পরীমণির কাঁধে কি সমাজের শুচিতার ভার?

সালমা লুনা:

বাণিজ্যিক সিনেমার লিডিং হিরোরা যেমন প্রথম পর্দায় এন্ট্রি নেয়, সেভাবে জামিনে মুক্ত পরীমণি আজ সকালে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে।
মাথায় পাগড়ির মতো সাদা ফেট্টি বাঁধা, চোখে সানগ্লাস, হাসিখুশি মুখ। গাড়ির সানরুফ খুলে হাত নাড়ছে। হাত মেলাচ্ছে সাধারণ মানুষের সাথে। সেলফি তুলছে।
সিনেমায় হিরোর এমন আগমনে হলের দর্শক সিটি বাজিয়ে হর্ষধ্বনি দেয়, ক্যায়া এন্ট্রি মারা ইয়ার!

সবাই বিস্ময়ে তাই দেখছিল। হঠাৎই পরীমনির হাতে লেখা দেখা গেল, ডোন্ট ♥♥♥ মি বিচ! এবং মিডল ফিঙ্গারের সাইন।

অর্থাৎ আমাকে ভালোবেসো না হে কাপুরুষের দল।
বিচ এইক্ষেত্রে কুক্কুরী ছাড়াও আর কী কী অর্থে ব্যবহৃত হয় সে প্রসঙ্গে এই আলাপ করবো না। ওইটির আর কী কী অর্থ হতে পারে সেটা পাঠকরা যার যার নিজ দায়িত্বে অবশ্যই দেখে নেবেন আশা করি।
এই দেখা ও জানার দরকার আছে।

কারণ পরীমণির হাতে এই লেখা দেখেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে সকলের। সে কাকে বললো এইসব! নারীকে গালি দিলো?
গালিটা দিলোই বা কাকে! এমন গালি কোন ভালো নারী দেয়? কোন ভালো মানুষ দেয়?

একদল তো আগে থেকেই দেখতে পারে না এই নষ্ট নারীকে। তারা একদম পিওর। পয়গম্বরদের সমতুল্য প্রায়। এরা ভ্রষ্টাচার একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। আর তারই স্বাক্ষর রেখে যান স্বাধীন নারীদের অসহ্য কুশ্রী গালিগালাজ করে।

আরেক দল সভ্য ভব্য আধুনিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারা শুদ্ধতা শুচিতা, নীতিনৈতিকতার ঠিকাদারি নিয়ে রেখেছেন। তারা মেপে খান, ঘুমান, চলেন, বলেন। তাদের প্রতিবাদও মাপা।
তারা ইয়ে-মানে-যদি-কিন্তু-তবু ইত্যাদি শর্তসাপেক্ষে পরীমণির পাশে ছিলেন এতোদিন।
তাদেরও মাথায় যেন বাজ পড়লো। তারা মনে করেন, গালি দেয়া নারীরা ভালো না। মাদকের মামলা, তাও জামিন পেয়ে হাসতে থাকা নারী, এ কেমন!
তাছাড়া দোষ তো কিছু করেছো-ই বাছা, নইলে এমন হয়! কই আমাদের তো হয় না!
তাছাড়া তুমি এতো কষ্টে জামিন পেয়েছো, এখন এসব গালাগাল না করলেই নয়? ভালো হয়ে যাও মেয়ে।

আসলে এই মানুষগুলোর দোষ নাই। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, সে হিজাব নিয়ে কারাগার থেকে বের হবে। হাতে থাকবে তসবি ছড়া। চোখে সুরমা। মুখে আলহামদুলিল্লাহ, শুকরিয়া, আল্লাহ মেহেরবান।
উপরে আল্লাহ নিচে সকল প্রশংসা তার- বলে হেঁচকি তুলে কাঁদবে। বলবে, দেশবাসী আপনাদের দোয়ায় আমি মুক্তি পেয়েছি। আজকে থেকে তওবা করে পাপের পথ ছাড়লাম, সিনেমা ছেড়ে দিলাম। আমি দ্বীনের পথে এসেছি। এখন থেকে আপনাদের কথামতো চলবো।
এমনই হয়। পুরুষতন্ত্র এমন করেই দেখতে চায় অভিযুক্ত নারীকে।

পরীমণি এমন বললেই আজ সিনারিও ভোজবাজীর মত বদলে যেত।

কিন্তু সে কেন বলবে?
সে তো কাউকে খুশি করার দায় নিজের ঘাড়ে নেয়নি। সবার চাওয়া তার চাওয়া এক না। সে নিজের মত করে বাঁচতে চাওয়া একটা মানুষ। নারী বলে কি তার নিজের মত করে বাঁচতে চাওয়ার অধিকার নাই?
যেমন বাঁচে একজন পুরুষ। ক্লাবে যায়, মদ খায়, জুয়া খেলে।
তেমন করে বাঁচলে কার ইয়ের কী!

সে তো কারো বাপ ভাই স্বামী পুত্রের চরিত্র সংশোধনের শোধনাগার না।
সে তো তার ছোট্ট কাঁধে কার কী ভালো বা মন্দ লাগে তার ভার বহন করতে চায় নাই। সমাজ সংসার, শুদ্ধ অশুদ্ধ, ধর্ম অধর্ম, নীতি নৈতিকতা তার কাঁধে চাপিয়ে সবাই খালাস পেতে চাইলে তো হবে না৷
শুদ্ধতা পবিত্রতা লক্ষীমন্ত নারীর যে শ্রী সবাই দেখতে চায় তার মধ্যে, সে ওইটা শো করতে নারাজ।
এবং সে সাহস করে খোলাখুলিই দেখিয়ে দিয়েছে, সে লক্ষী পক্ষী হতেই চায় না। সে সমাজের চাপিয়ে দেয়া শুচিতার ধার ধারে না। সে ঘাড় শক্ত করে, মাথা উঁচু করে চলে, প্রতিবাদ করে তার বিরুদ্ধে ঘটা অন্যায়ের। এবং প্রয়োজনে গালি দেয়, মিড ফিঙ্গারও দেখায়।

সে সত্যিই একজন সাহসী নারী যে ভণ্ড শোষক নারী নির্যাতক এক সমাজের দিকে তার আঙ্গুল তুলেছে।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে মানুষগুলো তাকে ব্যবহার করেছে, যারা তাকে দীর্ঘদিন ক্লাবে, আড্ডায়, অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে গেছে, নিজেদের ও তাদের সঙ্গীদের মনোরঞ্জন করতে। বিভিন্ন কার্যোদ্ধারে ব্যবহার করেছে,বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গী করতে লাখ লাখ টাকা ঢেলেছে কিন্তু পরিস্থিতি বেগতিক দেখেই সেই তারাই যখন তাকে বিপদে ফেলার সব ব্যবস্থা করেছে। শুধু তাই না হাঁসের মত ঝেড়ে ফেলেছে পালক থেকে জলের চিহ্নের মত তাদের চরিত্র থেকে পাপের সকল চিহ্ন।
পরীমণি তাদের সকলকে এখন চিনে ফেলেছে। সে হয়তো সেই মানুষগুলোকে উদ্দেশ্য করেই হাতে এই লেখাটি লিখেছে।

বুঝতে হবে, সে এমন একটি রাষ্ট্রে বসবাস করছে যেখানে মানুষের মুখ খোলায় বাধ্যবাধকতা আছে। বরং আইন করে মুখ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা আছে। সেখানে তার পক্ষে কারো নাম নেয়া সম্ভব না।

কিন্তু এই নাম না নেয়াতেও যে সপাট চড়টি পড়েছে পুরুষতন্ত্রের গায়ে, এবং তা যে পুরুষতন্ত্রের মোটা চামড়া ভেদ করে জায়গামতই লেগেছে। এর আওয়াজ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে না হোক আমাদেরই চারপাশে বেশ স্পষ্টই অনুভব করা যাচ্ছে ।

প্রতিবাদের ভাষা ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। কার সাথে কতটা অন্যায় হয় সেই অনুযায়ী তার প্রতিবাদ ভাষা পায়। সেই ভাষা অশ্লীল লাগতেই পারে নির্যাতকের কাছে, শোষকের কাছে, বা একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে।
কিন্তু তাতে তো তার প্রতিবাদ নিরর্থক হয়ে যায় না। বরং চারপাশে যত বেশি আওয়াজ উঠবে, বুঝতে হবে তীর নিশানাতেই লেগেছে।

শেয়ার করুন:
  • 75
  •  
  •  
  •  
  •  
    75
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.