আফগান নারীদের পোশাক সম্পর্কিত হ্যাশট্যাগ প্রতিবাদে সংহতি

সুপ্রীতি ধর:

নারীর পোশাকও যে একটি দেশের অগ্রগতি ও সভ্যতার মাপকাঠি হতে পারে তা আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আফগানিস্তান নামক দেশটি। নারীর শিক্ষা, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এই একবিংশ শতকে কোন রাষ্ট্র আর একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে না, খোদ তালেবান শাসকেরাও এখন তা ভালো জানে। তাই এতোবছর ধরে তারা শরীয়া আইনকে নিজেদের মতো করে যেভাবে প্রয়োগ করে আসছিল, এখন বাধ্য হচ্ছে তাতে পরিবর্তন আনার। তারপরও কি আফগান নারীরা নিশ্চিন্ত হতে পারছে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে? পারছে না।

আফগানিস্তানে গত আগস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে তালেবান শাসকেরা একের পর এক নির্দেশ জারি করে যাচ্ছে দেশটির নারীদের শিক্ষা, পোশাক, স্বাধীনভাবে চলাফেরা, চাকরি করা সংক্রান্ত নানান ইস্যুতে। যদিও শাসকরা বারবারই বলছে যে ২০ বছর আগের তালেবান আর বর্তমান তালেবানের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কিন্তু বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ক্রমাগত চাপের কারণেই হোক, আর নিজেদের অতীতের ভুলগুলো শুধরানোর নিমিত্তেই হোক, নারী অধিকার ইস্যুতে তারা যে ধরনের নিয়মনীতির কথা বলছেন তাতে নিজেরাই কনফিউজড বলে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে।

একদিকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে আফগান নারীদের শিক্ষা, স্বাধীনতা তাদের নিশ্চিত করতেই হবে। একবিংশ শতকে এসে আগেকার নিপীড়ন-নির্যাতন করে যে বেশিদিন টিকতে পারবে না তালেবান শাসকরা তা ভালো করেই জানে। অন্যদিকে ইসলামি শরীয়া আইনের যে তালেবানিকরণ তারা করেছে অতীতে, তার সাথে অধিকার প্রদানের বিষয়টি সাংঘর্ষিক হয়ে যাওয়ায় মানবাধিকার কর্মীরা কেউই নিশ্চিত হতে পারছেন না আদতে কী হতে যাচ্ছে দেশটিতে। সময়ই হয়তো বলে দেবে কোনদিকে যাবে দেশটি, আর কোন ভবিষ্যত অপেক্ষা করে আছে আফগানিস্তানের নারীদের জন্য।

শাসকরা একদিকে বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়ালেখায় তাদের কোন আপত্তি নেই, অন্যদিকে বলছে, পড়তে হলে নারীদের আবায়া ও নেকাব পরা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়াও, নারী শিক্ষার্থীদের পারলে আলাদা ক্লাস করানো, ক্লাসে ঢোকা ও বের হওয়ার জন্য আলাদা দরজা ব্যবহার করা, তাদের জন্য নারী শিক্ষক পাওয়া না গেলে বয়স্ক ও চরিত্রবান পুরুষ শিক্ষকের ব্যবস্থা করা এবং ক্লাস শেষে যাতে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীরা মিশতে না পারে, সেজন্য পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাঁচ মিনিট আগে নারীদের ক্লাস শেষ করা এবং পুরুষরা ভবনের ত্যাগের আগ পর্যন্ত ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করা, ইত্যাদি নিয়ম জারি করেছে তালেবান শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মোটের ওপর একটা জগাখিচুড়ি অবস্থা।

কিন্তু এবারে যে ইতিবাচক দিকটা আমরা দেখতে পাচ্ছি তাহলো এরই মধ্যে কাবুলের রাস্তায় নারীরা নেমে এসেছে নিজেদের অধিকার সমুন্নত রাখার দাবিতে। তারা গত ২০ বছর ধরে একটু একটু করে যতটুকু এগিয়ে এসেছে, আর পিছনে ফিরতে চায় না বলেই তারা নিজেদের ওই বোরকা বা হিজাবের মধ্যেও আটকে রাখতে চায় না।  এর প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস করা আফগান নারীরা ঐতিহ্যবাহী আফগান পোশাক পরে নিজেদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন।
এরই মধ্যে ফেসবুক-টুইটারে #DoNotTouchMyClothes হ্যাশট্যাগটি ভাইরাল হয়েছে।

প্রতিবাদকারীরা বলছেন, নারীদের ঐতিহ্যবাহী আফগান পোশাকও ইসলামের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ নয়। বরং তালেবানই ইসলামের নামে আফগান সংস্কৃতি ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ তাদের। আফগান নারীদের সাথে সংহতি জানিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেকেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ছবি শেয়ার করেছেন।

উইমেন চ্যাপ্টার বরাবরই এ ধরনের প্রতিবাদে সংহতি জানিয়ে এসেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। স্যালুট আফগান নারীদের। তাদের এই লড়াই জয়যুক্ত হোক।

শেয়ার করুন:
  • 112
  •  
  •  
  •  
  •  
    112
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.