এইখানেই পরীমণির জয়

সুমু হক:

আমাদের দেশে একটি প্রবণতা রয়েছে। একজন নারী যখন কোন অভিযোগে গ্রেফতার হন, সাধারণত দেখা যায় যে তিনি মুখ লুকিয়ে পুলিশের গাড়িতে উঠছেন।
পরীমণি সেই কাজটি করেননি।
তিনি মাথা উঁচু করে নির্ভয়ে চলেছেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে গ্রেফতার হওয়া, একের পর এক রিমান্ড, কোর্টে হাজির হওয়া থেকে শুরু করে জামিনে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত পুরোটা সময় যে চারিত্রিক দৃঢ়তা পরীমণি দেখিয়েছেন, আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে তো বটেই, আমাদের সমাজেই তা নিতান্তই বিরল।
তার সাথে উপরি পাওনা ছিল সংবাদ আর যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র নিয়ে গ্যাস লাইটিং, অর্থাৎ সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে কুৎসা রচনা করে চরিত্র হননের চেষ্টা।

কেন হয়েছিল জানেন?
হয়েছিল, তার কারণ খুব সাধারণ অবস্থান থেকে উঠে আসা একটি মেয়ে, যার চেহারা এবং শরীরকে পুঁজি করে ব্যবসা করা, কিংবা বড়জোর ক্ষমতার জোরে যথেচ্ছা তাকে ভোগ করা ছাড়া অন্য কিছু করা যায় বলে এ সমাজ ভাবতেই পারে না, সেই মেয়েটিই হঠাৎ একদিন এই ক্ষমতাবানদের উদ্দেশ্যে একটি ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলো!
একজন পরীমণির দেহকে পুঁজি করে বাণিজ্য করা চলে বড়জোর।
সেই বাণিজ্যের আয় যদি খোদ পরীমণিকে কোন ক্ষমতা দিয়েও ফেলে, সেই ক্ষমতাকে ব্যবহারের স্পর্ধা যেন সে না করে!

হলিউড থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের স্বপ্নরাজ্য কিংবা আমাদের হাড় জিড়জিড়ে এফডিসি, সব কিন্তু এই একই নিয়মে চলে।
এ সমাজে পরীমণির মত একজন নারীকে সামাজিক যোগাযোগ এবং গণমাধ্যমে চরিত্র হনণের শিকার হতে হবে এতো ভবিতব্য!
পরীমণির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় কী হবে তা ঘোষিত না হলেও খুব সহজেই অনুমান করা যায়!

এ দেশে সবাই নারীর চরিত্রের বিচারক, সবাই নারীর চরিত্র বিশ্লেষণ, তার কী শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে মতামত দেবার অধিকার রাখে।
পাড়ার মসজিদের মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে চায়ের দোকানদার, বিজ্ঞাপন সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশের বড় কর্তা, স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটে ছেলেটি পর্যন্ত প্রত্যেকেই এ বিষয়ে একেকজন বিশেষজ্ঞ।
বিশ্বাস হলো না! মনে হচ্ছে আমি বাড়িয়ে বলছি?

বেশ তো! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন নারী সংক্রান্ত খবরের নিচের মন্তব্যগুলো একটু কষ্ট করে পড়ুন, কিংবা যে কোন শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর মাইকে ভেসে আসা মুয়াজ্জিনের খুৎবায় একটু কান পাতুন।
এদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে সরকার ফাঁক তৈরি করে দিলে সেই ফোঁকর গলিয়ে পেডোফাইল ধর্ষকেরা আইনসম্মতভাবে তাদের শিকারের অভিভাবকের মর্যাদা পায়।
এদেশে যৌতুকের দাবিতে অত্যাচারিত গৃহবধূ বিচার চাইতে গেলে থানার পুলিশ কর্তাটি তার এফআইআর না লিখে বরং সমঝোতা করে তাকে অত্যাচারী স্বামী এবং শ্বশুরের কাছে ফেরত পাঠানোই শ্রেয় মনে করে।

এদেশে ধর্ষক, খুনিদের বিচার হয় না অথচ ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখার অভিযোগে কার্টুন আঁকার অভিযোগে জেলের অন্ধকারে অত্যাচারিত হয়ে পঁচে মরতে হয়।
এমন একুশে আইনের দেশে জন্মেও পরীমণি একটি মেরুদণ্ডের অধিকারিণী হবার প্রমাণ দিয়েছেন।

এইখানেই পরীমণির জয়।

শেয়ার করুন:
  • 460
  •  
  •  
  •  
  •  
    460
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.