আমার যে কী ইচ্ছে করে নষ্ট মেয়ে হতে!

ফওজিয়া খোন্দকার ইভা:

পরীমণিকে দেখে আমি বিস্মিত হই, মুগ্ধ হই, এবং সাহসীও হই। নানাবিধ কারণে, বিশেষ করে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার উপর এহেন অন্যায় এর প্রতিবাদে সশরীরে দাঁড়াতে পারিনি বটে, কিন্তু তার কাছেই ছিলাম বা পাশেই ছিলাম সবটা সময়েই এবং আছি।

আমি প্রায় ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছি। আমার মনে হয়, এমন পরিস্থিতিতে আমি তার মতো এমন সাহসী ও লড়াকু হতে পারতাম না। আমি নিশ্চিত, আমি ভেঙে পড়তাম। পরীর এই লড়ে যাওয়া আমাকে মনে করিয়ে দেয় “বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেই দিন হবো শান্ত..।”

যেদিন প্রথম পরী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সকলের সামনে কথা বলেন, প্রশ্ন তোলেন, চ্যালেঞ্জ করেন, আমি নিশ্চিত জানতাম তার পরিণতি কী হতে যাচ্ছে। তবে এতোদূর যাবে তা বুঝতে পারিনি এটাও সত্যি।
একটি মেয়েকে দমিয়ে রাখার জন্য পিতৃতন্ত্র কী করতে পারে, এটি আমাদের কাছে একেবারেই নতুন কিছু নয়। ছোটবেলায় যখন বুঝতেও শিখিনি, ঠিক তখন থেকেই শুনে এসেছি “ওই মেয়ে তো চরিত্রহীন বা ওই মেয়ে তো অসভ্য” বা এর থেকেও খারাপ কথা। কোনো মেয়ে বা নারী কর্মক্ষেত্রে ভালো করলে বা অল্প সময়ের মধ্যে পদোন্নতি হলে এই সমাজের অনেকই বলে থাকেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে তার সম্পর্ক আছে বা ছিলো। ঠিক একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নারী ভালো ফলাফল করলেও প্রায় একই মন্তব্য শুনতে হয়। বলা বাহুল্য যে তারা শারীরিক সম্পর্কের কথাই বলেন। আর সেই মেয়েটি যদি হয় সুন্দরী, তরুণ, বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে এগিয়ে থাকা, তাহলে তো কথাই নেই। এক পুরুষ যখন অন্য পুরুষের মাকে নিয়ে গালি দেয় সে ভুলেই যায় এ গালি তার মাকে এবং সকল নারীকে হেনস্থা করে, ছোটো করে। অথচ সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র কি এ ব্যাপারে কখনও কিছু বলে? সমাজপতিরা, ধর্মযাজকেরা, সাধারণ মানুষেরা কেউ কি কখনও প্রতিবাদ করে? পক্ষান্তরে নারীর যৌনতার উপর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কারণ এই মানুষদের এ বিষয়ে বৈধতা দেয়া।

নারী দশকের শুরুতে “সাম্যের পথে” বা “Towards Equality” এই দলিলটি নারীদের মর্যাদার এবং বৈষম্যের এক শোচনীয় চিত্র তুলে ধরে। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটিকে স্বাভাবিক ও সর্বজনস্বীকৃত করে তোলা হয়, সেই ব্যবস্থার নামই পিতৃতন্ত্র। ভারতীয় নারীবাদী গবেষক উমা চক্রবর্তী এই ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনটি স্তরে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে নারীদের উপর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার কথা উল্লেখ করেছেন।

এক, মতাদর্শের মাধ্যমে, পতিব্রতা রুপে নারীদের তুলে ধরা আর এটি রক্ষা করাই নারীর প্রধান ধর্ম এবং এটি ছিল তাদের ব্যাক্তি স্বাতন্ত্রের সর্ব শ্রেষ্ঠ প্রকাশ।
দুই, আইন ও প্রথা যার মাধ্যমে নারীদের পিতৃতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই সহজ ও সমাজের কাছে যৌক্তিক। এবং তৃতীয় মাধ্যমটি ছিলো রাষ্ট্র। প্রাচীন রাষ্ট্র, পুরুষতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী নিয়মভাঙা নারীকে “চরিত্রহীন বা খারাপ আখ্যায়িত করে দণ্ড দিতো, যা আজও বহাল আছে। আর এটা বহাল রাখতে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর।

শুধু পরীমণি নয়, যে নারীই এই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ করে, তার পরিণাম হয় ভয়াবহ। এই উপমহাদেশে নারীর পরিচয় এবং একমাত্র গন্তব্য হচ্ছে পতিব্রতা স্ত্রী। এর বাইরে স্বাধীন ভাবে, নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়া এক বড় ধরনের অপরাধ নারীর জন্যে। একা থাকা নারী বা একক নারী যেন সকল পুরুষের। সেই নারী যেন খোলা ময়দান, যা ইচ্ছে করা যায়। এমনকি এই সমাজের বেশির ভাগ নারীর স্বাধীন জীবন, পোশাক, চলাচল, সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে না তারা।

ইতিহাসে এক সময়ে নারীকে ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, নারীর কীর্তি, ইতিহাস মুছে দেয়া হয়েছে। নারীকে বেশ্যা ,পাগল, চরিত্রহীন আখ্যা দেয়া হয়েছে, হয়।  কিন্তু পেরেছে কি দমিয়ে রাখতে? আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৪ বছরের ইয়াসমিনকে পতিতা বলছে রাষ্ট্র। বাঁধনকে নিয়ে কিনা বলেছে এ সমাজ! তার শরীর, তার পোশাক, রাতে ছেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, গণমাধ্যমের রসালো উপস্থাপন, কী ছিলো না? শাহরীন হত্যার পরও কতো কথা।  এমন হাজারও নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন।

পরিশেষে তসলিমা নাসরিন এর নষ্ট কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন দিয়েই শেষ করছি “ওরা কারো কথায় কান দেয়না, যা ইচ্ছে তাই করে। কারো আদেশ, উপদেশের তোয়াক্কা করে না… আহ্, আমার যে কি ভীষণ ইচ্ছে করে নষ্ট মেয়ে হতে।”

শেয়ার করুন:
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.