ঐশী কি আসলে খুনি? পিছনে কেউ নেই তো?

Police coupleউইমেন চ্যাপ্টার: রাজধানীতে পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর খুন হওয়ার ঘটনা সারাদেশে তোলপাড় করে ফেলেছে। বিশেষ করে এই ঘটনায় খুনির পরিচয়। খুনি ওই নিহত দম্পতিরই কিশোরী মেয়ে হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। ওই বয়সের সন্তানদের ঘরে ঘরে একটা নাড়া দিয়ে গেছে এই ঘটনা।

অনেকরকম কথা হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, ঐশী ‘মাদকাসক্ত’ ছিল, ‘উচ্ছৃঙ্খল’ জীবনযাপন করতো। তার এই জীবনযাপনে বাধা দেওয়াতেই সে তার বাবা-মাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এসবই পুলিশের কাছ থেকে জানা। আরেকটা তথ্যও এসেছে, ঐশীকে হাত খরচ হিসেবে এক লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি। এতে করে নিহত পুলিশ কর্মকর্তার সততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একজন মৃত মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খণ্ডনের। এতে করে মরেও শান্তি নেই তার।

বাবা-মা মৃত, ঐশী কারাগারে, সাত বছরের ছোট ভাইটা (ঐহী) শেষপর্যন্ত জানতাম পুলিশের হেফাজতে আছে। কিন্তু এখন কোথায়? যেখানেই থাকুক না কেন, একটা ছবির মতোন পরিবার নিমিষেই ছারখার হয়ে গেল। এটা কি শুধুই ঐশীর কারণে? একজন কিশোরীর পক্ষে কি সম্ভব এমন জলজ্যান্ত দুজন মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা? সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার সাথে এর একটা বিরাট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মেঘ আর ঐহী আজ একই পথে হাঁটছে। মেঘের তবুও সাংবাদিকরা ছিল, মামারা-নানী-দাদী ছিল। কিন্তু ঐহী কোথায় যাবে?

এই খুনের পর থেকেই অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে চলে আসে। যেগুলোর উত্তর আমরা পুলিশের তদন্তে পাইনি। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে একজন কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। আমার মনে হয়, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি পাওয়া যেতো, তবে অনেক সহজ হয়ে যেতো আমাদের জীবনটা। কিন্তু কে দেবে সেই উত্তর? দেখুন পর্যবেক্ষণগুলো, মিলিয়ে নিন আপনার ভাবনার সাথে-

১. প্রথমে খটকা লেগেছে, ঐশীর নিজে থেকে এসে থানায় ধরা দেবার ব্যপারটা। ঐশী যদি ঠান্ডা মাথায় নিজের বাবা-মাকে খুন করেই থাকতো, তবে তার পক্ষে পালিয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক ছিলো। খুন হবার আগে ঐশী পনের দিনের মতোন কোন এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে ছিল। সুতরাং পালিয়ে থাকবার জন্য ঐশীর বেগ পেতে হতো না। সেই সাথে বলা হয়েছে মাদক গ্রহণে বাঁধা দেয়ায় ঐশী খুন করে বাবা-মা’কে। এটাই যদি একমাত্র কারণ হয়ে থাকত, তবে খুন করার পর প্রথমে সে বাড়ি থেকে টাকা পয়সা নিয়ে পালাত, আর সেই টাকা দিয়ে মাদক গ্রহণ করে যেত যতোক্ষণ না তাকে পুলিশ ধরতে পারতো। এই কাজটা করাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ঐশী নিজে থেকে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করে। এখানে কি ঐশী এমন কোন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলো যে, তাকে অত্মসমর্পনে বাধ্য হয়? কেউ কি বাধ্য করেছিলো তাকে?

২. পোস্টমার্টেম রিপোর্টে বলা হয়, মৃতদেহের আর্টারি কেটে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ওদিকে বলা হয়েছে খুনগুলো আনাড়ি হাতের। এখন প্রশ্ন হলো, আনাড়ি কেউ কেন আর্টারি কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করতে যাবে? একটা কিশোরি মেয়ের কি আদৌ ধারণা থাকার কথা ছিল আর্টারি সম্পর্কে? ঐশীর বাবার দেহে মাত্র তিনটা ক্ষত স্থান পাওয়া গিয়েছে। একটা পুলিশ অফিসারকে মাত্র তিনটা ক্ষত দ্বারা মেরে ফেলাটা কি কোন আনাড়ির কাজ বলে মনে হয়? একটা কিশোরি মেয়ের পক্ষে কি একজন পুলিশ অফিসারকে এভাবে ঘায়েল করা এতোটাই সোজা?

৩. জবানবন্দিতে উল্লেখ ছিল, মোট ৬০ টা ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় ঐশীর বাবা-মা’কে। ধরে নিলাম ৩০টা করে ওষুধ দুজনের কাপের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। আপনাদের কি ঘুমের ওষুধ সম্পর্কে কোন ধারণা আছে? বাজার থেকে মাত্র দশটা ঘুমের ওষুধ কিনুন, এরপর সেটা কফির সাথে মিশিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করে দেখুন। মাত্র দশটা ঘুমের ওষুধের কারণেই কফিটা এমন তিতকুটে হয়ে যাবে যে, মুখে দিতেও পারবেন না। সেখানে ঐশীর বাবার কফিতে ৩০ টা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়া হলো, আর উনার মতোন একজন ঘাগু পুলিশ অফিসার কিছুই টের পেলেন না, মজা করে কফিটুকু শেষ করে ফেললেন, এটা আমার কেন যেন বিশ্বাস হতে চাইছে না।

৪. জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, খুন করার আগে ঐশী মাদক নিয়েছিলো। একটা নেশাগ্রস্ত মেয়ে কিভাবে এতো ঠাণ্ডা মাথায় প্ল্যান মাফিক দুই দুইটা পূর্ণবয়স্ক মানুষ, যাদের মধ্যে একজন আবার পুলিশ, তাদেরকে খুন করে ফেললো? আপনারদের কাছে কি ব্যাপারটা একটুও আশ্চর্য লাগলো না?

৫. মার্ডারের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে প্রথমে প্রকাশ পায়, কমপক্ষে দুই-তিন জন মিলে খুন করেছে। এর আগে ঐশীও থানায় ধরা দিয়ে প্রকাশ করেছিল খুনের সাথে তার বন্ধুর জড়িত থাকার কথা। কিন্তু কয়েকদিন পর তদন্তকারী ডাক্তাররা বলেন একজনই এই খুন গুলো করেছে। ততোক্ষণে ঐশীর জবানবন্দীর ভাষ্যও পাল্টে যায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের বারবার এতো হেরফের কেন? জবানবন্দীর সাথে সাথে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাল্টে যাওয়া কি আশ্চর্যজনক নয়? তবে কি অন্য কেউ এই কাহিনীর কলকাঠি নাড়ছে?

৬. শুরুতেই বিতর্ক শুরু হয় ঐশীর বয়স নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ঐশীর বয়স আদালতে ১৭ প্রমাণিত হলেও, এক সময় পুলিশ দাবি করে ঐশীর বয়স ১৯ বছর। বয়স নিয়ে এই বিতর্ক চলে আরো অনেক। ঐশীর বয়স আঠারোর বেশি, এইটা প্রমাণ করতে চেষ্টার কমতি ছিল না পুলিশের। কেন এই ধরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলো পুলিশ। এতে তাদের কি কোন স্বার্থ জড়িত ছিলো? ঐশী প্রাপ্ত বয়স্ক প্রমাণ করা গেলে, তাকে কিশোরী সংশোধন কেন্দ্রে না পাঠিয়ে বরং আটকে রাখা হতো জেলে। এতে কার লাভ হতো? কার নির্দেশে পুলিশ এতো উঠে পড়ে লেগেছিলো ঐশীর বয়স বেশি প্রমাণের চেষ্টায়?

৭. প্রথম থেকেই পুলিশের একটা তড়িঘড়ি ভাব। তাড়াহুড়ো করে রিমান্ড। জবানবন্দী থেকে আদালতের বিচার প্রক্রিয়া সব কিছুতেই তড়িঘড়ি। ব্যাপারটা যেন দ্রুত ধামাচাপা পড়ে যায় এমনটাই চাইছিলো কেউ?

৮. ঐশীর বাবা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে কাজ করতেন। রাজনৈতিক দল গুলোর নেতাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ফাইল তৈরি করতে হতো তাকে। তদন্ত করতে হতো বড় বড় গড ফাদারদের অপরাধ নিয়ে। এই ব্যক্তিটি মারা গেলে ঠিক কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে আপনারা মনে করে? কারা চাইতে পারে এই লোকটিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে? খুন হবার আগে কোন বিষয়টি নিয়ে তিনি তদন্ত করছিলেন?

ফেসবুকে এসব প্রশ্ন যিনি করেছেন, তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ঐশী মেয়েটাকে ট্র্যাপে ফেলা হয়েছে। একজন পুলিশ অফিসারকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ব্যবহার করা তার নিজের মেয়েকেই। একটা কিশোরী মেয়েকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা খুবই সহজ। এটাওতো হতে পারে, ঐশীকে ফাঁদে ফেলার জন্য তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মাদকাসক্ত করে তোলা হয়েছে। প্রথম ছবিটিতে ঐশীকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো, কিন্তু ঐশীর সর্বশেষ ছবিটি দেখলে মনে হবে না সে অনেকদিন ধরে মাদক নিয়ে আসছে। হতে পারে ঐশী কয়েক মাস ধরে মাদক নিচ্ছিলো। আর পুলিশ পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার সবচেয়ে সহজ উপায় নিঃসন্দেহে তাদের মেয়ে ঐশী।
সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডটাই দেখেন। আমরা সবাই জানি কেন সাগর-রুনিকে খুন হতে হয়েছিল অথবা কারা এর সাথে জড়িত। কিন্তু ময়না তদন্তের রিপোর্টে এলো, সেটা ছিলো অপেশাদার কারো কাজ। ঐশীর বাবা-মার মতোন একই উপায়ে কোপানো হয় তাদের দেহকে। আমরা সবাই প্রকাশ না করলেও বুঝতে পারছি, কেন এমনটা করা হয়েছে। অপেশাদারের কাজ হওয়ার পরেও কেন খুনিকে ধরা সম্ভব হয়নি। আমরা এটাও জানি এতে কাদের স্বার্থ হাসিল হয়েছে। ঐশীর ব্যাপারটাতেও আমার একই ধরনের সন্দেহ। গোয়েন্দারা তড়িঘড়ি করে সব তদন্তের কাজ গুটিয়ে নিয়েছে। আমরা দাবি জানাতে পারি আরেকবার সুষ্ঠ তদন্তের। কিন্তু এটাও জানি, এতে কোন লাভ নেই। যাদের এতোদিনে লাভ পকেটে ভরে ফেলেছে তারা সর্বদাই থাকবে ধরা ছোয়ার বাইরে। ১০০০০০০ বার তদন্তেও তাদের টিকিটাও বেরিয়ে আসবে না’।

প্রশ্নকর্তার সাথে আরও একটু যোগ করতে চাই, ঐশীর বয়স নির্ধারণ নিয়ে পুলিশ এতো তৎপরতা দেখিয়েছে যে, তারা তার জন্মস্থান বের করেছে, তখন যে ডাক্তার ছিলেন, তাকেও খুঁজে বের করেছে। এতোটা কেন করতে গেল পুলিশ? আজকে আবার একজন আইনজীবী ঐশীকে কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র করে কারাগারে পাঠানোর জন্য রিট করেছে। এটাই বা কেন? ওকে প্রাপ্তবয়স্ক প্রমাণে কার কী এসে যায়?

তাছাড়া ঐশীর যতগুলো ছবি দেখেছি, কোনটাতেই আমার তাকে পুরোদস্তুর মাদকাসক্ত মনে হয়নি। মাদকাসক্ত হলে এর একটা ছাপ পড়ে চেহারায়, সেটা ছিল ঐশীর ক্ষেত্রে।

এইদেশে সাংবাদিকদের হাত নাকি বিশাল, ক্ষমতাও ব্যাপক, তারপরও আমরা কুলকিনারা পেলাম না আমাদের সহকর্মী দুজনের খুনের। হজম করে যেতে হলো। শোনা যায়, কোন কোন সাংবাদিক নেতা নিজেদের পকেটে ভরে ফেলেছেন সাগর-রুনি কাহিনী। মেঘ কি কখনও জানতে চাইবে না তার বাবা-মাকে কেন, কারা হত্যা করেছিল? এক মাঘেই কি শীত যাবে?

আবার এই ঐশীর যদি যাবজ্জীবন হয়, সেও তো বেরিয়ে আসবে একদিন। তার ভাই ঐহীও তো জানতে চাইবে পুরো ঘটনা। হয়তো কিছুই কেউ আমরা জানবো না, তবুও প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে যদি কিছু থাকে, সেই জানাবে আমাদের। সেই দিনটিরই অপেক্ষায়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.