ধূমপান পুরুষ ও নারীর জন্য সমান ক্ষতিকারক

ফারদিন ফেরদৌস:

সিগারেট, বিড়ি বা তামাক পুড়িয়ে ধূমপান করা স্বাস্থ্যের জন্য বিরাট ক্ষতিকর এবং সেটা কারোরই গলাধঃকরণ করা উচিত না। লিঙ্গ বৈষম্যের জায়গা তো সেখানে একদমই নেই। মেয়েরা বিড়ি খেলে যা হয়, পুরুষরা খেলেও ঠিক তাই তাই ঘটে। মানব শরীরে নিকোটিনের খারাপ প্রভাব এখনকার দিনে সবাই জানে।
বরং পুরুষ বেশিমাত্রায় ধূমপান করে বলে নারী ও শিশুর ওপর পরোক্ষ যে ক্ষতিটা হয় তার দায়ভার তাই পুরুষকেই সর্বাগ্রে বহন করতে হবে।

এবার এই লেখক দুইটা তথ্য সচেতন আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায়।

¶ বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশ্য ধূমপানের কারণে সমাজ যদি উচ্ছন্নে যায়, সমাজের মানুষেরা যদি ডেসপারেট হয়ে যায় তাহলে মেয়েদের চেয়ে এক্ষেত্রে পুরুষদের দায়ভারই বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস্)- অনুসারে, বাংলাদেশে ধূমপায়ীর বর্তমান সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ। তবে পুরুষের ধূমপানের ফলে নারীদের পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়ার হার অনেক বেশি। ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী কর্মস্থলে এবং ২১ শতাংশ নারী জনসমাগম স্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি নারী।

¶ ক্রোয়িশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের গবেষণা তথ্যের বরাত দিয়ে বিশ্বে ধূমপায়ীর সংখ্যা নিয়ে ক্রোয়েশিয়া উইক সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

২২টি দেশকে নিয়ে করা ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি ধূমপান করেন। নারী ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরেই আছে ক্রোয়েশিয়া। তবে ২২টি দেশের মধ্যে নারী ও পুরুষ ধূমপায়ীদের সংখ্যার বিচারে সপ্তম স্থানে আছে ওই দেশটি। এবং বাংলাদেশের অবস্থানটা কোথায় কল্পনা করা খুব কঠিনতর কিছু নয়।

এমন একটা বাস্তবতা বা সমাজব্যবস্থায় কোনো স্বনামধন্য পুরুষ পার্সোনালিটি কর্তৃক কেবলমাত্র নারীকে উদ্দেশ্য করে ঢালাওভাবে কথা বলাটা কতটা শোভন?

সিগারেট হাতে একজন চিত্রনায়িকার ছবি প্রকাশ করা নিয়ে সোশাল ওয়ার্কার সোহেল তাজ নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, একজন সেলেব্রিটির কাছ থেকে এরকম অশোভন আচরণ কাম্য নয়- আমাদের ছেলে মেয়েদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে……

হাতে আজেবাজে কথা লিখে রাত বিরাতে ঘুরে বেরিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়া নারী জাতিকে অবমাননা করা ছাড়া আর কিছু না- নারী পুরুষ যেই হোক না কেন এই ধরণের আচরণ সমাজকে নেতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করে…।

রাত-বিরাতে ঘুরে বেরিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অভিযোগটি যেকোনো নারীর জন্যই চূড়ান্তরকমের অবমাননাকর। কর্মসূত্রে বিপুলসংখ্যক নারীকে রাতে বাইরে থাকতে হয়। সেখানে বিশৃঙ্খলাকর যদি কিছু যদি ঘটে, তার দায়ভার নারীর ওপর একলা কিভাবে বর্তে!

এইদেশে রাত বিরাতে পুরুষ ঘুরে না, ধূমপান করে না, বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি করে না?

এখন তো বলাবলি হচ্ছে। কোনো পুরুষ বডিবিল্ডার যদি তার খোলা শরীর প্রদর্শন করে, বাহুমূল দেখায়, চুচুক খুলে রাখে, নাইকুণ্ড বের করে সিক্সপ্যাক শো অফ‌ করে -সেটা কি নারী অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার মতো অশোভন কিছু?

কোনো নারী কি এই ব্যাপারে বলেছে যে, এইভাবে পুরুষের পর্দার বরখেলাপ করা উচিত নয়, আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে অমন খোলামেলা থাকবার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। না তেমনটা কেউ বলেনি।

আমাদের বডিবিল্ডার সাহেবও সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব পর্যন্ত তার বাতচিতের পরিমিতিবোধ দেখালে সেটাই বেশ শোভন হতো। সাথে যদি তিনি এটা বলতেন যে, দেশের কোটি ধূমপায়ীর ধূমপান ছেড়ে দেয়া উচিত। সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে কীভাবে তামাক উৎপাদন ও বিড়ি-সিগারেটের কারখানা বন্ধ করে দেয়া যায়। তিনি বলতে পারতেন, জাপানি ইনভেস্টটরদের কাছে ১৫ হাজার কোটি টাকায় আকিজ গ্রুপের সিগারেট কারখানা বিক্রি করে দিয়ে বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের নিকোটিন বাণিজ্য ইজারা দেয়াটা ঠিক হয়নি।

জানি করপোরেট বিড়ি সওদাগরদের বিরুদ্ধে একটা কথাও উনারা বলতে পারবেন না। পারবেন কেবল একজন নারীর সাথে। যিনি কিনা আরোপিত চাপে পড়েও শক্তিমান মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে নিজের মেরুদণ্ড সোজা রাখবার প্রয়াস পেয়ে চলেছেন।

নারীকে এমনিতেই নানামুখী পুরুষতান্ত্রিক চাপ সামাল দিয়ে চলতে হয়। সেখানে মূল ইস্যুকে ঘুরিয়ে যদি নারীর চরিত্র টেনে কথা বলেন সমাজের কোনো সম্ভ্রান্ত মানুষ -সেটা মানবতার ইতিহাসে বড় নেতিবাচক রুল প্লে’র নামান্তর হয়ে ওঠে।

সভ্যতা ও সৌজন্যতার ধারক ও বাহক বলে যারা নিজেদেরকে পরিচয় দেন তাদেরকে আরেকটু সহনশীলতা ও উদার নৈতিকতার পরিচয় দেয়া উচিত। নইলে নারীর প্রাপ্য অধিকার ভূলুন্ঠিত হয়ে নারী ও পুরুষের সামাজিক সাম্য বিনষ্ট হতে পারে।

আমরা যদি দেখতাম, চলচ্চিত্র অভিনয় শিল্পী পরীমণির সিগারেট খাওয়া দেখে ঘৃণা ও অপমানে দেশের সব পুরুষ তাদের সিগারেট হাত থেকে ফেলে দিয়েছে। যদি দেখতাম দেশটা নিকোটিনের ক্ষতি থেকে পুরোদস্তুর রেহাই পেয়েছে, তাহলে আপনাদের পুরুষদের নৈতিকতাকে বাহ্বা দিতাম।
তা যেহেতু হয়নি -নারীর প্রতি আপনাদের বক্রোক্তিও ধোপে টিকলো না।

অভিযোগ প্রমাণের আগেই কোনো বিচারাধীন নারীকে বলবেন না রাত-বিরাতের বিশৃঙ্খলাকারী। প্লিজ সাহেবগণ সোজাসাপ্টা বলুন, ধূমপান পূরুষ ও নারীর জন্য সমান ক্ষতিকারক।✍️

ফারদিন ফেরদৌস: সাংবাদিক

(ফিচারে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি পাবলো পিকাসোর। নাম: ‘Woman with Cigarette’ Pablo Picasso | 1903)

শেয়ার করুন:
  • 42
  •  
  •  
  •  
  •  
    42
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.