নারীর প্রতি অন্যায্য আচরণ চলবে আর কতকাল!

নাজরাতুন নাঈম:

“মূর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো” – বিদ্রোহী কবি নজরুল।

নামাজ রোজার বালাই নেই, দিনে যখন-তখন মিথ্যা কথা বলেন, কিন্তু সম্পত্তি বণ্টনের সময় ধর্মীয় আইন মানতেই হবে। হিন্দু আইন মারফত বলা হয় মেয়েদের দিতে হবে না, আবার মুসলিম আইন অনুসরণ করে বলা হয় অর্ধেক দাও। সম্পত্তি বণ্টনের সময় কোন কোন অভিভাবক বলবেন ধর্মীয় বিধান, মানতেই হবে। কিন্তু কোন ধর্মেই বলা হয়নি কন্যা সন্তানকে তোমরা কোন সম্পত্তি দিতে পারবা না। উপরন্তু কন্যাসন্তানদের বেশি করে ভালবাসার তাগিদ দেয়া হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে ছেলে সন্তান এবং মেয়ে সন্তানকে সমান পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের কল্যাণ ভাতা প্রদান করে। এই সময় কেউ বলেন না মেয়ে সন্তান অর্ধেক পাবে। কিন্তু পারিবারিক সম্পত্তি ভাগের সময় প্রবাসী বেশিরভাগ হিন্দু এবং মুসলিম বাঙালীরা কন্যাসন্তানদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় মেয়েদের সম্পূর্ণভাবে স্থাবর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন। এতে ধর্ম যায় কোথায়?

ব্রিটিশ সরকার থেকে যখন চাইল্ড ভাতা নেন তখন ছেলেমেয়ের জন্য সমান পরিমাণ অর্থ নেন, কিন্তু যখন পারিবারিক সম্পত্তি ভাগ হবে তখন প্রবাসী কিছুসংখ্যক বাঙালী পিতারা বলেন, ছেলের অর্ধেক মেয়ে পাবে। কোন কোন সময় নিজ কন্যাসন্তানের নামে কিছুই দেন না, অথবা মেয়ের বিয়েতে মানুষকে ভাত খাইয়ে আর খাট, টেবিল চেয়ার দিয়ে বলেন, তোমাকে যা দেবার এই খরচ বাবদ তোমার প্রাপ্য দিয়ে দিলাম। নামাজ পড়লে পড়বো,  রমজান মাসে রোজা রাখবো না, ঠিকমতো যাকাত দেবো না, কিন্তু সম্পদ বণ্টনের সময় ধর্মের বিধান বলে মেয়েদের বঞ্চিত করবো, এ এক ধরনের ভণ্ডামি?

আবার অন্য চিত্রও রয়েছে। বাবা প্রতি বৎসর হজ করছেন, রমজান মাস, আশুরায় রোজা রাখছেন, নামাজ কখনই দেরিতে পড়েন না, কিন্তু মেয়েদের স্থাবর সম্পদ বাসাবাড়ির অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। কারও হক মেরে দেয়া বা নায্য পাওনা বুঝিয়ে না দেয়া যে অন্যায্য বিচার হয় এটা তারা মোটেও ভাবেন না, ভাবেন এটাই চিরায়ত নিয়ম। এই বিষয়কে তারা গুরুত্ব দেন না বা ইচ্ছাকৃতভাবে বুঝতে চান না। পিতৃগৃহ থেকেই কিন্তু মেয়েসন্তানদের প্রতি বৈষম্য শুরু হয়, আর এই বৈষম্য পর্যায়ক্রমে স্বামীর বাড়ি, পুত্রের অধীনে চলতেই থাকে।

আমারই অতি পরিচিত এক নারীর তিন ভাই বিদেশে। তাদের বাবা দেশেবিদেশে অনেকগুলো বাসা বাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাবর সম্পত্তির মালিক ছিলেন। কিন্তু বোন তার বাচ্চাদের নিয়ে বাংলাদেশে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। অথচ সেই নারী যদি ভাইদের অর্ধেকও পান তাহলেও তিনি একটা ভালো ঘর পাবেন। কিন্তু তার ভাইয়েরা বলেছেন, তিনি যদি পিতার দেয়া ঘরে থাকেন তাহলে তার ছেলেমেয়েকে মানুষরা ছোট চোখে দেখবে, সামাজিকভাবে সম্মানহানি ঘটবে। ভাড়া করা ঘরে থাকলেও সেটা হবে তার জন্য সম্মানজনক। কী অদ্ভূত সমাজমানস! বাবার দেয়া ঘরে কন্যা তার স্বামী, ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকলে লজ্জা হবে।

হিন্দু নারীরা পৈর্তৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার হোক, এটা আমার দাবি। অনেকে বলবেন, আপনি মুসলিম, আপনি কেন ওদের কথা উঠাচ্ছেন? আমি মনে করি নারী যে ধর্মেরই হোক পৃথিবীর সকল কন্যা, জায়া, জননী যেন পান নায্য বিচার। নারী এখনও অনেক দেশে বৈষম্যের শিকার।

আমি সেইসব সুখী সৌভাগ্যবতী, ডিগ্রীধারী নারীদের বলবো আপনারা সরব হোন। আপনার স্বামীর অগাধ আছে, আপনি সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন, আপনার মাথার উপর ছাদ আছে, আপনার টেবিলে থাকে সপ্তব্যাঞ্জন, তাই ভাববেন না আপনার কথা বলার দরকার নেই। আপনাদেরই সর্বাগ্রে কথা বলা দরকার। যারা অসহায় তারা তো কথা বললেও কাজে আসবে না। যে নারী ডাক্তার, যে নারী শিক্ষক, যে নারী আইনবিদ, ব্যারিস্টার, অথবা সফল ব্যবসায়ী সবার উচিত নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যাপারে কথা বলা।

আপনারা বিসিএস ক্যাডার হবেন, উচ্চপদে কোম্পানিতে চাকরি করবেন, বেতন পাবেন এটাই আপনাদের অর্জিত শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। একটি সমাজের নারীর প্রতি যে সহিংসতা, যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় সেসব সম্পর্কে আলোচনা করুন বিশদভাবে, নায্য বিচারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাধানে আসুন। শিশুদের অভিভাবকত্ব আইন, দুস্থ নারীদের খোরপোষ, উত্তরাধিকার আইনের বাস্তব প্রয়োগ এসব বিষয়ের সুচিন্তিতভাবে তথ্যউপাত্ত তুলে ধরুন। ডিগ্রী নেয়ার উদ্দেশ্য নয় শুধু বিসিএস ক্যাডার হওয়া বা কর্পোরেট অফিসে চাকরি করা। পরিবার, দেশ এবং সমাজের অসংগতি এবং অনায্য যেসব বিচারপ্রক্রিয়া নারী এবং শিশুদের জীবন বিপন্ন করে সেসবের বিরুদ্ধে কথা বলুন। আপনি অসহায় নন তাই যদি মনে করেন আপনার করণীয় কিছু নেই সেটা হবে স্বার্থপরতা।

আপনি হয়তো ভাবছেন আমি একা কথা বলে তো কোন কাজ হবে না। কিন্তু দেখুন ঘুটঘুটে অন্ধকারে একটা ছোট মোমবাতি আলো দিয়ে কিছুটা হলেও তো পথ দেখায়। সামর্থ্য যতই ক্ষুদ্র হোক তারপরও নিজের বিবেক এবং সৎ মনোভাব নিয়ে নায্য কথা উপস্থাপন করা দরকার।

Nazratun Nayem
C.E.O
স্বদেশ বাংলাদেশ অনলাইন চ্যানেল
প্রাক্তন প্রভাষক
সিলেট মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় , কলেজ

শেয়ার করুন:
  • 165
  •  
  •  
  •  
  •  
    165
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.