কীভাবে আমরা রেইসিস্ট, মিসোজিনিস্ট হয়ে উঠি!

ফাহমিদা আক্তার:

কিছু কিছু ইস্যুতে এতো কথাবার্তা হয় দুইদিন পরপরই। রেইসিজম, মিসোজিনিজম, এক্সট্রিমিজম নিয়ে আদতে এই ব্যাপারগুলো তো আমরা শিখি পরিবেশ থেকেই।জাতিগতভাবে শুধু বাঙালি না, বিশ্বের সকল সমাজ ব্যবস্থাতেই রেইসিজম আছে। তবে কিছুদিন যাবত আমাদের দেশের বেশ কিছু ঘটনায় রেইসিজমটা যে কতখানি গভীরে গিয়ে ঠেকেছে তা লক্ষণীয় আর তার প্রভাব পড়ছে জীবনযাপনে। ধর্ম, বর্ণ, আকার-আকৃতি কিংবা ধন সম্পদ নিয়েও বৈষম্য সমাজে যুগে যুগে ছিল এবং থাকবে বলেও মনে হয়। কেননা এখনও এই শতকেও মানুষ বের হয়ে আসতে পারেনি অন্যকে ছোট করে দেখার পৈশাচিক আনন্দ থেকে কিংবা কাউকে অপমান করে আত্মতৃপ্তি লাভ করা থেকে।

এই যে কিছুদিন আগে সামিন নামের ১০ বছরের বাচ্চাটা অন্য বাচ্চার তিরস্কারের শিকার হয়ে ”anorexia nervosa” তে ভুগে মারা গেলো, যে সহপাঠীরা তাকে ওইসব বলেছে দোষটা কি শুধু তাদেরই দেয়া যায়? ওরা এসব বলা শিখেছে তো আমার আপনার কাছেই। বাচ্চারা খেয়াল করে আমরা মোটা কাউকে দেখলে বলি তুমি মোটা হয়ে গেছো, হাতি হয়ে গেছো (আড়ালে বা সাক্ষাতেই),কালো মানুষকে সমালোচনা করে বলি – চেহারা সুন্দর হলেও কালো, খাটো হলে বলি হাফটিকেট, লম্বা হলে বলি তালগাছ। বডিশেমিংই বলেন আর রেইসিজম, এসব তো আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

একটা বাচ্চা তো নিজে থেকেই শিখে নেয় না কালো সুন্দর না, ফর্সা সুন্দর। কেউ মোটা হলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করা যায়,নিজ ধর্ম ছাড়া অন্য সব ধর্ম ই খারাপ কিংবা অমহান।ছোট ছোট ইনসিডেন্ট, যা তার সামনে দেখে তা থেকেই শিখে। এই তিনটা ব্যাপারই দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হিসেবে রেইসিজম আর এক্সট্রিমিজম হিসেবে প্রকাশ পায়।

বাচ্চাদের এই বেড়ে ওঠার ব্যাপার ও পরিবেশ থেকে শিখার মনস্তত্ব বেশ ভালো বোঝা যায় হারপার লি’র লেখা ‘টু কিল এ মকিংবার্ড’ নামের একটি উপন্যাসে। আমেরিকার বর্ণবাদের পটভূমিতে লেখা হলেও স্কাউট নামের চরিত্র দিয়ে কিশোর বয়সের চিন্তাভাবনার নানা দিক তুলে ধরেছেন লেখিকা। সেই সাথে একজন পিতা বা অভিভাবক এর দৃষ্টিভঙ্গি যে কতখানি প্রভাব ফেলে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনে তা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠে। যেমন স্কাউট Radley Boo নামের এক চরিত্র কে দেখে অবাক হয়ে বলে–he was a real nice। বাবা এটিকাস উত্তরে বলে-All people are scout.When you finally see them.

অর্থাৎ স্কাউট ধরেই নিয়েছিল Radley Boo খুব একটা স্বাভাবিক সুন্দর মানুষ হবে না। তার এই ধারণা যে ভুল এবং কাউকে নিয়েই এমন না ভাবা উচিত এই শিক্ষাটা খুব সুন্দর ভাবেই দিয়েছে তার বাবা এটিকাস।

শিশুরা বৈষম্য মূলক কিছু শিখে গেলে এভাবে শিখিয়ে দেয়া হয় না যে সব মানুষই সুন্দর। শুধু তাকে দেখে,কিছু না জেনেই কাউকে অসুন্দর বলা যায় না এ ব্যাপারটা শেখানোর প্রচলন আমাদের দেশের পরিবারগুলোতে কমই আছে। কিছুদিন আগেই আমার এক শিক্ষিকা বন্ধু তার এক স্টুডেন্ট এর গল্প করছিলো – পহেলা বৈশাখ এর অনলাইন ক্লাসে সবাই পাঞ্জাবি পরে আসার কথা থাকলেও তার এক স্টুডেন্ট পরে আসে নি। কারন জিজ্ঞেস করলে বলে “মিস, এগুলা তো হিন্দুদের অনুষ্ঠান।” ধর্ম নিয়ে এই চরম বিব্রতকর মন্তব্যটা কি সে নিজেই শিখেছে? অবশ্যই না।

বাচ্চারা সবই পরিবেশ থেকে ধারণ করে।
যখন ছেলে বাচ্চাকে বলা হচ্ছে–
তুমি না ছেলে, তুমি বড় হয়ে আমাদের দেখবা না? (মানে শুধু ছেলে বাচ্চার উপরই এই দায়িত্ব বর্তায়…!)পাশে থাকা মেয়ে বাচ্চাকে এই কথা না বলা হলে এই তথ্যই নেবে ওদের মস্তিষ্ক।

তুমি না ছেলে, তুমি কেন রান্নাবাটি খেলবা?
(ওটা শুধুই মেয়েদের কাজ?)

কোন ফ্যামিলিতে ছেলে না থাকলে হা-হুতাশ করা হয়, আহা! একটা ছেলে নাই, শুধু মেয়ে। বাচ্চা এসব থেকে শিখছে মিসোজিনিজম।

মেয়ে বাচ্চাকে বলা হচ্ছে – তোমার রঙ টি ভালো/ভালো না, তাই তোমাকে অমুক রঙে মানাবে/মানাবে না- এর ভিতর দিয়ে কী শিখছে আমরা সবাই জানি। রেইসিজম কালারিজম এর জন্ম এভাবেই হচ্ছে আমাদের পরিবার থেকে শিশু মনস্তত্ত্বে। যে কারণে এক সময় আমাদের একসময় জোর করে তাদের শেখাতে হয় কালোও সুন্দর।

এসব কথা বলা যে বৈষম্যমূলক তা আমরা বুঝিই না। কারণ আমরা জানিই না কাউকে দেখতে ভালো লাগা না লাগা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। কিন্তু এসব বলে আমরা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে গুঁড়িয়ে দেই। কেউ আমাদের এটিকাসের মত বলে না ‘all are nice when you finally see them’. গায়ের রঙ কালো বা ফরসা হোক এটাতে ব্যক্তির নিজের দায় বা অবদান নেই। তবু আমরা এটা নিয়ে তাদের অবজ্ঞা করি বা আকাশচুম্বি প্রশংসা করি। অবশ্যই এক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের খুব একটা কিছু বলা হয় না। কারণ -রেসিজমের পাশাপাশি পুরুষতন্ত্রও আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মেয়েদের বলা হয়-তুমি মেয়ে, তাই তোমার এমন বা তেমন করা যাবে না। ফলাফল -মেয়েটা ভুগে লেক অফ কনফিডেন্সে আর এসব দেখে ওই পরিবারে থাকা ছেলে মেয়ে উভয়ই শিখছে রেইসিজম এবং মিসোজিনিজম। আর ওই বিচ্ছিরি কাজগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মায়েরাই করে থাকেন। মেয়ের প্রতি এই ধরনের ভালবাসা দেখানো যে তাদের কতটা ফ্রাস্ট্রেটেড করে তা তারা বুঝেনই না, বরং বাচ্চারা শিখে বৈষম্য।

মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত শেখালেই বাচ্চা শিখে যায় না মায়ের সম্মান। বরং যে বাচ্চা সেই জান্নাততুল্য মাকেই অসম্মানিত হতে দেখে –সে ওসব বইয়ের কথা ভুলে গিয়ে শিখে যায় যে মেয়েরা অতটা সম্মানের পাত্রী না, হয়ে ওঠে মিসোজিনিস্ট।

ধর্ম বিষয়ক শিক্ষা দিতে গিয়ে আবার অনেক বাচ্চাকেই শিখিয়ে ফেলা হয় অন্য ধর্মের লোকের সাথে না মিশতে। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি আমি নিজে জীবনে বহুবার কাছের মানুষজনের থেকেও শুনেছি আমার এতো হিন্দু বান্ধবী কেন? বয়সে ছোট বাচ্চারাও যেদিন একই প্রশ্ন করলো এই বিষয়ে, কৌতুহল দেখলাম তাদের চোখে, যারপরনাই অবাক হলাম। এই অল্প বয়সে এদের মাথায় আসে কীভাবে এই প্রশ্ন! প্রথমদিকে এর সদুত্তর দিতে পারতাম না। পরে দেখলাম গোঁড়ায় অনেক গলদ। এদের কী দোষ কেউ যদি শেখায় এদের অন্য ধর্মের কাউকে বন্ধু বানানো ঠিক না! অথচ ওই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছেলেটি বা মেয়েটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হতে পারতো।

কিছুদিন পরপরই কালো-ফরসা নিয়ে ধুন্ধুমার লেখালেখি হয়। প্রথম আলো পত্রিকার নকশায় লিখলো -“কালো তবু সুন্দর” –এই নিয়ে তোলপাড় হলো কিছুদিন আগেই। রিয়েলিটি হলো মনে মগজে যা আছে তা তো আটকাতে পারবেন না আপনি, যতোই লুকানোর চেষ্টা করুন। ওই এক শিরোনামে আমাদের গোটা জাতির মনস্তত্ত্ব ফুটে উঠেছে। আমাদের কাছে সুন্দরের ক্রাইটেরিয়া ফিক্সড। মনের সুন্দর, প্রজ্ঞা, মনুষ্যত্ব এগুলো আবার কী এমন জরুরি জিনিস? মন দেখে মন কে চেয়েছে কবে…?

আমরা শিশুদের শেখাই “সবার উপরে মানুষ সত্য”, অথচ তারা দেখে সবার উপরে কখনও মানুষের ধর্ম সত্য, কখনও বা মানুষের গায়ের রঙ সত্য, কখনও মেয়েদের চেয়ে ছেলে মানুষ সত্য, আর কখনও তার আকার-আকৃতি। তাই ওরা হয় এমন কিছু যা আমরা বুঝতে পারি না। যা আমরা সরাসরি শিখাইনি তা শিখে যায়, বুঝে যায়, কারণ ওটাই -শেখানো বুলি থেকে শিশুরা ততটা শিখে না, যতটা শিখে অবজারভেশনের মাধ্যমে।

নৈতিক শিক্ষা বই এর বাইরে এসে জীবনে পূর্ণতা পেলেই না ওরা দেখবে এবং শিখবে! কথাবার্তায় সংযত হওয়া টা তাই জরুরি…

কারো শারীরিক গড়ন নিয়ে মন্তব্য করাটা যে অভদ্রতা, অভব্যতা সেটা যখন আমরা কাউকে সালাম দেয়া ভদ্রতা এই কথাটা শেখাই তার সাথেই শেখানো উচিত। তারও আগে এটা জানা উচিত তাদের অভিভাবকদের। আপনি এসব বাচ্চাকে শিখিয়ে নিজেই কাউকে দেখে বললেন, “এতো কালো হইসো কেন, তুমি তো মোটা হইসো, কিংবা কারো বিয়েতে গিয়ে বললেন, “এতো সুন্দর মেয়েটার এতো খাটো ছেলের সাথে বিয়ে হইলো “—ইত্যাদি। তাহলে কিন্তু কিছুই হবে না ওসব শিখিয়ে। নিজ দায়িত্বে আপনার থেকে শিখে নিবে ছোট বাচ্চারা। ওরা ধরে নিবে এসব কথা কাউকে নিয়ে বলাই যায়। তাই আগে নিজেদের কথাবার্তায় কিছু পরিবর্তন আনি আমরা।

প্রতিটা মানুষ নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তাই আমার আপনার কনসার্নড না হলেও চলবে সে মোটা- চিকন- খাটো বা কালো হওয়া নিয়ে। ওটার জন্য সে আর তার পরিবারই যথেষ্ট।

আমাদের দরকার শুধু বাড়তি সেন্টিমেন্ট না দেখিয়ে একটু এম্প্যাথেটিক হওয়া। আপনি যখন এম্প্যাথেটিক, তখন দরকারই মনে করবেন না অযাচিত কিছু মন্তব্য করার – যা কাউকে মেরে ফেলতে পারে ভিতরে থেকে, যা তাকে উজ্জীবিত করে বিপজ্জনক পদক্ষেপ নিতে। যেমনটা সামিন নামের ছেলেটা করেছে। মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত হয়ে সে কিটো ডায়েটের শরণাপন্ন হয়েছে তা একটু চিন্তা করেই গা শিউরে উঠে।

তাই কিছু অনধিকার চর্চার অভ্যাস এবং বৈষম্যমূলক আচরণ ত্যাগ করা খুবই জরুরি। একজন এটিকাস থাকা জরুরি প্রতিটি পরিবারে যে শেখাবে কোনকিছুই, কোন মানুষেরই জাত, ধর্ম, বর্ণ একজন সামগ্রিক মানুষের মর্যাদার ঊর্ধ্বে নয়। মানুষের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে হয় এসব স্থূল চিন্তা ও মানসিকতাকে পাশ কাটিয়ে।

Fahmida Akter
BDS,BCS (Health)
Dental Surgeon,250 Bed Sadar Hospital, Sunamganj.

শেয়ার করুন:
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.