অন্যের ব্যাপারে আমরা এতো জাজমেন্টাল কেন?

দিনা ফেরদৌস:

জীবনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যক্তিকে তার সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে দেয়া উচিত। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে অন্যের সমস্যার গোঁড়া কোথায় তা না বুঝে সিদ্ধান্ত ছুঁড়ে মারা। অন্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া সহজ, কঠিন হচ্ছে সমাধান করে দেয়া। তাই সমাধানের কথা এলে লেজ গুটিয়ে ভারি সুরে বলতে দেখা যায়, নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হয়। তখন বলতে হয়, সমস্যার সমাধান যেহেতু ব্যক্তির হাতে, তুমি বাপু কে হে অন্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার?

নায়ক অপূর্ব তৃতীয়বারের মতো বিয়ের বিয়ে করলেন, অভিনন্দন জানাই অপূর্ব ও শাম্মা দেওয়ানকে। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার ব্যক্তির আছে। তার সংসার কেন ভাঙলো তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা না দেখালেও চলবে। তার প্রাক্তন স্ত্রী অদিতিরও শুনেছি বিয়ে হয়ে গেছে। অদিতির একটা স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে দেখলাম যে, “চার বছরের প্রেম সফল হলো মাশাআল্লাহ”। অপূর্ব – অদিতির বিয়ে হয় ২০১১ এর জুলাইতে, আর বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ২০২০ মার্চে। তার মানে চার বছর আগে অপূর্বের অন্য জায়গায় পরকীয়া আছে জেনেও অদিতি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সংসার ধরে রাখার। কিন্তু যে যাবার তাকে কি আর ধরে রাখা যায়? এইখানে কেউ বলতে পারেন যে, অদিতি জেনে বুঝে এতোদিন এই সংসার কেনো করে যাচ্ছিল?

অনেক প্রগতিশীলদের এইসব ব্যাপারে হুটহাট সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেন, না পোষালে সংসারের মুখে লাত্থি মেরে চলে যাবে। আমিও এক সময় এই ধরনের ভাবনা পোষণ করতাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝেছি, একটা সংসার শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তার সাথে যুক্ত আছে বাচ্চাকাচ্চা, দুই পরিবার, সেই দুই পরিবারকে ঘিরে থাকা আস্ত একটি সমাজ। সেই সমাজ বাদ দিলেও সম্পর্ক থেকে যায় বাড়ির কুকুর-বেড়াল থেকে শুরু করে জানলার পর্দা, মেঝের কার্পেট এমনকি বারান্দায় লাগানো ছোট্ট টব গাছের সাথেও।

অবলা কোন নারীকে ঘর ছাড়ার বুদ্ধি দেবার আগে সে কোথায় যাবে, কী করে চলবে তার দায়িত্ব নিয়ে যদি এইসব বুদ্ধি না দিয়ে থাকেন, তো বুঝতে হবে আপনি সুবিধাবাদী। আর যার যাবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাচ্ছে না, তার লিমিটেশনটা নিয়েও ভাবতে হবে। আমি বলছি না অপূর্বের প্রাক্তন স্ত্রী অদিতি অবলা বা অদিতির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না বলে এতোদিন অপূর্বকে ছেড়ে যায়নি। বলতে চাচ্ছি, এই যে তিন বছর সে অপেক্ষা করলো, সমস্যাটা যে সমাধানের অযোগ্য বিষয়টি ভেতর থেকে অনুভব করলেন, এটা বরং তাকে অনেক শক্তি যুগিয়েছে। ফলে বিচ্ছেদ পরবর্তীতে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে সময় লাগেনি। কিন্তু এর ফাঁকে দরদীরা যদি সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধি দিয়ে বলতেন, তোমার মেরুদণ্ড নেই, বেহায়ার মতো এই সংসারে এখনও কেন, তবে হয়তো অদিতি তখনই রাগে, লজ্জায় বেরিয়ে আসতো; তাহলে পরবর্তীতে ভাবতো অমুক আমার সংসার ভাঙিয়েছেন। সে যদি বিবাহ বিচ্ছেদের পরবর্তী সময়ে বিষন্নতায় ভুগতো একাকিত্ব নিয়ে, তখন আপনার কিছুই যেত আসতো না। আপনি কিন্তু নিজের বউ/বরকে নিয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে জড়িয়ে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠিকই ছবি পোস্টাতেন। তখন ভাবতেন না, আপনার বুদ্ধিতে রেগে হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে দুইদিন আগে আর একজন সংসার ছেড়ে বের হয়ে আসছে, তার সমব্যথী হয়ে কিছুদিন নিজের রঙ, ঢং একটু আড়ালেই রাখি। আমরা বরং কেউ ভালো নেই জানলে নিজে কতটা ভালো আছি, তা সেই ব্যক্তিকে দেখিয়ে এক ধরনের পৈশাচিক সুখ পাই।

এখন বলবেন, মানুষকে ভালো বুদ্ধি দিতে নেই, ওর অবস্থা খারাপ দেখেই তো বললাম, ও নিজে কেনো বুঝে সিদ্ধান্ত নিল না। নিজেকে প্রশ্ন করুন অন্যের ব্যাপারে কী বুঝে আপনিই বা তার জীবনের এতোবড় ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়েছিলেন? এইসব ব্যাপারে ব্যক্তিকে চাপ দিয়ে নয়, বরং স্বাধীনভাবে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ করে দিতে হয়। যদি সত্যিই আপনি তার ভালো চান তবে আগামীতে কী কী সমস্যা্র সম্মুখীন হতে পারে তা তুলে ধরতে পারেন। কাউকে কোন বিষয়ে পরামর্শ দেয়া আর হুটহাট সিদ্ধান্ত দিয়ে বসা দুটি ভিন্ন বিষয়। আমি একজন নারীবাদীকে চিনি, যিনি সারাক্ষণ স্বামীর চরিত্র খারাপ বলে বলে মুখে ফেনা তুলতেন। সেই স্বামী অতীষ্ট হয়ে ডিভোর্স দেয়ার পরও বাচ্চা দেখার নাম করে সেই প্রাক্তন স্বামীর ঘরেই পড়ে আছেন, কারণ তার যাবার কোন জায়গা নেই, রোজগার নেই, তো লাভটা কী হলো?

আমার উপর রাগ তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে কেনো অপূর্বকে অভিনন্দন জানালাম। কারণ আমি মনে করি তার জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তার আছে। বিয়ে করে যদি কেউ ভালো না থাকে তো কেন সেই বিয়ের সিল বয়ে বেড়াতে হবে? ঠিক এই কথাটিই আমি বলেছিলাম সালমান শাহের প্রাক্তন স্ত্রী সামিরা যখন তৃতীয়বার বিয়ে করেন। কিন্তু তখন পরিস্থিতি দেখলাম ভিন্ন। সামিরার চরিত্র নিয়ে শুরু হলো টানাটানি। অবশ্য সামিরা যদি এই সমাজের ভয়ে তৃতীয়বার বিয়ে নাও করতেন নিজের সুখের চিন্তা বাদ দিয়ে, তাহলেও সামিরাকে এই সমাজের মানুষ যা মনে করেন, তারচেয়ে বেশি কিছুই মনে করতেন না।

এই যে কথায় কথায় অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে এখতিয়ারবিহীন ঢুকে যান আপনারা, তাতে কার ফায়দাটা হয় বেশি ভেবে দেখুন। কেউ যদি মেনেই নেয় যে ‘আমি খারাপ, আর ভালো হওয়ার চেষ্টাও করবো না’, তখন কিন্তু সে আর কাউকেই কেয়ার করে চলবে না। আগে যে নারী পিতৃপরিচয় না দিতে পেরে নিজের বাচ্চাকে জঙ্গলে ফেলে চলে যেতো, কাল কিন্তু সেই নারীই বলবে, আমার বাচ্চার বাপের পরিচয় লাগবে না। কলকাতার অভিনেত্রী নুসরাত এই প্রথা অলরেডি ভেঙে ফেলেছেন। এখন অনেকেই নিজেদের প্রোফাইল পিকে ‘রাতের রানী’ নিজেই লিখছেন। এরপরে গালি দেয়ার জন্যেই বিশেষণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে।

কিছুদিন ধরে টম ইমাম নামে একজন লোকের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তার নিজের বউকে নিয়ে বানানো ভিডিও দেখে কিছু অযোগ্য, পরশ্রীকাতর লোকের গা জ্বলে যাচ্ছে। টম ইমাম সাহেবের দোষ হচ্ছে, তিনার বউ বয়সে তিনার থেকে অনেক ছোট। বউ বয়সে ছোট হোক বা বড়, এটা কি অবৈধ কোন সম্পর্ক? তিনি যদি ঘরে বউ রেখে, সেই বউকে অবজ্ঞা করে, অন্য কোন মেয়ের সাথে পরকীয়ায় জড়াতেন, তবেই অপরাধ বা অবিচার হতো। অবশেষে সকলের নানাধরনের নোংরা মন্তব্য পেতে পেতে এখন নিজ থেকেই বউকে নিয়ে টিকটক ভিডিও করে দেন, হিংসুকদের জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিতে।

আমাদের কাজ হচ্ছে যারা ভালো নেই, যাদের প্রতি অন্যায় হচ্ছে, তাদেরকে সাহায্য করা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। কিন্তু আমাদের সমাজের অসুখী মানুষদের সমস্যা হচ্ছে, যে ভালো আছে তার পিছনে খোঁচানো। এই অতি খুঁচিয়ে, গালি দিয়ে দিয়ে যাদের বেশ্যা বা বদমায়েশ বানানো হয়, তারা কিন্তু পরবর্তীতে হিরো বা হিরোইনে পরিণত হয়, আর আপনি/ আপনারা সেই জায়গাতেই বসে থাকেন জ্বালাপোড়া নিয়ে। আপনাদের এই ক্ষোভ দেখেই বোঝা যায় কীরকম অতৃপ্ত আর অবদমিত জীবন যাপনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তার থেকে যা আইনত কোন অপরাধ নয়, বা যার দ্বারা আপনার কোন ক্ষতি হচ্ছে না সেইসব বিষয়গুলো ইগনোর করতে শিখুন। কারো পোষালে সংসার করবে, না পোষালে ডিভোর্স দেবে, এতে যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তো তাদের বাচ্চাকাচ্চা হবে। তাদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আপনার অতি ভাবনাটা মায়ের থেকে মাসীর না হয়ে রাস্তার জনগণের বেশি হয়ে গেলে ঢং লাগে। বরং এই দেশে আরো গুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয় আছে পারলে সেইসব নিয়ে কথা বলুন।

শেয়ার করুন:
  • 31
  •  
  •  
  •  
  •  
    31
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.