করোনায় বাল্যবিয়ের মহামারী

ফেরদৌস আরা রুমী:

বাল্যবিবাহে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ইউনিসেফ এর মতে, সারাদেশে ৪০ লাখের বেশি বালিকাবধু। তারওপর করোনা মহামারীতে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে বাল্যবিবাহ। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে প্রশাসনসহ আইন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মহামারী নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় বাবা-মায়েরা এই সুযোগ কজে লাগাচ্ছেন। অভিভাবকরা খুব গোপনে ক্ষেত্রবিশেষে স্থান পরিবর্তন করে কন্যাসন্তানের বিয়ে দিচ্ছেন। এসময় প্রশাসনের নজরদারি কম থাকায়, মানুষের চলাফেরা কম থাকা, সর্বোপরি বেশি মানুষকে দাওয়াত দিতে হয় না বলে অভিভাবকরা এই সময়কে বেছে নিয়েছেন।

করোনায় বাল্যবিবাহ কতটা ও কেন বেড়েছে?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সর্বশেষ জরিপ (মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯-এমআইসিএস) বলছে, দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকারের কর্মপরিকল্পনায় ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, এ হার ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২০-২১ সালে এই হার কতটুকু কমেছে বা বেড়েছে, তার হিসাব পাওয়া যায়নি। বাল্যবিবাহ নিরোধে নেওয়া জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে শূন্যের কোঠায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। কিন্তু বাল্যবিবাহ কতটা কমেছে এবিষয়ে কোন স্পষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। (সূত্র: প্রথম আলো)

করোনায় বাল্যবিবাহ কতটা বেড়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি সাতক্ষীরার একটি স্কুলের দিকে নজর দিলে। এই স্কুলে ১৮ বছরের নিচে অন্তত ৫০ কিশোরীর বিয়ে হয়ে গেছে যা গত বছর ছিল ৩২ জন। বাল্যবিবাহের শিকার এসব মেয়েদের জীবনে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে আইনী সহায়তাও পাবে না। কারণ ১৮ বছর বয়সের আগে বিবাহ আইনসঙ্গত নয় বলে এসব বিয়ের কোন নিবন্ধন হয়নি। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার এক স্কুলের চিত্রে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি শ্রেণিতে ২/৩ জন করে ছাত্রী উপস্থিত ছিল। বেশিরভাগ ছাত্রীর করোনায় স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বিয়ে হয়ে গেছে। এসময় বিয়ে বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা গেছে-ভাল পাত্র, বাড়ির মুরব্বির ইচ্ছা পূরণ, ছেলে-মেয়ের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার ভয়, শিশু যৌন হয়রানি বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, অর্থনৈতিক অসংঙ্গতি ইত্যাদি। তবে দীর্ঘ দেড় বছরের বেশি সময় স্কুল বন্ধ থাকায় উল্লেখিত কারণগুলো মানুষ বেশি দাঁড় করিয়েছে। এসময় বিদ্যালয়ে পাঠদান নিয়মিত থাকলে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় যেমন ব্যস্ত থাকতো তেমনি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালত ক্লাবগুলোও সচল থাকতো।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অন্যান্য সময়ের তুলনায় দেশে বাল্যবিবাহ ১৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২৫ বছরে সর্বোচ্চ। একই গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের ১৮ আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। করোনাকালে অভিভাবকের কাজকর্ম না থাকায় ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার কারণে ৮৫ শতাংশ, সন্তানের স্কুল খোলার অনিশ্চয়তায় ৭১ শতাংশ এবং করোনা মহামারী দীর্ঘ স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় অনিরাপত্তা বোধ এবং বিদেশ থেকে আসা ছেলে হাতের কাছে পাওয়ায় ৬২ শতাংশ বিয়ে হয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

সম্প্রতি কোস্ট ফাউন্ডেশন কক্সবাজার অঞ্চলে একটি গবেষণা চালায়। সেখানে দেখা গেছে, কক্সবাজার জেলায় বিয়ের গড় হার ৫৩% যেখানে সারাদেশে এই হার ৫১.৪%। চকরিয়ায় এই হার ৩২%, কক্সবাজার ৫১%, ঈদগাঁ ৮২%, কুতুবদিয়া ৫৪%, মহেশখালি ৬১%, পেকুয়া ২৬%, রামু ৭২%, টেকনাফ ৬৬% এবং উখিয়ায় ৭৫%। বিয়ের কারণ হিসেবে জানা গেছে, স্কুল বন্ধ থাকার কারণে ৪৭% বিয়ে হয়েছে, ছেলেমেয়ের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার আশংকায় ২৮%, অর্থনৈতিক কারণে ২৬%, ভালো পাত্র পাওয়ার কারণে ২৮%, করোনায় পরিবারের আয় কমে যাওয়ার কারণে ২২%, নিরাপত্তাহীনতার কারণে ১২% এবং প্রথাগত কারণে ৮% বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছর।

করোনায় বাল্যবিবাহ বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ করোনায় স্কুল ছুটি থাকা। অভিভাবকরা এসময় হাতের কাছে ভালো পাত্র পাওয়ামাত্র বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে লোকজনের আনাগোনা কম থাকা, প্রশাসন ও পুলিশ করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অভিভাবকরা সুযোগটিকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। এছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কমিটি কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি। এদিকে করোনায় প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরেছে বেশি যাদের সমাজে পাত্র হিসেবে চাহিদা বেশি। অবরুদ্ধ অবস্থায় তাই বিয়ের ঘটনা ঘটেছে বেশি। খোদ মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম করোনায় বিধিনিষেধ, মানুষের চলাচল কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে বলে স্বীকার করেছেন। এছাড়া মাঠপর্যায়ে চিত্রও একই দেখা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ছিল বেশি। অন্যদিকে অনেক পরিবারে আয় কমে যাওয়ায় তারা মেয়ের বিয়ে দিয়ে একজনের খোরাকি খরচ কমবে ভেবে বিয়ে দিয়েছে।

ভেঙ্গে পড়েছে সকল কার্যক্রম

করোনা মহামারীতে সরকারের বাল্যবিবাহ নিরোধ কার্যক্রম বলতে গেলে স্থবির হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে চিত্র বলছে, পুলিশ/স্থানীয় প্রশাসন বাল্যবিবাহের খরব পেলে কেবল তা প্রতিরোধ করেছে। তাও বেশিরভাগ বিয়ের ঘটনা ঘটেছে খুব গোপনে। এদিকে হটলাইন নম্বরেও ১০৯৮ এ এসময় কল এসেছে আগের তুলনায় বেশ কম। বাল্যবিবাহ নিরোধ কর্মপরিকল্পনার ২৩৭টি কৌশল এবং কার্যক্রমের মধ্যে চলতি বছরে বাস্তবায়ন করা হবে এমন কার্যক্রম আছে ১৭২টি। এর বেশিরভাগই শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসম্পর্কিত। গত বছরের মার্চ মাস থেকে করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই কার্যক্রম আর বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে বাল্যবিবাহ রোধে কার্যক্রম বা মনিটরিং ছিল না। সবাই গা ছাড়া ভাব নিয়ে ছিল। মাঠপর্যায়ে তহবিল গঠন বা বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও এমন কোন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়নি। এমনকি করোনার কারণে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর ডাটা বেইস, কার্যকর পদক্ষেপ হতে নেয়া, কিংবা আর্থিক সহায়তা এমন কিছুই সরকারের পরিকল্পনায় ছিল না। পরিণতিতে সারাদেধে উদ্বেগজনক হারে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। সম্প্রতি স্কুল খোলার পর ক্লাসে কিশোরীর উপস্থিতি সেই সাক্ষ্যই বহন করছে।

প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

চলমান বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, তহবিল গঠন, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ বাজেট রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা, কারিগরী প্রশিক্ষণ ইত্যাদি প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাল্যবিয়ে নিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হাতে হয় যার ভিত্তিবছর ২০১৮-৩০। কিন্তু করোনা মহামারীতে বাল্যবিবাহের হার না কমে উল্টো এতবেশি বেড়েছে যে আগের জায়গায় স্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনা মহামারী কবে নাগাদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছে না। তারসাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট। গরীব দেশগুলোর জন্য ৭০-৮০ ভাগ মানুষকে টিকার আওতায় আনাও সময় সাপেক্ষ।

করোনার সাথে তাল মিলিয়ে যথাসম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে হবে। কারণ সারাদেশের চিত্র বলে দিচ্ছে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বাল্যবিবাহ মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক কার্যক্রমগুলো সচল রাখা যাবে। শিক্ষকরাও তাদের নিয়মিত খোঁজ রাখতে পারবেন। এছাড়া সারাদেশে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত যে আট হাজার ক্লাব রয়েছে সেগুলোও সচল রাখা যাবে। পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। ভূয়া জন্মনিবন্ধন, বিয়ে নিবন্ধন না করে শরিয়া মোতাবেক বিয়ে পড়ানোর প্রবণতা, স্থান ত্যাগ করে বিয়ে দেওয়া ইত্যাদি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যদিকে কন্যাসন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখার প্রবণতা যদি বন্ধ না হয় একমাত্র আইন দিয়েও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব নয়। বাবামায়ের কন্যাসন্তানের প্রতি স্নেহ-মমতার পাশাপাশি তার পড়াশোনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছেলেমেয়ে পৃথক নয়-তাদের চিন্তার জগতে এই পরিবর্তনটিও আনতে হবে। কন্যাসন্তান যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে সেই পরিবেশ তৈরিতে রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ সবার উদ্যোগী ভূমিকা রাখাও জরুরি।

শেয়ার করুন:
  • 92
  •  
  •  
  •  
  •  
    92
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.