ঈর্ষণীয় দম্পতি। সুখটা আসলে কী? সব দায়িত্ব পালন করে সব মানিয়ে নেয়া! বিনিময়ে কিছু আশা না করা! নিজের ভালো -মন্দ লাগাকে উপেক্ষা করে নিজের কষ্টগুলোকে গিলে ফেলা। পাশের বাড়ির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেটা কয়েকদিন ধরে একটা গান বাজিয়ে যাচ্ছে।

সুখে থাকো
ও আমার নন্দিনী
হয়ে কারো ঘরণী
জেনে রাখো
প্রাসাদেরও বন্দিনী
প্রেম কভু মরেনি।

এটা জাফর ইকবালের গান হলেও অন্য কোন শিল্পীর গলা। অসম্ভব দরদ দিয়ে গাওয়া। নন্দিনী, ছেলেদের এরকম কষ্ট পাওয়া দেখে ভুলে যেও না। তুমি তোমার প্রেমিকের ঘরণী অথবা অন্য কারো ঘরণী হও না কেন, সারা জীবনই তুমি প্রাসাদের বন্দিনী, আর তোমার সুখে থাকার দায় কেবলই তোমার। অন্য কেউ সেখানে কোন ভূমিকা রাখবে না। এর দায় শুধুই তোমার। আর প্রেম, সে তো বেশিরভাগ সময়ই শুকিয়ে যায় সময়ের খরতাপে।

রেবেকা যে অসুখী নয় তা নিজের কাছে প্রমাণ করতে গিয়ে আরও বেশি এলোমেলো করে ফেলে। প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু নিয়ে রায়হানের সাথে টুকটাক কথা কাটাকাটি হতে শুরু করে। ক্রমে তা বাড়তে থাকে। এরকম একদিন রায়হান খুব ঠাণ্ডা গলায় বলে,
– তোমার যদি মনে হয় তোমার এখানে খুব কষ্টে হচ্ছে, মানিয়ে চলতে অসুবিধা হচ্ছে, অন্য কোথাও গেলে তুমি ভালো থাকবে। গো হোয়ার এভার ইউ ওয়ান্ট। জাস্ট গো এহেড।
জাস্ট গো এহেড।
কফিনের শেষ পেরেকটা পোতা হয়ে গেল।

স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ ছড়ানো শ্যওলা পড়া, মরিচা ধরা স্ক্রু আর অমসৃণ পালিশের ম্লান ধুসর কাঠের কফিনে একটা মাত্র ঠক শব্দের মাধ্যমে শেষ পেরেক পোতা সম্পূর্ণ হলো।
অপেক্ষা শুধু মাটিতে নামানোর।
অপেক্ষা সবকিছু চাপা পড়ার।

 

নাজনীন পারভীন
সহকারী রেজিস্ট্রার
ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 375
  •  
  •  
  •  
  •  
    375
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.