সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যহীনতা কেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়?

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ছোট থেকেই শিশুদের জ্ঞান দিয়ে বড় করা হয়। পাঠ্যসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত করা আছে এই সম্পর্কে রচনা, প্যারাগ্রাফ, যা মুখস্থ করানো হয়। যাতে এ বিষয়ে শিশুদের জ্ঞানের কমতি না হয়। অথচ সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য কাকে বলে, সেটাও সঠিকভাবে পালন করা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই সংক্রান্ত জ্ঞান কিন্তু কাউকেই দেয়া হয় না এবং সেই বিষয়েও যে জ্ঞান আহরণের প্রয়োজনীয়তা আছে তা নিয়েও অবশ্য কারও মাথাব্যথা হয় না।

বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে করুণ সুর বাজিয়ে যখন ওখানে বসবাসকারী মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে গভীর আবেগে প্রচার করা হয় ‘পুত্র সন্তান অমানুষ’ ঠিক তেমনি ছোট্ট শিশুর সাক্ষাতকার নিয়েও একটু প্রচার করা উচিৎ তাকে জন্ম দিয়ে তাকেই যখন অসম্মান করে যে সকল জন্মদানকারী ওরফে পিতা তারা কত বড় সুমহান মানুষ!

আমি মনে করি , মাতাপিতার প্রতি যতটা দায়িত্ব সন্তানের আছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি দায়িত্ব বাবা-মায়ের তার সন্তানের প্রতি আছে। জন্ম দিয়ে কাউকে ধন্য করা হয়নি, সে সেধে পৃথিবীতে আসেওনি। শিশুকে পৃথিবীতে এনে যদি তার চলার পথ মসৃণ না রাখা হয়, তাকে শারীরিক, মানসিক বা সামাজিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে হয়, তাহলে যার কারণে সেটা হচ্ছে সেটা যিনিই হোন না কেন তাকে দণ্ডবিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধে দণ্ডিত করার বিধান রেখে কঠোর আইন হওয়া উচিৎ।

সন্তান কেনা গোলাম না কিংবা ত্যাগ করার বস্তুও সে না, না সে অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য কোন প্রাণ। সে পৃ্থক ব্যক্তিসত্তা , যে জন্ম থেকেই মানুষ হিসাবে শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী।

অনেক দেশেই বাবা-মায়ের সন্তানের গায়ে হাত তোলাকেও অপরাধ হিসাবেই দেখা হয়, আর আমাদের উপমহাদেশে বাচ্চার জীবন নরক বানিয়ে ফেললেও কোন জবাবদিহিতা নেই, বাচ্চার মানসিকতার উপর এর প্রভাব কতোটা ভয়াবহ এ নিয়ে কোন চিন্তা ভাবনাও দেখি কারও নেই।

একটা শিশুর সবরকমের দায়দায়িত্ব পালন করতে মা শুধু নয় তার বাবাও নীতিগতভাবে বাধ্য, কেউ একজন সেই দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে বা তার আচরণ দ্বারা এটা প্রতীয়মান হলে তার বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রেখে আইন হওয়া উচিৎ যাতে সে সন্তানের জন্য করণীয় সকল প্রকার দায়িত্ব পালনে আইনগতভাবে বাধ্য থাকে এবং তার পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রের করা উচিৎ। শিশুকে তার অধিকার চাইতে আদালতে পৌঁছানোর আগে আদালতেরই তার সুরক্ষা দানের সর্বাত্মক ব্যবস্থা করা উচিৎ।

কোন শিশুকে তার সকল অধিকার হতে বঞ্চিত করা, পুরো সমাজের সামনে হেনস্থার শিকার হতে দেয়া, তার শৈশবকে ট্রমাটিক করা সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছাড়া কিছু নয়। সন্তানের জন্ম দিয়ে তাকে শারীরিকভাবে খুন করার অধিকার যেমন আপনার নেই, তেমনি মানসিকভাবে খুনের অধিকারও আপনি রাখেন না। কিন্তু সেটা খুব ভালভাবেই আমাদের সমাজে হয়।

বর্বরতা কখনো পারিবারিক বিষয় হিসাবে ট্রিটেড হতে পারে না। ফৌজদারি দণ্ডবিধির আওতায় এই নাজুক বিষয় যাওয়া প্রয়োজন। পারিবারিক আদালতের সিভিল ন্যাচার এসব বিকৃতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিৎ নয়। ক্লিয়ার ক্রিমিনাল অ্যাক্ট, আনসিভিলাইজড এটিচিউড কেন সিভিল সেক্টরে থাকবে?

যে সমাজে বাচ্চার জন্মনিবন্ধন, স্কুলের আইডি কার্ড থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে মাকে পিছনে ফেলে পিতা হয়ে সর্বাগ্রে ঝুলে পড়া ছাড়া যে সকল ব্যক্তি সন্তানের জন্য করণীয় কোন দায়িত্বই পালন করেন না, অথচ সেখানে মাকেই এককভাবে সেই যৌথ দায়িত্ব পালন করে বাচ্চার জীবন এগিয়ে নিতে হাজার বিপত্তির মুখোমুখি হয়ে সেই সর্বক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিত ব্যক্তির ঘাটতি পোষাতে প্রতিনিয়ত লড়তে হয়,যে সমাজে সন্তানের জীবনের একটা ক্ষেত্রে অমানবিক পিতাকে এড়িয়ে চলার অধিকার থাকে না কিন্তু সেই একই সমাজে সন্তানকে এড়িয়ে চলার অধিকার সন্তানের সর্বোময় অধিকারীর জন্য খুবই সহজ কেন হয় !সেই সমাজ কি করে সভ্য মানুষের জীবনধারণের উপযোগী সমাজ হয়!

একটা প্রতিষ্ঠানে চাপরাশি হতেও যোগ্যতা লাগে, সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেও জবাবদিহিতা দিতে হয়, পদচ্যুতি ঘটে আর একটা মানব শিশুর জীবনে পিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসীন হতে সবার না লাগে যোগ্যতা, না লাগে জবাবদিহিতা! দায়িত্ব পালনে অপারগ ব্যক্তিও অভিভাবকের স্থান অলংকৃত (?) আদতে কলঙ্কিত করে বসে থাকতে পারে অনায়াসে। যেসব পিতা সন্তানকে আগলে রাখার দায়িত্ব অনুভব করেন না, সন্তানের কেন সেই পিতাকে সকল ক্ষেত্রে বয়ে চলার দায় থাকবে?

পিতা হয়েও পিতৃত্ব যে সকল জন্মদাতার নিকট বোঝা হয়, তাহলে সেই সন্তান কেবল মায়ের হোক, সেই শিশুকে প্রশ্ন করা না হোক তোমার বাবার নাম কী! ছোট্ট প্রাণের কষ্ট হয় জ্যান্ত পিতার মৃতের ন্যায় উপস্থিতির জানান দিতে।

ক্ষমা করো রাষ্ট্র সেই শিশুদের, করে দাও শুধু তাদের মায়ের সন্তান। আমরা মায়েরা আমাদের বুক দিয়ে সন্তান আগলে রাখবো, রাষ্ট্র তোমায় কথা দিলাম, এ অঙ্গীকার যেদিন সন্তান জঠরে ধারণ করেছি সেদিনই অনাগত শিশুকে করেছিলাম।

শেয়ার করুন:
  • 402
  •  
  •  
  •  
  •  
    402
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.